কত কায়দা করেই না সমস্ত দৃশ্যটা ছকে রেখেছি।
পরাশর বর্মাকে নীচে থেকে অভ্যর্থনা করে আমরা তাঁকে নিয়ে ওপরের আড্ডাঘরে গিয়ে ঢুকব। ঘনাদাকে তার আগেই রামভুজের হাঁড়িয়া কাবাবের নমুনা চাখাবার জন্য তাঁর মৌরসি কেদারায় বসিয়ে হাতে একটা প্লেট ভর্তি কাবাব আর চামচ ধরিয়ে দেওয়া থাকবে।
বারান্দা থেকে আড্ডাঘরে ঢুকে আমরা উচ্ছ্বসিত হয়ে বলব, দেখুন, ঘনাদা, কাকে আজ ধরে এনেছি, দেখুন।
আমাদের উচ্ছ্বাসের বাড়াবাড়িতে ঘনাদার মেজাজটা খুব খোশ তখন নিশ্চয়ই নেই। তিনি ভুরু কুঁচকে অকিঞ্চিৎকর কিছু দেখার ভঙ্গিতে একবার একটু ঘাড় ফিরিয়েই আবার তা ঘুরিয়ে নিয়ে হাঁড়িয়া কাবাব চাখায় মনোনিবেশ করবেন।
আমরা ততক্ষণে পরাশর বর্মাকে ঘরের মধ্যে তাঁর কাছাকাছি এনে ফেলেছি। একসঙ্গে দু-তিনজনের গলায় তখন কলধ্বনি উঠবে—কাকে এনেছি জানেন? স্বয়ং পরাশর বর্মা আজ আমাদের এখানে পায়ের ধুলো দিয়েছেন।
এবার যা হবে সেইটেই দেখবার মতো।
ঘনাদা হাঁড়িয়া কাবাবের প্লেট থেকে যেন একটু করুণা করে চোখ তুলে পরাশর বর্মার দিকে তাকাবেন। তারপর আবার প্লেটের দিকেই চোখ ফেরাতে ফেরাতে বলবেন, বেশ! বেশ! পায়ের ধুলো যখন দিয়েছেন তখন ওঁকে বসতে বলো। তা উনি করেন কী?
উনি করেন কী? ওঁকে আপনি চেনেন না? উনি হলেন অদ্বিতীয় গোয়েন্দা পরাশর বর্মা।
ভাল! ভাল। এ সব লোকের সঙ্গে আলাপ থাকা ভাল। বসুন, গোয়েন্দা মশাই, আরাম করে বসুন।
যাঁকে এমন করে হেনস্থা করার চেষ্টা সেই পরাশর বর্মা কি নীরবে এই অপমান সয়ে যাবেন?
পালটা কোনও জুতসই মার কি তাঁর ভাঁড়ারে নেই। তা থাকবে বই কী?
ঘনাদার ব্যঙ্গ অনুরোধের আগেই আমরা অবশ্য এই দিনটির জন্যই আনানো ঘনাদার কেদারার দোসর একটিতে পরাশর বর্মাকে পরম সমাদরে বসিয়ে দিয়েছি।
তিনি কিন্তু ঘনাদার মতো ব্যঙ্গ বিদ্রুপের সুরে নয়, বেশ সহজ স্বাভাবিক গলায় আমাদের শুধু জিজ্ঞাসা করবেন এবার আচ্ছা, আপনারা আমার পরিচয় দিচ্ছেন, কিন্তু উনি কে তা তো জানতে পারলাম না।
উনি! উনি!—আমাদের এবার আবার একবার গদগদ হবার পালা-উনি হলেন। ঘনাদা—
ভনাদা?—পরাশর বর্মার মুখের ভাবে আর গলার স্বরে যেন অকৃত্রিম সারল্য, কিন্তু মার হিসেবে ঘনাদাকে ভনাদা শোনা বুঝি একেবারে মোক্ষম!
এরপরে যা হবে তা বুঝি আমাদের বানিয়ে ভাববারও ক্ষমতা নেই। সেই দুই মহারথীর তিরন্দাজি বাহাদুরির জন্য অপেক্ষা করার ধৈর্ষটুকু শুধু চাই।
সেই ধৈর্য ধরতে আমরা প্রস্তুত, কিন্তু আসর যাঁরা মাত করবেন সেই দুই। তালেবরের ঠিক মতো মোলাকাত তো চাই।
পরাশর বর্মাকে নিজেরা গাড়ি নিয়ে গিয়ে আনবার জন্য তাই অত ব্যস্ত। হয়েছিলাম। কিন্তু সে ইচ্ছে যখন পূরণ হবার নয় তখন তাঁর প্রতিনিধি কৃত্তিবাস ভদ্রের কথায় বিশ্বাস করে তাঁর জন্য বাহাত্তর নম্বরের গেটেই অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় কী?
অপেক্ষা করার দিক দিয়ে অবশ্য কোনও ত্রুটি রাখিনি। পরাশর বিকেল ঠিক চারটের সময় বাহাত্তর নম্বরের দরজায় হাজির হবেন বলে কথা দিয়েছিলেন তাঁর প্রতিনিধি কৃত্তিবাস। আমরা কোনও দিকে কোনও ভুলচুকের ফাঁক না রাখবার জন্য একেবারে বেলা তিনটে থেকেই দরজার বাইরের রাস্তায় খাড়া। খাড়া একলা কেউ নয়—চারজনই এক সঙ্গে। ঘড়ি আমাদের সকলেরই হাতে আর তা রেডিয়োর সঙ্গে দফায় দফায় মেলানো।
কিন্তু তিনটে থেকে সওয়া তিনটে, সাড়ে তিনটে, পৌনে চারটে প্রায় বাজতে চলল। পরাশর বর্মার এখনও দেখা নেই।
আমরা একবার নিজেদের ঘড়ির দিকে আর তারপর রাস্তার দিকে তাকাচ্ছি। রাস্তাটা—আমাদের গলিটা যাতে গিয়ে পড়েছে সেই সদর রাস্তা। সেদিকে ব্যাকুল হয়ে তাকাবার সঙ্গে কানটাও খাড়া রাখতে ভুলিনি। ট্যাক্সি বা প্রাইভেট গাড়ি যাতেই পরাশর বর্মা আসুন আগে থাকতে তার আওয়াজটা পাবই।
কিন্তু তিনটে সাতান্ন আটান্ন উনষাট হয়ে কাঁটা দুটো চারটের দাগ ছুঁই ছুঁই করতে চলেছে। পরাশর বর্মার কি সময়জ্ঞান বা কথা রাখার কোনও বালাই নেই। তাঁর হয়ে কৃত্তিবাস ভদ্র কথা দিয়েছেন যে ঠিক চারটের সময় তিনি বাহাত্তর নম্বরের দরজায় হাজির হবেন। চারটের সময় বলে তিনি পাঁচটা-ছ-টা করবেন নাকি? না, একেবারেই আসবেন না?
তা হলে আমাদের সব আশায় ছাই।
কোনও লাভ নেই জেনেও সামনের বড় রাস্তার দিকে একটু এগিয়ে দেখব কি না ভাবছি, এমন সময়—এই যে! শুনে চমকে একটু পেছনে ফিরে তাকিয়ে একেবারে যেমন হতভম্ব তেমনই একটু অপ্রস্তুত।
সেখানে স্বয়ং পরাশর বর্মা না হলেও তাঁর প্রতিনিধি কৃত্তিবাস ভদ্র হাসি মুখে বলছেন, এইটেই তো আপনাদের বাহাত্তর নম্বর।
নিজেদের ঘড়িগুলোর দিকে চেয়ে দেখি সেখানে ঠিক কাঁটায় কাঁটায় চারটে! হতভম্ব বেশ একটু হলেও যতটা অপ্রস্তুত হবার কথা ততটা যে হইনি তার যথেষ্ট কারণ অবশ্য আছে। সোজা সামনের রাস্তা ছেড়ে আমাদের বনমালি নস্কর লেনটা পেছনে যেসব সরু সরু জঘন্য গলির গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেছে—আর যেসব গলি ব্যবহার করা দূরে থাক, ভাল করে চিনি-ই না—সেই পথেই তিনি আসবেন তা ভাবব কী করে!
তা ছাড়া যিনি এসেছেন তিনি তো পরাশর বর্মা নন, তাঁর প্রতিনিধি কৃত্তিবাস ভদ্র। আসার কথা থাকলেও পরাশর নিজে এলেন না কেন?
আমাদের মনের প্রশ্নটা মুখে ফোটবার আগেই কৃত্তিবাস নিজে থেকেই জবাবটা দিয়ে জানালেন, বিশেষ একটা কাজেই আটকা পড়ার দরুন তাঁর হয়ে কৃত্তিবাসকেই আসতে হয়েছে। কৃত্তিবাসের কাছে ব্যাপারটা শুনে প্রয়োজন হলে পরাশর নিজে আসবেন।
