কিন্তু সেখানে গিয়ে জানলাম, সে খবর নাকি এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। জায়গাটা মৌলালি অঞ্চল। ঠিকানাটা খুঁজে বার করতে আমাদের ভুল হয়নি। কৃত্তিবাস ভদ্রের সম্পাদনায় যে পত্রিকা সেখান থেকে বার হত সেটা বেশ কয়েক বছর অন্য কোনও ঠিকানায় উঠে গেছে।
বাড়িটার এখন যা অবস্থা তাতে তার সঙ্গে সাহিত্যের কি সাংবাদিকতার জগতের কোনও সম্পর্কের কথা ভাবাই শক্ত।
বাড়ির নীচের তলাটা একটা গো-ডাউন গোছের। সেখানে গেলেই একটা অদ্ভুত গন্ধে বেশ একটু অস্বস্তি বোধ করতে হয়। গন্ধটা উৎকট বিশ্রী কিছু নয়, শুধু কেমন একটু চেনাচেনা কিছুরই যেন কড়া ছোঁয়া লাগানো।
ভনিতাটা না বাড়িয়ে সোজা কথাতেই বলি, গন্ধটা বিড়ির পাতার আর তামাকের। গো-ডাউনট্রা ওই দুটো জিনিসেরই।
গো-ডাউনের দেওয়ালের গায়ে লাগানো দু-চারটে কাঠের খুপরি থেকেই অবশ্য ব্যাপারটা আঁচ করা উচিত ছিল। সেসব খুপরির নীচে ও ওপরের কাঠের তক্তায় বসে সবসুদ্ধ মিলে প্রায় জন কুড়িক কারিগর নিপুণ হাতে বিড়ি বাঁধছে।
প্রথমেই জায়গাটার অপ্রত্যাশিত গন্ধে একটু ভড়কে গেলেও ওই বিড়ি তৈরির একটি খুপরিতেই গিয়ে ওপরের কাগজের অফিসের খোঁজ করি। কাগজ! বড় কুলোর ওপর থেকে মশলা আর পাতা নিয়ে কলের মতো হাত চালিয়ে দেখতে না দেখতে একটার পর একটা নিখুঁত বিড়ি বাঁধার কাজ একটুও না থামিয়ে কারিগর আমাদের দিকে তাচ্ছিল্যভাবে চেয়ে বলে, কাগজ কাঁহা! হিয়া পত্তি মিলবে! বিড়ি বনানে কা পত্তি!
না, না!—আমাদের যতদূর হিন্দির দৌড় তাই দিয়েই বোঝাবার চেষ্টা করতে হয়েছে—কাগজ, মানে ওই কী বলে—পত্রিকা।
পরিকা! আরে পরিকা কাঁহা, কারিগর এক রাশ বিড়ি গুছিয়ে নিয়ে একটি বান্ডিলে বেঁধে ফেলতে ফেলতে ধৈর্য ধরেই বলে, পংরি নেহি, পত্তি, পতি! আভি সমঝমে আয়া?
হাঁ হাঁ, আয়া আয়া—তাড়াতাড়ি নিজেদের সংশোধন করে বলতে হয়—উও কাগজ না। ওই যিসকো বোলতা জাহাঙ্গির না হুমায়ুন!
হুমায়ুন! বলে কারিগর আমাদের মস্তিষ্কের সুস্থতা সম্বন্ধে সন্দেহসূচক উচ্চারণটা করতেই আসল শব্দটা আমাদের মনে পড়ে গেছে।
তাড়াতাড়ি তাকে বাধা দিয়ে নিজেদের শুধরে বলেছি, নেহি, নেহি– হুমায়ুন-জাহাঙ্গির নেই—আকবর! আকবর!
আকবর? আমাদের উচ্চারণের গুণেই বোধহয় কারিগরকে ভুরু কুঁচকে আমাদের দিকে তাকাতে হয়েছে।
আমরা ব্যস্ত হয়েছে উঠেছি এবার আমাদের বক্তব্যটা আরও ভাল করে বোঝাতে, হাঁ, হাঁ—আকবর! তবে ওই দিন দিন যে আকবর নিকলতা–ও নেহি, হপ্তা হপ্তা মানে সাত-সাত দিনমে যো আকবর পয়দা হোতা ওইসা কুছ-
ঠিক হ্যায়! ঠিক হ্যায়! এবার একটু কৌতুকের হাসি ফুটে উঠেছে কারিগরের মুখে। সেই হাসি নিয়েই, আমাদের আজব হিন্দির বোধ দিয়ে, সে তার নিজস্ব বাংলায় বুঝিয়ে দিয়েছে যে হপ্তায় হপ্তায় যে কাগজটা এখান থেকে বার হত সেটা বন্ধ হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন। তবে ওপরে কাগজের অফিস যেখানে ছিল সেখানে মাঝে মাঝে দু-একজনকে সে যেতে-আসতে দেখেছে। সুতরাং সেখানে আমরা খোঁজ করে দেখতে পারি।
কাগজ বন্ধ শুনে হতাশ হবার কথা। তবু অফিসটা একেবারে বন্ধ না হওয়ার যে খবরটুকু কারিগরের কাছে পাওয়া গেল তারই ওপর ভরসা করে ওপরের তলায় একবার টু না মেরে পারলাম না।
ওপরে ওঠবার সিঁড়ি, তারপর কোল্যাপসিবল লোহার দরজা ও তারপরে বেশ লম্বা-চওড়া অফিস ঘরটা। নতুন করে বর্ণনা দেবার কিছু নেই। পরাশর বৃত্তান্তে তাঁর বন্ধু ও কীর্তিগাথাকার প্রতি কাহিনীতে যেরকম বর্ণনা দেন, জায়গাটা ঠিক তাই। সেই চওড়া সব বেমানান সিঁড়ি দিয়ে উঠে কোল্যাপসিবল গেট আর তা পেরিয়ে বেশ প্রশস্ত হলেও বেঢপ অফিস ঘরটা পর্যন্ত ঠিক ঠিক কেতাবি বর্ণনার সঙ্গে মিলে গেল। মিলে গেল সেকেলে বিরাট একটু-আধটু পালিশ-ওঠা রং-চটা সেক্রেটারিয়েট টেবিলটা পর্যন্ত।
কিন্তু টেবিলের ওধারে বসে একটা বই হাতে নিয়ে যিনি তাঁর ঘূর্ণি চেয়ার একটু ঘুরিয়ে তাতে হেলান দিয়ে পড়ছেন, তাঁর সঙ্গে বই থেকে পাওয়া বর্ণনা মিলছে না একেবারেই।
কোল্যাপসিবল দরজাটা বেশ ফাঁক করে খোলা থাকায় দ্বিধাভরে হলেও আমরা চারজনেই তখন অফিস ঘরটায় ঢুকে পড়েছি। পরস্পরে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে কে প্রথম দরকারি প্রশ্নটা করবে তা ঠিক করবার চেষ্টা করছি তার মধ্যেই মুখ থেকে। হাতের বইটা না নামিয়েই সেক্রেটারিয়েটের ওধারে আসীন মানুষটি বললেন, দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? আসুন, বসুন।
একটু চমকে উঠে এগিয়ে যেতে যেতে ভাবলাম—মানুষটার কি এক্স-রে দৃষ্টি নাকি যে চোখের সামনে বই ঢাকা থাকলেও তার ভেতর দিয়ে দেখতে পায়!
আমরা তাঁর টেবিলের কাছে পৌঁছবার পর তিনি অবশ্য বইটা নামিয়ে বললেন, বসুন।
আমরা কিন্তু বসতে পারলাম না। একটু ইতস্তত করে কোনওরকমে আসার উদ্দেশ্যটা জানালাম, দেখুন আমরা কী বলে একজনের সঙ্গে দেখা করতে চাই। তাঁর খোঁজেই এখানে এসেছি।
বলুন, কার সঙ্গে দেখা করতে চান? সেক্রেটারিয়েট টেবিলে বসা মানুষটির গলায় আপ্যায়ন না থাকলেও বিরূপতা নেই। ভাবটা এই যে আমাদের কথা শুনতে ব্যগ্র না হলেও তাতে তাঁর আপত্তি নেই।
আমরা মানে— ওইটুকু অনুমতি পেয়েই আমরা এবার এক নিঃশ্বাসে জানালাম—কৃত্তিবাসবাবুর সঙ্গে দেখা করতে চাই। তাঁর একটা পত্রিকা এখান থেকে বার হত। সেই ঠিকানা থেকেই এখানে খোঁজ করতে এসেছি।
