এ সব কথা আমায় শোনাবার মানে?
অনেক আগেই লক্ষ করেছি কেগান-এর বাঁ হাতটা স্লিং-এ ঝোলানো থাকলেও সে ডান হাতে একটা পিস্তল ধরে আছে। এবার সেটা আমার দিকে তুলে সে আবার বলল, এ সব কথা আমায় শোনাবার মানে কী?
মানে তো আপনার হাতের ওই পিস্তলই বলে দিচ্ছে। একটু হেসে পিস্তলের মুখটা একটু সরিয়ে দিয়ে বললাম, শুনুন, আপনার র্যাঞ্চ-এর চাষ লোক দেখানো ভুট্টার হলেও আসলে তা আগাছার—আর এমন আগাছার যা মানুষের এতকালের চাষ, তার কৃষিবিদ্যাকে ধ্বংস করার সর্বনাশা আয়োজন করতে পারে। কিন্তু সমস্ত সভ্য মানুষের এমন শত্রুতা আপনি করছেন কেন? করছেন এই জন্য যে আপনার আসল নাম কেগান নয়, জুগার, হ্যাঁ, হের গার—এই নামটা বদলে আপনার আগেকার নাৎসি স্বরূপটা চাপা দিতে চেয়েছেন। সফলও হয়েছিলেন। জার্মানির তখনকার শত্রু সমস্ত দেশের সর্বনাশের জন্য এই আমেরিকায় লুকিয়ে আপনি এক ভয়ংকর শয়তানি চক্রান্ত করেন। সে চক্রান্ত হল এই র্যাঞ্চ চালিয়ে তার মধ্যে এমন একটি আগাছার সৃষ্টি করা যার গ্রাসে আমেরিকার—তার পরে তখনকার মিত্রশক্তির সব দেশের কৃষির সর্বনাশ করে দেবে।
আপনার সে চক্রান্ত কিন্তু সফল হল না। আপনার এ ভয়ংকর শয়তানি চক্রান্ত ধরে ফেলে যিনি আপনার কাছে কাজ নিয়েছিলেন সেই কালা নেংটিটা আপনার ল্যাবরেটরিই শুধু চুরমার করে যাননি, আপনার ভুট্টার খেতে যে সর্বনাশা আগাছা আপনি লালন করছিলেন, উপযুক্ত বীজাণুঘটিত রোগ ধরিয়ে, তা ধ্বংসের ব্যবস্থাও পাকা করে গেছেন। আজ আপনার সঙ্গে দেখা করার আগেই আমি নিজে আপনার চাষের খেত দেখে ও আপনার লোকজনের কাছে খেতের অবস্থা শুনে তা বুঝে নিয়েছি।
আমাকে পিস্তল ছুঁড়ে মেরেও আপনার কোনও লাভ হবে না, মি. গার। কারণ এতক্ষণ সকালে র্যাঞ্চ ঘুরে দেখে আপনার আসল পরিচয়টা জানার দরুন আমি বুলেট প্রুফ ভেস্ট পরে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আর একটা কথা মনে রাখবেন, যে নেংটিটা আপনার এই দশা করেছে আমি তাঁরই দেশের লোক। আমার বুকের বদলে মাথার দিকে পিস্তল উঁচিয়ে গুলি করতে গেলে আপনার পিস্তল সমেত গোটা ডান হাতটাই হয়তো ভেঙে আসতে পারে। সুতরাং সে চেষ্টা না করে কালা নেংটিটার কাছে এফবিআই সব খবর পেয়ে আপনার এখানে নিশ্চিত আসছে জেনে যেটুকু অবসর পেয়েছেন তাতে পালাতে পারেন কি দেখুন।
কোন মানে জুগার তা-ই করেছিল, আর আমি তার কালা নেংটিটাকে মনে মনে অজস্র প্রণাম জানিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলাম।
পরাশর বর্মা থামলেন এবং তারপর যা হবার ঠিকই হল। রামভুজের হাঁড়িয়া কাবাবের সদ্ব্যবহার তো হয়েছেই, সেই সঙ্গে আরও অনেক কিছুর। আর এ সবের মধ্যে ঘনাদা পরাশর বর্মা সম্বন্ধে যা উচ্ছ্বসিত হয়েছেন পরাশর বর্মা হয়েছেন তার দুগুণ।
অবশেষে যাবার সময় হলে ঘনাদা আমাদের ডেকে ট্যাক্সি আনিয়ে পরাশরকে সমাদরে পৌঁছে দিয়ে আসতে বলেছেন তাঁর ডেরায়।
তাই দিতে গিয়ে আমরা ভেবেছি ট্যাক্সিতে ওঠবার পরই শুনব—কী রকম বাঁশ দিয়ে তুললাম আপনাদের ন্যাড়া ছাদের গুলবাজকে, দেখলেন তো!
কিন্তু পরাশর বর্মা সে রকম একটি কথাও বলেননি। তার বদলে বলেছেন, যথার্থ মানীর মান রাখতে পেরেছি এই আমার আনন্দ।
আর ঘনাদা? ভেবেছিলাম, পরাশর বর্মাকে পৌঁছে দিয়ে আসবার পর তাঁর কাছে গিয়ে শুনব–মুখখু, মুখখু, একেবারে রাম মুখখু। শুধু বরাতে করে খাচ্ছে গোয়েন্দা হয়ে।
তার বদলে তিনি বলেছেন, দেখলে তো হে, সেই পুরনো কথার দাম! বিদ্যা। দদাতি বিনয়! পেটে সত্যিকার বিদ্যে আছে তাই ওই বিনয়।
আমরা বুঝেছি যে ঘনাদা ও পরাশর বর্মা দুজনের কাছে আমরাই কিছু শিক্ষা পেলাম।
মৌ-কা-সা-বি-স ও ঘনাদা
না, অনুমানে আমাদের ভুল হয়নি।
একটু ধৈর্য ধরে ক-দিন অপেক্ষা করার পরই আমাদের আশা পূর্ণ হল। চিঠির বাকসটা আমিই খুলতে গিয়েছিলাম। বাকস খুলে চিঠি একটাই পেলাম। কিন্তু সেই একটা চিঠির জন্যই আমাদের এ ক-দিনের এমন হা-পিত্যেশ করে বসে থাকা—
চিঠিটা হাতে পেয়ে খুলে পড়বার আর দরকার হয়নি। ওপরে নামটা যা লেখা আছে সেইটুকুই তখন যথেষ্ট।
সেই নামটুকু দেখে নিয়েই সোজা ওপরে ছুটে গেছি। না, আমাদের আড্ডাঘরে নয়। এই ভরদুপুরবেলা সে জায়গাটা এক রকম নিরাপদ হলেও, সাবধানের-মার-নেই বলে, সটান গৌর আর শিবুর কামরাতেই বেশ একটু হাঁফাতে হাঁফাতে গিয়ে ঢুকেছি। হাঁফানোটা অবশ্য সবটাই সিঁড়ি দিয়ে এক-এক লাফে দুটো করে ধাপ পেরিয়ে আসার জন্য নয়। ব্যাপারটার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য ওটা একটু বাড়তি অভিনয়।
সে অভিনয়টুকুর অবশ্য দরকার ছিল না।
শিবু বাদে গৌর আর শিশির দুজনেই তখন সে ঘরে গৌরের খাটের ওপর বসে দেখা-বিন্তি খেলছে।
আমায় ঢুকতে দেখেই তারা বিছানা থেকে লাফিয়ে নেমে প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, এসেছে! এসেছে তাহলে?
আমার চোখমুখের উত্তেজনা আর বাড়তি হাঁফানিটুকুর জন্য নয়, আমার হাতের লেফাফাটিই তাদের লাফ দিয়ে ওঠানোর পক্ষে যথেষ্ট।
আরে চুপ! চুপ! টঙের ঘর পর্যন্ত কাঁপিয়ে তুলবে যে! বলে ওদের থামিয়ে লেফাফাটা এবার সামনের টেবিলে রাখলাম। হ্যাঁ, এ যে আমাদেরই বড় আশার ধন সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
ব্রাউন রঙের লম্বাটে অফিসের কাজে যেমন ব্যবহার হয় সেই জাতের খাম। খামটার ওপরে নামঠিকানা টাইপ করার বদলে হাতেই লেখা।
