আজ্ঞে না, হুজুর?—লোকটা বলেছিল—আমি শুধু বলছি যে কালাদানোকে ধরা ভাল হবে না। সেটা উচিত নয়।
কেন উচিত নয়?—খিঁচিয়ে উঠেছিলাম লোকটার ওপর—তোর মতো কালা নেংটির কালাদানোকে ধরবার ক্ষমতা নেই তাই বল।
ক্ষমতা আছে কি না তা তো দেখতেই পাবেন, হুজুরনেংটিটা তবু যেন ধাপ্পা দিয়ে মান বাঁচাবার চেষ্টা করে বলেছিল কিন্তু ওরকম তেজি স্বাধীন রাজা-ঘোড়া একবার হার মেনে ধরা পড়তে বাধ্য হলে সে অপমান হজম করে আর বাঁচবে কি তাই আমার সন্দেহ হচ্ছে।
থাম! থাম!—এবার সত্যিই জ্বলে উঠে আমার হান্টারটা দেখিয়ে বলেছিলাম—তোর বাহাদুরি সব বোঝা গেছে, এক কালাদানোকে ধরে আনতে পারিস তো আন, নইলে হান্টার দিয়ে চাবকে এ মুল্লুক ছাড়া করব।
আপনার যা মর্জি বলে লোকটা চলে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম নেংটিটা আর এ মুখো হবার সাহসই করবে না।
দুদিন তার দেখাও পাইনি সত্যিই। কিন্তু তার পরে তিন দিনের দিন সকালে ঘুমভাঙার পর আমার শোবার ঘরের বাইরে লোকজনের হইচই হাঁকডাক শুনে। বাইরে এসে একেবারে তাজ্জব।
সেই কালা নেংটিটা ফিরে এসেছে।
আর ফিরে এসেছে একা নয়, সেই আমার র্যাঞ্চ-এ জীবন্ত তুফানের মতো দুর্দান্ত বুনোঘোড়া কালাদানোর ওপর সওয়ার হয়ে।
কথার খেলাপ না করে নেংটিটাকে কাজ দিলাম। কী কাজ করবি তুই? প্রথমে জিজ্ঞাসা করেছিলাম অবশ্য। সে বলেছিল—আজ্ঞে, যে কাজ দেন তাই করব। তবে র্যাঞ্চটা তদারকি করতে দিলেই ভাল হয়।
ভাল হয়?—নেংটিটাকে ক-দিন খাটিয়ে তার হাড় কালি করার ব্যবস্থা করে বিদায় করব ঠিক করে নিয়ে বলেছিলাম—বেশ, তাই কর।
সেই বলাই যে আমার কাল হবে তা তখন ভাবতে পারিনি। ক-দিন বাদে লোকটাকে আমার ভুট্টাখেতের মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে দেখে বিরক্ত হয়ে বলেছিলাম—তোকে এ খেতের বেড়া মেরামত করতে বলেছিলাম। খেতের ভেতর তুই করছিস কী?
সে এতটুকু অপ্রস্তুত না হয়ে বলেছিল—খেতের ভেতর সর্বনাশা পোকা হয়েছে, তাই তাদের মারবার ব্যবস্থা করছিলাম।
পোকা হয়েছে? আমার খেতে? খেপে উঠে বলেছিলাম—আমার সঙ্গে চালাকি হচ্ছে? কী পোকা হয়েছে, তাই বল?
না, আজ্ঞে, সে পোকা আপনি চিনবেন না—নেংটিটা সোজা আমার মুখের ওপর বলেছিল—তবে সে পোকা আজ রাত্রে আপনাকে দেখিয়ে দেব।
রাত্রে আমার খেতের বাইরের সীমানার ওপর নানা জায়গায় আগুন জ্বেলে সে সত্যিই আলোর টানে উড়ে এসে আগুনে ঝাঁপ দেওয়া রাশি রাশি পোকা আমায় দেখিয়ে বলেছিল—এর নাম মাজরা পোকা। এ আপনার দেশের পোকা নয়।
আমার দেশের পোকা নয়, এখানে এল কী করে?-রেগে জিজ্ঞাসা করেছিলাম তাকে।
দরকারে কোথাকার পোকা কোথায় আসে কেউ জানে?—বলে নেংটিটা আমার হাতের একটা রাম-রদ্দা খাবার ভয়েই বোধহয় সরে পড়েছিল। কিন্তু পরের দিন সকালেই আমার ল্যাবরেটরিতে তাকে একটা টেবিলে বসে যন্ত্রপাতি টিউব ইত্যাদি মন দিয়ে নাড়াচাড়া করতে দেখে একেবারে আগুন হয়ে উঠে বলেছিলাম-তুই এখানে? আমার ল্যাবরেটরিতে? কার হুকুমে এখানে ঢুকেছিস?
হুকুম আবার কার!—সে নেংটিটা বেপরোয়া গলায় জবাব দিয়েছিল—সমস্ত র্যাঞ্চ তদারকি করা আমার কাজ। তাই ল্যাবরেটরিতে কী হচ্ছে তাই দেখছি।
তাই দেখছিস! তোর ওই দেখার চোখ দুটোই উপড়ে ফেলে দেব!বলে তার ঘাড়টা মটকাবার জন্য ধরতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ কী যে হল। নেংটিটা কী এমন শয়তানি প্যাঁচ লাগাল যে ঘাড়মাথাটা দেয়ালে ঠুকে একেবারে সচাপ্টে ছিটকে গিয়ে পড়লাম। তখন আর ওঠবার ক্ষমতা নেই। সেই অবস্থাতেই দেখলাম ওই ঘরেরই একটা লোহার ডাণ্ডা নিয়ে সে সমস্ত ল্যাবরেটরি চুরমার করে দিয়ে আমার লক্ষ লক্ষ ডলারের সব গবেষণা নষ্ট করে দিচ্ছে। ল্যাবরেটরি ধ্বংস করার পর সে পালিয়েছে, কিন্তু আমেরিকা ছেড়ে এখনও যেতে পেরেছে বলে মনে হয়। আমার এমন বন্ধুবান্ধব কিছু আছে যারা তা হলে আমায় ঠিক খবর দিত। এখন আপনাকে যেমন করে হোক এই কালা নেংটিটাকে ধরে আমায় হাতে তুলে দিতে হবে। আমি একটা একটা করে তার প্রত্যেকটা অঙ্গ ছিঁড়ে ছিঁড়ে তার সামনে ঝোলাব–
খুব সাধু সংকল্প আপনার! কেগানকে তার হিংস্র উল্লাসের মাঝখানে থামিয়ে বললাম, কিন্তু তার আগে আপনাকে কয়েকটা তথ্য শোনাই। আপনি জানেন নিশ্চয়ই যে দুনিয়ায় প্রায় দু-লক্ষ আগাছা আছে, তার মধ্যে অধিকাংশ আগাছাই মানুষের খেত-খামার থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু কিছু এমন কড়া আগাছা আছে যারা কোনও মতে হার মানে না। তাদের কারও বীজ মাটির তলায় ত্রিশ-চল্লিশ বছর অনায়াসে ঘুমিয়ে থেকে আবার সুযোগ পেলেই–
আমি এ সব কথা বলতে বলতে লক্ষ করছিলাম, কেগানের মুখ এ সব শুনতে শুনতে প্রথমে কেমন হতভম্ব, পরে একেবারে রাগে লাল হয়ে উঠছে। সে তারই মধ্যে গনগনে গলায় আমায় বললে, এ সব কী প্রলাপ বকছেন আপনি?
ও, প্রলাপ মনে হচ্ছে? আমি যেন দুঃখিত হয়ে বললাম, তা হলে প্রলাপ না মনে হয় এমন কথা বলছি শুনুন—ব্র্যসিকা নায়গরা নামটা শুনলে আপনি হয়তো খুশি হবেন। ওর একটা আটপৌরে নামও আছে—
–ব্ল্যাক মাস্টার।
কে? কে বললেন কথাটা! না, পরাশর বর্মা কি তাঁর মুখ দিয়ে শোনা কেগান-এর কথা নয়।
এ উচ্চারণটি স্বয়ং ঘনাদার।
পরাশর বর্মা হাত তুলে সেলামের ভঙ্গি করে বললেন, ঠিক বলেছেন। ব্ল্যাক মাস্টারনামটা শুনিয়ে তারপর আবার কেগানকে বললাম, অনেক এমন নামগান আপনাকে শোনাতে পারি। এদের মধ্যে কোনওকোনওটি যে জমিতে জন্মায় সেখানকার ফসল শুধু ধ্বংস করার নয়, তা বিষিয়ে দেবার ক্ষমতাও আছে। ধরুন—অ্যানেস্থেরা বিয়েন্নিশ-নামটা একটু বাঁকাচোরা করেই বললাম, তবে ওর আটপৌরে নাম ইভনিং প্রিমরোজ নামটায় কোনও গোলমাল নেই। ওইরকম নামের দু-চারটে আগাহাকে চেষ্টা করে সর্বনাশা করে তোলা যায় নাকি, যাতে মানুষের এত যুগের চাষবাসের নাভিশ্বাস উঠতে পারে—
