যাঁর উদ্দেশে চিঠিটা পাঠানো হাতে-লেখা তাঁর নামটাই অবশ্য আমাদের পক্ষে যথেষ্ট। নামটা যে শ্রীঘনশ্যাম দাস তা বোধহয় কারওর বুঝতে এতক্ষণে বাকি নেই।
নামের পরে ঠিকানাটা ছিল এক নামকরা বইয়ের প্রকাশকের দোকানের। ঘনশ্যাম দাস নামটা দেখে সেই দোকান থেকেই সে ঠিকানাটা কেটে এই বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনে চিঠিটা রিডাইরেক্ট করে দেওয়া হয়েছে।
চিঠিটা কোথা থেকে আসছে তাও বুঝতে অসুবিধা হয়নি, খামের ওপর লেখা প্রেরক মৌ-কা-সা-বি-স দেখে।
মৌ-কা-সা-বি-স-এর আগের চিঠিটি ঠিক এইভাবেই এক প্রকাশকের ঠিকানায় এসেছিল। সে প্রকাশক অবশ্য আলাদা। মৌ-কা-সা-বি-স-এর সেই একটি চিঠিই এর আগে আমরা পেয়েছি। কিন্তু সে চিঠি এমন যে, প্রথম আমাদের হাতে পড়বার পর থেকেই এই ক-হপ্তা ধরে আমাদের আর সব চিন্তাভাবনা একরকম ভুলিয়ে দিয়েছে।
মৌ-কাসা-বি-স-এর প্রথম চিঠিটার সামান্য বিবরণ যা বেরিয়েছিল যাদের চোখে পড়েনি তাদের জন্য, সংক্ষেপে ব্যাপারটা একটু বলে নেওয়া উচিত মনে হচ্ছে।
মৌ-কা-সা-বি-স যে শব্দগুলির আদ্যক্ষর দিয়ে গাঁথা তা হল মৌলিক কাহিনী-সার বিপণন সংস্থা। প্রায় মাসখানেক আগে এই সংস্থার যে চিঠিটি এক প্রকাশকের ঠিকানা থেকে আমাদের বাহাত্তর নম্বরের পোস্ট বাকসে এসে পৌঁছয় সেটি ঘনশ্যাম দাসের নামেই পাঠানো হয়েছিল।
ঘনশ্যাম দাসের নাম থাকা সত্ত্বেও সে চিঠি যে আমরা খুলে পড়েছিলাম তার সোজা কারণটা এই বলা যেতে পারে যে চিঠিটায় ঘনশ্যাম দাসের নাম থাকলেও সেটা সোজাসুজি তাঁর বাহাত্তর নম্বরের ঠিকানায় না পাঠিয়ে কোনও এক প্রকাশকের মারফত পাঠানো।
এরকমভাবে যে বা যারা চিঠি পাঠিয়েছে তারা ঘনাদার জানাশোনা কেউ যে নয় তা অনায়াসেই ধরে নেওয়া যেতে পারে।
ঘনাদার চিঠি অমন বেপরোয়া খোলার সাহস করার আসল কারণ কিন্তু আলাদা। সে কারণ হল এই যে, ঘনাদার ভাবগতিক যা দেখছি তাতে তিনি তাঁর নামের চিঠি আসাটা যেন পছন্দ করেন না মনে হয়। অপছন্দ করার চেয়ে ভয় করেন বললে যেন তাঁর ধরন-ধারণটা ভাল করে বোঝানো যায়।
শিবুর একটা চিঠির ব্যাপার থেকেই কথাটা আমাদের প্রথম মনে হয়। শিবু সেবার কিছুদিনের জন্য তার এক মামার সঙ্গে পশ্চিমে বেড়াতে গিয়েছিল। চিঠিপত্তর লেখা শিবুর বড় একটা ধাতে আসে না। কিন্তু সেবার ঘনাদাকে একটু উপরি খাতির দেখাবার জন্য সে তাঁর নামেই একটা চিঠি পাঠিয়েছিল আমাদের এই বাহাত্তর নম্বরে। ঠিকানায় হাতের লেখাটা শিবুর বলে বুঝে আগ্রার পোস্ট অফিসের ছাপ দেখে সে বিষয়ে নিশ্চিন্ত হলেও চিঠিটা আমরা খুলিনি। উৎসাহভরে সেটা ঘনাদার কাছেই পৌঁছে দিতে তাঁর টঙের ঘরে হাজির হয়েছি।
কিন্তু তাঁর নামে চিঠি আছে শুনে খুশি হবার বদলে তিনি কেমন অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। সে অস্থিরতাটা বিরক্তির মেজাজ দেখিয়েই ঢাকা দেবার চেষ্টায় তিনি রুক্ষ গলায় বলেছিলেন, চিঠি! আমার নামে চিঠি কোথা থেকে আসবে? কথাগুলো এমনভাবে তিনি বলেছিলেন যেন তাঁর নামে চিঠি আসাটা সরকারি গোয়েন্দা দপ্তরের হুঁশিয়ারির গাফিলতি। চিঠিটা তারপর তিনি আর নিতেই চাননি। চিঠিটা ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে আমরাও বুঝেছি যে কচিৎ কদাচিৎ নেহাত নিজের বিশেষ দরকারে নিজে থেকে দুনিয়ার দু-একজন হেনতেন-র ধরা ছোঁয়ার মধ্যে আসা স্বীকার করলেও তিনি তাঁর ছদ্মনামের অজ্ঞাতবাসে সাধারণ চিঠিপত্রে যোগাযোগের মানুষ নন।
তাঁর নামের চিঠি এলে বিনা দ্বিধাতেই তাই আমরা খুলি। মৌ-কা-সা-বি-স-এর প্রথম চিঠি সেইভাবেই খুলে কিন্তু বেশ একটু মজা পেয়েছিলাম। সে প্রথম চিঠিতে লেখকদের নতুন গল্পের খেই জোগানোই যে মৌ-কা-সা-বি-স-এর ব্যবসা তা জানিয়ে ঘনাদাকে তাঁর গল্পের পুঁজি বাড়িয়ে সাহায্য করবার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। যোগাযোগ করবার একটা উপায় সে চিঠিতে দেওয়া থাকলেও আমরা মজার ব্যাপারটা আরও গড়াতে দেবার জন্য সে চিঠির উত্তর কিছুদিন দিইনি। এরপরে আবার মৌ-কা-সা-বি-স-এর চিঠি পাবই ভেবে নিয়ে অপেক্ষা করেছিলাম ধৈর্য ধরে। আমাদের অপেক্ষা করা বিফল হয়নি।
মৌ-কা-সা-বিস-এর দ্বিতীয় চিঠিটা খুলে নতুন করে উৎসাহিত হবার খোরাকও পেলাম।
প্রথম চিঠিতে কী রকম গল্পের তারা জোগান দিতে পারে তার একটু নমুনা দেওয়া ছিল। এবারের চিঠিতে নমুনা-টমুনা দেওয়ার বদলে প্রথম থেকেই যেন আক্রমণ শুরু।
ঘনশ্যাম দাস আর নয়, সোজাসুজি ঘনাদা বলে সম্বোধন করে লেখা—
কী ঘনাদা, আমাদের চিঠি পেয়ে ভড়কে গেলেন নাকি! একবার একটা চিঠি দিয়ে একটু পরখ করে দেখবারও সাহস হল না? শুনুন, শুনুন, আগে থেকেই ভরসা দিয়ে রাখছি, আমাদের আগে থাকতে কিছু দিতে হবে না। আগে দুচারবার কারবার করে দেখুন। তাতে সন্তুষ্ট হলে তখন যা মর্জি হয় দেবেন। আমাদেরও অবশ্য একটা শর্ত আছে।
কাউকে খদ্দের করবার আগে আমরা তাঁকে একটু যাচাই করে নিই। অনেককাল ধরে অনেক সরেস নিরেস গল্পের ছক প্যাঁচালেন। ঘিলুটা তাতে ঘোলাটে হয়ে গেছে। কিনা একটু পরখ করে নিতে চাই। বেশি কিছু নয়, সামান্য দু-চারটে প্রশ্ন। জবাবগুলো চটপট দিতে পারেন কি না দেখুন। না পারলে জবাবগুলো অবশ্য চিঠিটার ভেতরের পাতাতেই উলটো করে লেখা পাবেন। এমনিতে কথাগুলো যেন আবোলতাবোল, কিন্তু আয়নার সামনে ধরলেই সেখানে সোজা অক্ষরগুলোর সঠিক কথাটা পেয়ে যাবেন। এই যেমন আপনি লেখায় পেলেন,
