মানুষটির মুখে একটু যেন হাসির রেখা ফুটে উঠেছে কি না ঠিক বুঝতে পারলাম না। গলাটা কিন্তু বেশ একটু গম্ভীর রেখেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনারা কি কাগজে কিছু লেখা দেবার জন্য এসেছেন?
না, না,—আমরা তৎক্ষণাৎ প্রতিবাদ জানালাম-লেখা-টেখা নয়, পত্রিকার ব্যাপারও কিছু নয়, আমরা তাঁর সঙ্গে একটু অন্য ব্যাপারে দেখা করতে চাই।
বেশ, এবারে মুখের ভাবে আর সেই সঙ্গে গলার স্বরে প্রসন্ন আমন্ত্রণ জানিয়ে তিনি বললেন, যা বলবার আমার কাছেই তা হলে বলতে পারেন। আমি-ই কৃত্তিবাস ভদ্র।
আপনিই কৃত্তিবাস ভদ্র! কথাটা আমাদের চারজনের মুখ দিয়েই আপনা থেকে বেরিয়ে এল।
নিজেকে কৃত্তিবাস ভদ্র বলে যিনি ঘোষণা করেছেন আমাদের অবাক হবার কারণটা তিনি অনুমান করে নিয়ে নিজেই ব্যাখ্যাটা দিলেন এবার—হাঁ, আমিই কৃত্তিবাস ভদ্র। কথাটা ঠিক বিশ্বাস যে হচ্ছে না, তাতে বোঝা যাচ্ছে পরাশরকে নিয়ে লেখা আমার বইগুলো কিছু কিছু আপনারা পড়েছেন আর তাতে আমাদের চেহারার যে বর্ণনা পেয়েছেন তাই থেকেই আমাকে কৃত্তিবাস ভাবতে বাধছে, কেমন?
হ্যাঁ-না কিছুই বলতে না পেরে আমরা তখন একটু হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে।
স্ব-ঘোষিত কৃত্তিবাস নিজের বক্তব্যটা আরও ভাল করে বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, বইগুলোতে দুজনের চেহারা বদলাবদলি করে বর্ণনা দিয়েছি।
কেন? চারজনের মুখে একই প্রশ্ন শোনা গেছে। কেন? আমাদের বিশেষ করে পরস্পরকে চেনা কঠিন করবার জন্য, বলে। স্ব-ঘোষিত কৃত্তিবাস একটু হেসে আবার জিজ্ঞাসা করেছেন, আমাকে কেন খুঁজছেন তা এখনও বললেন না!
আমরা মানে, দুবার ঢোঁক গিলে আমাদের সকলের হয়ে গৌরই কথাটা এবার বলেই ফেলেছে, আমরা আপনার পরাশর বর্মার ঠিকানাটা জানবার জন্যই আপনার খোঁজে এখানে এসেছি।
পরাশরের ঠিকানা জানবার জন্য খোঁজ করে আমার কাছে এসেছেন—
স্ব-ঘোষিত কৃত্তিবাসের মুখ যেন একটু গম্ভীর দেখিয়েছে।
তাঁর জন্য নয়, পরাশরের খোঁজে তাঁর কাছে এসেছি শুনে এরকম একটু ক্ষোভ অবশ্য হতেই পারে। তিনি অবশ্য চটপট সেটা কাটিয়ে উঠে আবার বলেছেন, পরাশরের ঠিকানা চাইতে এসেছেন। কিন্তু তার ঠিকানা কাউকে দেবার অনুমতি যে আমার নেই।
অনুমতি নেই!—আমরা বেশ হতাশ।
হ্যাঁ, অনুমতি নেই—স্বঘোষিত কৃত্তিবাস আমাদের প্রতি সহানুভূতিই দেখিয়ে জানিয়েছেন—তা তবে আপনারা কী জন্য তাঁকে খুঁজছেন যদি বলেন তা হলে তাঁকে একটা খবর আমি দিতে পারি।
খবর দিতে পারেন!-আমরা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছি আশায়—একটা কথা তা হলে তাঁকে যদি জানান।
কী কথা? গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করেছেন স্ব-ঘোষিত কৃত্তিবাস।
এই মানে—আমি কথাটা শুরু করতে গিয়ে জিভে যেন জট পাকিয়ে ফেলেছি——ওই কী বলে বাহাত্তর নম্বর—মানে–
স্ব-ঘোষিত কৃত্তিবাসের মুখের চাপা একটু কৌতুকের ভাবটা আরও ভড়কে দিয়েছে আমাকে।
সবকিছু গুলিয়ে গোলমাল করে ফেলে আমার মুখ দিয়ে যা বেরিয়েছে তা হল— হ্যাঁ, মানে ওই বাহাত্তর নম্বর মানে গলির ওই বাড়িটা বুঝেছেন কিনা—
কী বুঝবেন উনি তোমার ওই পাগলের প্রলাপে? শিবু আর গৌর দুজনেই ঝংকার দিয়ে উঠে এবার আমায় একেবারে অপ্রস্তুত করে থামাল।
কিন্তু আমার লজ্জা নিবারণ করলেন স্বয়ং স্ব-ঘোষিত কৃত্তিবাস ভদ্র। একটু হেসে শিবু আর গৌরকে থামিয়ে তিনি বললেন, না, না—আপনারা মিছিমিছি উত্তেজিত হবেন না। যা বলবার উনি ঠিকই বলেছেন।
ঠিকই বলেছে! শিবু আর গৌরের সঙ্গে এবার শিশিরও যোগ দিয়েছে আমার বিরুদ্ধে—ও যা বলেছে তাতে তার এক বর্ণও আপনি কিছু বুঝেছেন?
হ্যাঁ, হ্যাঁ বুঝেছি বইকী! ঠিকই বুঝেছি, আমাদের নতুন চেনা কৃত্তিবাস ভদ্র সকলকে একসঙ্গে আশ্বস্ত আর হতভম্ব করে বলেছেন, আপনাদের ওই ঠিকানায় পরাশর বর্মা একদিন যাতে যান তাই আপনারা চান তো? বেশ তো ব্যবস্থা করা যাবে।
সে ব্যবস্থা করা যাবে! নিজেদের কানগুলোকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে না পারলেও কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে আমিই সবার আগে বলেছি, তা হলে বিকেলে চারটা নাগাদ আমরাই ট্যাকসি নিয়ে এখানে আসতে চাই। অবশ্য পরাশরবাবুর নিজের কোনও অসুবিধে যদি না থাকে।
না, না, কৃত্তিবাস আমাদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, পরাশরের কোনও অসুবিধা হবে না। তবে ট্যাকসি নিয়ে আপনাদের আসবার কোনও দরকার নেই। পরাশর নিজেই ঠিক চারটের সময় আপনাদের বাহাত্তর নম্বরে গিয়ে পৌঁছবেন।
তিনি নিজেই গিয়ে পৌঁছবেন! আমরা এবার বেশ একটু অস্বস্তির সঙ্গে বলেছি, কিন্তু তার চেয়ে আমাদের গাড়ি নিয়ে এলে কি ভাল হত না? মানে—আমাদের গলিটা ওই কী বলে—একটু গোলমেলে কিনা খুঁজে পেতে যদি—
দেখাই যাক না তা হলে পরাশরের দৌড়টা! আমাদের কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে কৃত্তিবাস ভদ্র বলেছেন, দারুণ দারুণ রহস্যভেদের বড়াই যে করে এই গলি খোঁজার ব্যাপারেই তার পরীক্ষা হয়ে যাক না। একটু থেমে আমাদের আবার আশ্বাস দিয়েছেন, আপনাদের কোনও ভাবনা নেই। কাল ঠিক চারটের সময় আপনাদের বাহাত্তর নম্বরের দরজায় পরাশর বর্মাকে হাজির দেখবেন বলেই আমার বিশ্বাস।
এরপর আর কিছু বলা যায় না বলে মনের কথা মনেই চেপে রেখে বাধ্য হয়েই বিদায় নিয়ে এসেছি।
কে জানে পরাশর বর্মা সত্যিই বাহাত্তর নম্বরের দরজায় ঠিক চারটের সময় হাজির হতে পারবেন কিনা?
না পারলে আমাদের অনেকগুলো ভাল ভাল সাজানো চাল কিন্তু সত্যিই মাটি হয়ে। যাবে।
