কেগান-এর র্যাঞ্চ একটা দেখার মতো জায়গা। মাইলের পর মাইল কোথাও যেন সীমানেই ঢেউ-খেলানো আধা-বুনো ঘোড়ার পাল চরিয়ে বড় করবার প্রান্তর। কোথাও বা তেমনই বিশাল ভুট্টার খেত। সে এমন যে দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।
দেবতাদের কাছেও লোভনীয় এইসব তুলনাহীন র্যাঞ্চ-এর এক দারুণ দুশমনকে ধরে এনে কেগান-এর হাতে তুলে দেবার জন্য আমার সেখানে ডাক পড়েছিল।
কেগান-এর সঙ্গে আমার যেখানে দেখা হল সেটা ওই র্যাঞ্চ-এর মধ্যেই তার একটা ছোট ল্যাবরেটরি।
কিন্তু সে ল্যাবরেটরির চেহারা দেখে মনে হল দুটো খ্যাপা মোষ যেন তার মধ্যে তোতি করে সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। অবস্থা তাতে যা দাঁড়িয়েছে তাতে ভাঙচুর জিনিসের আবর্জনার স্তুপে চালান করা ছাড়া কোনও গবেষণার কাজ আর তা দিয়ে যে চালাবার নয় তা বুঝতে দেরি হয় না।
ল্যাবরেটরির অবস্থা স্বচক্ষে আমি যাতে দেখি সেই জন্যই নিশ্চয় কোন সেখানে আমাদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেছিলেন। ল্যাবরেটরির মতো তার মালিকের অবস্থাও অবশ্য শোচনীয়। তাঁর মাথায় একটা চওড়া ব্যান্ডেজ বাঁধা, বাঁ হাতটাও কাঁধ থেকে একটা স্লিং-এ ঝোলানো।
কেগান কম কথার মানুষ। চুরমার হওয়া ল্যাবরেটরি আর নিজের জখমি চেহারার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা না করে সোজাসুজি বললে, দেখুন, মিস্টার ভর্মা, এখানে যা দেখবার, দেখেছেন। এ ছাড়া আমার সমস্ত র্যাঞ্চটা আপনাকে ভাল করে দেখাবার ব্যবস্থা আমি করছি। এ সব দেখে এই ল্যাবরেটরি নিয়ে আমার এই র্যাঞ্চ-এর সব দিক দিয়ে চরম সর্বনাশ যে করেছে তাকে যে কোনও উপায়ে তোক ধরে আমার হাতে তুলে দেবার ব্যবস্থা আপনাকে করতেই হবে। এ ব্যাপারে কাগজে কাগজে জানাজানি আর পুলিশের ঘাঁটাঘাঁটি আমি চাই না। তাই সম্পূর্ণ নিঃশব্দে গোপনে কাজটা হাসিল করার ভার আপনার ওপর দিতে চাই। ওই সঙ্গে এ কথাটাও জানিয়ে দিচ্ছি যে খরচার ব্যাপার আপনি যা দরকার মনে করেন, করতে পারবেন। এখন আমার এক কর্মচারীকে দিয়ে আপনাকে র্যাঞ্চটা দেখাবার ব্যবস্থা করি।
কেগান তার একজন কর্মচারীকে ডাকতে যাচ্ছিল। আমি যে এখানে আসার পরে—কেগান-এর সঙ্গে বিকেলে দেখা হওয়ার আগেই-র্যাঞ্চ-এর যা যা বিশেষ দেখবার তা দেখা সেরে ফেলেছি সে কথা জানিয়ে কেগানকে বাধা দিয়ে বললাম, শুনুন, দরকার হলে যা দেখবার সময়মত দেখা যাবে। তার আগে যে মানুষটিকে ধরে এনে আপনার হাতে তুলে দিতে বলছেন তার একটু বিবরণ আর পরিচয় আমার জানা দরকার নয় কি? মানুষটা কে, কোথা থেকে এল, কী কাজে তাকে লাগিয়েছিলেন, সবই আমি জানতে চাই।
দেখুন, তার দুশমনির কথা মনে করতে গিয়েই রাগে আক্রোশে মুখটা বিকৃত করে কেগান বললেন, সত্যি কথা বলতে গেলে লোকটা সম্বন্ধে আমি কিছু জানি না।
কিছু না জেনে তাকে আপনার র্যাঞ্চ-এ কাজ দিয়েছিলেন? আমি একটু সন্দিগ্ধ মুখেই জিজ্ঞাসা করে বললাম, এরকম দস্তুর তো আপনাদের নয়।
না, তা নয়, কেগান অত্যন্ত আফশোসের সঙ্গে স্বীকার করলে, কিন্তু এরকম আহাম্মুকি করার তখন একটা কারণ ছিল। র্যাঞ্চ-এ কাজ নেবার জন্য ভবঘুরে হাঘরে গোছের উটকো লোকই আসে। দেখামাত্র তাদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সেদিন একটা শুটকো কালা মর্কট গোছের চেহারার হাঘরে এসেছিল। অমনই কাজের খোঁজে। তাকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তার মাঝে সে হঠাৎ মেজাজ দেখিয়ে বলল—আমাকে দেখেই তাড়িয়ে দিচ্ছেন কেন? একটা যা হোক কাজ দিয়ে দেখুন না। না পারলে দূর করে দেবেন।
লোকটাকে দেখেই আমার কেমন অদ্ভুত লেগেছিল। ও ধরনের চেহারা আমাদের এ অঞ্চলে চোখেই পড়ে না। এখানকার আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ান নয়, কাফ্রি-টাফ্রি তো নয়ই। শুটকো পাকানো, খেতে-না-পাওয়া কেলে চেহারা দক্ষিণের মেক্সিকোর কোনও পাহাড়ি আদিবাসী-টাসী হবে ভেবেছিলাম। আমার র্যাঞ্চ-এর বুনো ঘোড়ার পাল আপনার এখনও হয়তো চোখে পড়েনি। সে পাল দেখলে বুঝবেন আমেরিকার এই দক্ষিণাঞ্চলের কোথাও কোনও র্যাঞ্চ-এ এমন দুর্দান্ত বুনো ঘোড়ার পাল নেই, এদের মধ্যেও আবার কালাদানো বলে এমন একটা দারুণ তেজি বুনো ঘোড়া আছে, কোনও রাখাল এখনও যার গলায় ল্যাসো-র ফাঁস লাগাতে পারেনি। আমার ঘোড়ার রাখালরা অন্য ঘোড়া-টোড়া যা দরকার মতো ধরাবাঁধা করুক, ও কালাদানোর কাছেও ঘেঁসে না। বুনো ঘোড়াদের ভেতরও দৈত্যের মতো তাদের রাজার মতো এই কালাদানো নিজের খুশিতে ঘুরে বেড়ায়। একজন অতি সাহসী তাকে বাগে আনবার আহাম্মকি করতে গিয়ে হাত-পা তো বটেই, প্রাণটা পর্যন্ত গুনাগার দিয়েছে।
শুঁটকো মর্কটটার জাঁক শুনে তাকে একটু উচিত শিক্ষা দেবার জন্য ঠাট্টা করে বলেছিলাম—হ্যাঁ, কাজ তুই পাবি কালা নেংটি! তার জন্য কী করতে হবে জানিস?
আজ্ঞে, বলন কী করতে হবে।—কালা নেংটিটা বিনয়ে যেন গলে যাচ্ছে।
বললাম—আমার র্যাঞ্চ-এ ঘোড়ার পালটা দেখেছিস?
পাল আর কী দেখব, হুজুর–নেংটিটা তার বিনয়ে গদগদ গলাতেই একটু তাচ্ছিল ফুটিয়ে বলেছিল—দেখেছি আপনার কালাদানোকে! হ্যাঁ, ঘোড়ার মতো ঘোড়া বটে একটা!
বটে!—লোকটার মুখে কালাদানোর এই প্রশংসাতেও জ্বলে উঠে বলেছিলাম—তা হলে কালাদানোকেই বাগ মানিয়ে ধরে নিয়ে আয়, তা হলেই এখানে চাকরি তোর পাকা।
কিন্তু বলে লোকটা এবার একটু সুর টানতেই তার জারিজুরি খতম হয়েছে বুঝে বলেছিলাম কিন্তু আবার কী? সে মুরোদ তোর নেই, এই তো?
