দুধের সাধ ঘোলে মেটে না জেনেও এত কষ্টে সাজানো ব্যাপারটা পুরোপুরি পণ্ড হতে দেবার জন্য কৃত্তিবাসকে নিয়েই বাহাত্তর নম্বরে ঢুকতে হল।
সিঁড়ি দিয়ে কৃত্তিবাসকে নিয়ে ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সাজানো প্রোগ্রামের আর-এক চালের ভুলের নমুনা পেলাম।
ব্যবস্থা ছিল এই যে আমরা পরস্পরকে নিয়ে যখন ওপরে উঠে আসব তখন ঘনাদা আড্ডাঘরে তাঁর মৌরসি কেদারায় প্লেটে করে হাঁড়িয়া কাবাবের নমুনা চাখতে ব্যস্ত থাকবেন। ঠিক তখনই আমরা পরাশর বর্মাকে তাঁর কাছে হাজির করব এইটেই প্রোগ্রামের একটা ছকা চাল।
পরাশর না হয়ে কৃত্তিবাস হলেও আড্ডাঘরে ঢোকার পর ঘনাদার সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হলে যৎকিঞ্চিৎ একটা পালা হয়তো জমানো যেতে পারত।
কিন্তু কেমন করে যেন ঘনাদার সঙ্গে বেটপ্পা বারান্দার ওপরই দেখা হয়ে গেল। দেখা হয়ে যাবার পর আমাদের পাকা চালগুলো কেঁচে গিয়ে এত তোড়জোড় আর হয়রানির যৎসামান্য একটু উসুল করবার মতো কিছু পাওয়া যাবে কি?
তা অবশ্য গেল।
আর যা গেল তা আমাদের সব হিসেবের বাইরে।
ন্যাড়া সিঁড়ির নীচের ধাপ থেকে বারান্দার অন্য প্রান্তে কৃত্তিবাসের সঙ্গে আমাদের দেখে ঘনাদা অমন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবেন কে ভাবতে পেরেছিল?
উচ্ছ্বসিত অবস্থাতেই বিদ্যাসাগরি চটি ফটফটিয়ে আমাদের দিকে আসতে আসতে তিনি বললেন, আরে পরাশর যে! এসো, এসো! তুমি হঠাৎ আসবে এ যে ভাবতেই পারিনি।
ঘনাদা আমাদের দেখে এমন উচ্ছ্বসিত হবেন তাও ভাবতে পারিনি আমরা। একটু হতভম্ব অবস্থাতেই ঘনাদার ভুলটা সংশোধনের জন্য তবু ব্যস্ত হতে হল।
ইনি পরাশর নন, ঘনাদা—মানে ইনি তাঁরই বন্ধু আর প্রতিনিধি কৃত্তিবাস ভদ্র, মানে–
ওইখানেই আমাদের এক ধমকে থামিয়ে ঘনাদা বললেন, বটে! উনি পরাশর নন, কৃত্তিবাস? জাত জেলেকে কই দেখিয়ে তেলাপিয়া বোঝাচ্ছ? পাকা মালিকে বাগানে লিচু দেখিয়ে বলছ আঁশফল? ও যদি পরাশর না হয় তা হলে আমি–
না, না ওঁদের কোনও দোষ নেই— আমাদের অবস্থা দেখেই বোধহয় কৃত্তিবাস এবার দয়া করে গোলমালের জটটা ছাড়ালেন।
কিন্তু তিনি যা বললেন তাতে আমরা আবার থ।
আমাদের কৃত্তিবাস নাকি সত্যিই কৃত্তিবাস নন, তিনিই আদি ও অকৃত্রিম পরাশর বর্মা। কৃত্তিবাস ভদ্র কিছুদিনের জন্য কোনও এক সাংবাদিক সম্মিলনীতে দূরে কোথাও গেছেন বলে পরাশর তাঁর বাড়িতেই ক-দিনের জন্য অজ্ঞাতবাসে আছেন। সেই অবস্থায় আমরা সেখানে তাঁকে দেখে একটু দ্বিধাগ্রস্ত হই বলেই তার সুযোগ নিয়ে তিনি নিজেকে কৃত্তিবাস বলে চালিয়েছেন। ছদ্মনামে এখানে এলেও তাঁর সত্যকার উদ্দেশ্যটা এবার তিনি সরবে ঘনাদাকেই উদ্দেশ করে বললেন, মিথ্যে নাম দিয়ে এখানে আসার সত্যিকার উদ্দেশ্য হল আপনাকে দেখে আপনার পায়ের ধুলো নেবার সুযোগ নেওয়া।
কথাগুলো বলতে বলতে আমাদের কৃত্তিবাস থুড়ি পরাশর বর্মাকে সত্যিসত্যি নিচু হয়ে ঘনাদার পায়ের ধুলো নিতে দেখে আমরা তো থ।
আমাদের সাজানো নাটক আসল অভিনয়ে এ রকম দাঁড়াবে আমরা কি ভাবতে পেরেছি!
এরপর বিস্ফারিত চোখে যা যা দেখলাম সে সবই আমাদের হিসেবের বাইরে। বিবরণটা পরপর শুধু দিয়ে যাই।
কৃত্তিবাস থুড়ি আসলে পরাশর পায়ের ধুলো নিতে নিচু হতেই—আরে, করো কী করো কী বলে ঘনাদা যে আলতো বাধা দিলেন তাতে কৃত্তিবাস থুড়ি পরাশর বর্মার ধুলো না মিলুক, পা ছুঁতে কোনও অসুবিধা হয় না।
ঘনাদা এবার পরম সমাদরে কৃত্তিবাস থুড়ি পরাশরকে তুলে তাঁকে সঙ্গে নিয়ে আড্ডাঘরে ঢুকলেন। সঙ্গে সঙ্গে গেলাম অবশ্য আমরাও।
এ দুই ক্ষণজন্মার মিলনের জন্য ঘনাদার মৌরসি কেদারার জুড়ি আর একটি কেদারা আগে থাকতে আমরাই পাতিয়ে রেখেছিলাম।
সে দুই কেদারাতেই বসে দুজনের আলাপ যেটা শুরু হল সেইটেই আমাদের চিত্রনাট্যের একেবারে উলটো।
দুজনের দেখা হবার পর কাছাকাছি বসার সঙ্গে সঙ্গে ঠোকাঠুকিতে আগুনের ফুলকি ছোটাবার কথা, তার বদলে মধু ঝরে পড়তে লাগল যেন দুজনের জিহ্বা দিয়ে।
নিজেদের কানে শুনতে হল ঘনাদা বলছেন, কতবার ভেবেছি এদের কাউকে দিয়ে তোমায় একবার বাহাত্তর নম্বরে ডাকিয়ে আনি। কিন্তু তুমি ব্যস্ত মানুষ, তার
ওপর তোমার এত নাম-ডাক। সত্যিই আসবে কি না বুঝতে না পেরে —
না, না, কী বলছেন, কী! ঘনাদাকে থামিয়ে পরাশর—হ্যাঁ, সত্যিই পরাশর আবার মধু বর্ষণ শুরু করেন, আমারই কতদিন ধরে আসবার ইচ্ছে। শুধু আপনি পাছে বিরক্ত হন এই ভয়ে—
না, না বিরক্ত হব কী— বলে ঘনাদা মহানুভবতার পরিচয় দিতে যাচ্ছিলেন। তার আর অবসর না দিয়ে পরাশর তৎক্ষণাৎ আবার সচ্ছাসে বলে ওঠেন, তবে চোখে না দেখলেও যেখানে গেছি সেখানেই আশ্চর্য সব কাণ্ডের মধ্যে আপনার হাতের ছাপ ঠিক ধরতে পেরে ধন্য ধন্য করেছি মনে মনে। এই তো সেদিন টেকসাসেনা, না অ্যারিজোনায় সেই ক্রুগার-এর আজব ভুট্টার খামারে। কোন ক্রুগার-এর কথা বলছি আপনি তো বুঝতেই পারছেন।
ঘনাদাকে একটু কি অপ্রস্তুত দেখিয়েছে। দেখালেও তা সেকেন্ড দু-একের জন্য। তাতেই সামলে তিনি বলেছেন, সেই ওটিস ক্রুগার-এর কথা বলছ তো।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেই ওটিস কুগার! ঘনাদার স্মরণশক্তিতে যেন অবাক হয়ে বলেন। পরাশর, সে তো আসলে গুপ্ত এক নাৎসি শয়তান হিটলারের জার্মানিতে একটা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প চালাত। তারপর যুদ্ধে জার্মানির হার হবার পর লুকিয়ে বারবার নাম ভাঁড়িয়ে অনেক ছলচাতুরি করে আফ্রিকা থেকে অস্ট্রেলিয়া, সেখান থেকে কানাডা হয়ে আমেরিকার দক্ষিণে পালিয়ে আসে। সে যে সেখানে এসেও কী সর্বনাশা শয়তানি চক্রান্ত আঁটছিল সেটা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যারা জার্মানির বিপক্ষে ছিল সেই সমস্ত দেশের মানুষের মধ্যে কে যে প্রথম ধরে ফেলেন আর তার উপযুক্ত ব্যবস্থা করেন তা আমেরিকার অ্যারিজোনা থেকে এক মি. কেগান-এর জরুরি ডাক পেয়ে সেই কেগান-এর বিরাট র্যাঞ্চ-এ যাবার পর বুঝলাম।
