ইনে নেখাসে উকে কিছু মাথামুণ্ডু নেই মনে হচ্ছে তো? এখন আয়নার সামনে ধরলেই কথাগুলো আর আবোলতাবোল থাকবে না। উত্তরটা অমন করে দেখবার আপনার দরকার হবে না বলেই আশা করছি। এখন ভাবুন:
১। খাঁ খাঁ রোদের রাজ্যে যে পাহাড়ের চুড়ার তুষার গলে না।
২। একশো বছরেরও আগে মিশরের কায়রো শহরে, নানা গরিবানি কাফিখানায় ঘুরে ঘুরে হাজার এক আরব্য রজনীর অপরূপ সব কিসসা তিনি নতুন করে উদ্ধার করেছিলেন। আর সে কীর্তির আগে ভারতের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে তিনি ছিলেন এক সেনাপতি। সিপাহি বিদ্রোহের বছর ১৮৫৭-তে তিনি ছিলেন কোথায়? আর তার পরের বছর কোথায় কী এমন আবিষ্কার করেছিলেন, যা তুলনাহীন? তাঁর আবিষ্কারের সঙ্গে উজিজি শব্দটা উচ্চারণ করলে পুরনো কোনও ইতিহাসের স্মৃতি ঝলকে ওঠে কি?
৩। উনিশশো চোদ্দ ছাড়িয়ে প্রায় আঠারো পর্যন্ত জার্মান রপ্ত করে আবার তা ভুলে ইংরেজি শিখতে হয়েছিল কোথায়, কাদের?
৪। একসঙ্গে জিরাফ, উটপাখি আর শিম্পাজি খুঁজতে যাব কোথায়?
এ সব প্রশ্নের জবাব মনে মনে দিয়ে ঠিক হয়েছে না বেঠিক হয়েছে, পেছনের পাতা উলটে দেখে নিন। চারটের মধ্যে তিনটেও যদি ঠিক হয়ে থাকে যে কোনও বড় কাগজের ব্যক্তিগত কলমে এক লাইনে প্রস্তুত বলে একটা বিজ্ঞাপন দিন। তাহলেই আপনার যা এরপর করবার মৌ-কা-সা-বি-স-এর নির্দেশের সেই পরের কিস্তি পেয়ে যাবেন। জিরাফ আর উটপাখি ছোটা তেপান্তরে সোনালি সুমুদুরের মতো বোথা আর স্মাটসদের সোনালি গমের খামার কীভাবে ছড়াচ্ছে তার রহস্য জানাব।
এ চিঠি আদ্যোপান্ত বার কয়েক পড়বার পর রীতিমত ভাবনাতেই পড়লাম আমরা তিনজন। শিবু তখনও আসেনি। কিন্তু সে এলেও বিশেষ বুদ্ধি বাতলাতে পারত বলে মনে হয় না।
এ চিঠি নিয়ে এখন কী করা যাবে সেইটাই হল সমস্যা। ঘনাদাকে এ চিঠি এখন দিতে যাওয়া যায় না!
যে-কোনও চিঠি সম্বন্ধে তাঁর পাকা এলার্জি তো আছেই, তার ওপর প্রথম চিঠিটা বেমালুম চেপে গিয়ে দ্বিতীয় চিঠিটা দিতে যাওয়ার কৈফিয়তটা হবে কী?
তা হলে এ চিঠিটাও কি বেমালুম হজম করে ফেলব?
কিছুতেই না। জোরালো প্রতিবাদটা কিছুক্ষণ আগে ঢোকা শিবুর। নিজের মতটাকে জোরালো যুক্তির গাঁথুনি দিয়ে সে বললে, ঘনাদাকে মাপবার এমন একটা মওকা হেলায় হারালে আফশোসের সীমা থাকবে না যে!
কিন্তু ঘনাদার হাতে এ চিঠি তুলে দেব কী বলে? আমাদের ভাবনা।
তাঁর হাতে তুলে দেব কেন? শিবুর ব্যাখ্যা—ও চিঠি নিজেদের কাছেই রেখে এসব প্রশ্নের ধাঁধা তাঁর নাকের সামনে যেন অজান্তে ঘোরাব।
কীভাবে? আমাদের বিমূঢ় জিজ্ঞাসা।
কীভাবে তা আমিই কি জানি! শিবু অকপটে স্বীকার করে জানালে, কিন্তু সময় মতো কি ঠিকঠাক বুদ্ধিগুলো জোগাবে না! দেখাই যাক না।
তা মোটমাট আমরা খেলাটা খুব মন্দ খেলিনি। কাঁচা চাল দু একটা দিয়ে ফেলিনি এমন নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি বানচাল হওয়া থেকে নৌকোটা বাঁচিয়েছি।
টঙের ঘরে অভিযানে যাবার আগে অবশ্য রসদের কথা ভুলিনি। আমরা প্রথম তিনজন একটু আগে পরে করে যেন নেহাত আড্ডা দেবার জন্যই উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘরে এসে বসবার পর শিবু একটু ব্যস্তভাবেই ঘরে ঢুকেছে। ঢুকেছে সে একলা নয়, সঙ্গে তার বনোয়ারি আর বনোয়ারির এক হাতে ঢাউস টিফিন কেরিয়ার আর অন্য হাতে বড় ঝোলার মধ্যে ডিশ, প্লেট, বাটি, ইত্যাদি তৈজসপত্র।
দিগ্বিজয়ীর হাসি হেসে ঘনাদার দিকে চেয়ে বলেছে, না, লোভ সামলাতে আর পারলাম না, ঘনাদা। নিয়েই এলাম এই নতুন অপূর্ব জিনিস।
নতুন অপূর্ব জিনিস! আমরা সন্দিগ্ধভাবে শিবুর দিকে তাকিয়ে বলেছি, নতুন জিনিস মানে খাবার! এই শহরে পাওয়া যায় অথচ বাহাত্তর নম্বরের অজানা এমন কোনও নতুন খাবার আছে নাকি?
আমরা থামতেই গৌর খেই ধরে বলেছে, দেশি বিদেশি চীনে জাপানি ইরানি তুরানি কাশ্মরী না তামিল—
থাম থাম! কথার মাঝখানে গৌরকে থামিয়ে দিয়ে শিবু বলেছে, আজগুবি বিদেশ বিভূঁইয়ের নয়, এই আমাদের দেশেরই জিনিস, কিন্তু খাসনি কখনও, নামও শুনেছিস কিনা সন্দেহ। শুনেছিস কখনও উত্তাপাম নামটা?
শিবু যতক্ষণ বক্তৃতা দিচ্ছে তার মধ্যে টিফিন ক্যারিয়ার খুলে সর্বপ্রথম ঘনাদার সামনে বনোয়ারি প্লেট, ডিশ সাজিয়ে তার মধ্যে একটা গোলাকার মোটা পরোটার মতো খাদ্য বার করে দিয়ে সঙ্গের ছোট বড় পাত্রগুলোও নাতিতরল বস্তুতে পূর্ণ করে দিয়েছে।
সেইদিকে তাকিয়ে আমাদের দৃষ্টি পরিচালিত করে শিবু এবার বলেছে, এ আহার্য দেখবার ও চাখবার সৌভাগ্য কি কখনও হয়েছে? অথচ এ আমাদের দক্ষিণ ভারতের জিনিস, নাম উত্তাপাম। সঙ্গে ছোট ছোট পাত্রে যা পরিবেশিত হয়েছে সেই নারিকেল মণ্ড চাটনি আর অন্য পাত্রের সম্বর ডালের সঙ্গে সেব্য।
শিবুর বক্তৃতা শেষ হবার আগেই বনোয়ারি সুনিপুণ হাতে আমাদের সকলের সামনেই প্লেটে বাটি বসিয়ে তাতে অভিনব উত্তাপাম সাজিয়ে দিয়েছে।
ঘনাদার মুখে কোনও মন্তব্য এখনও না শোনা গেলেও শিবুর অভিনব আমদানির দু-চার টুকরো যথাযোগ্য অনুপান সহকারে মুখে তুলতে তিনি ত্রুটি করেননি। তাঁর মুখে অতিরিক্ত আহ্লাদ কিছু ফুটে না উঠলেও বিকৃতিও দেখা যায়নি কিছু।
এর মধ্যে শিশির খেলার প্রথম চাল চেলে বলেছে, তা নেহাত অখাদ্য কিছু অবশ্যই নয়, কিন্তু
কিন্তুটা কী? শিবু গরম হয়ে উঠেছে—এই উত্তাপাম, এর মধ্যে কিন্তুটা কোথায় পাচ্ছ শুনি?
