কিন্তু কেন? আমাদের সেই একই প্রশ্ন—শল্যকে শেষ করবার জন্য শুধু যুধিষ্ঠিরকেই দরকার কেন?
দ্রোণাচার্যকে মারবার জন্যও তাঁকে দরকার হয়েছিল—
না, তিনি কিছু বলেননি—ঘনাদা একটু বিশদ হলেন—তবে সম্মুখসমরটা তাঁর সঙ্গে বলেই শল্য ব্যাপারটা বিশ্বাস করে আনমনা হয়েছিলেন, আর সেই ফাঁকেই যুধিষ্ঠিরের আনাড়ি-হাতের বাণও গিয়ে মর্মভেদ করেছিল শল্যের।
শল্যকে আনমনা করার ব্যাপারটা তা হলে কী? আমাদের বিমূঢ় জিজ্ঞাসা। ব্যাপারটা নকুল সহদেবের ঠিক মওকা বুঝে করুণ আর্তনাদ!—ঘনাদা ব্যাখ্যা করলেন—শল্যবধের আগে যুদ্ধিষ্ঠিরের ভাবনাগুলো মনে করো,
শ্রীকৃষ্ণের আজ্ঞা আছে শল্যের নিধনে,
দুর্জয় দেখি যে শল্য আজিকার রণে
হারিলে কি গতি হবে, পাব মহালাজ
এই মত ভাবি তবে কহে ধর্মরাজ!
চক্রব্যূহ করি মোরে দোঁহে বল রাখো।
সহদেব ও নকুল মম বামে থাকো।
বামে নয়, নকুল ও সহদেব ছিলেন যুধিষ্ঠিরের দু-পাশে, একা শল্য যখন বাঁ হাতে যুধিষ্ঠিরকে ঠেকিয়ে ডান হাতে পাণ্ডবসেনা ছারখার করছে তখন একবার নকুল আর তারপরে সহদেব, যেন হঠাৎ শল্যের বাণে এ-ফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেছে, এমনভাবে কাতর ডাক ছেড়েছে—মামা! মামা গো!
শল্য যুধিষ্ঠির নিয়ে সব পাণ্ডবেরই মামা, কিন্তু হাজার হলেও নকুল সহদেব হল তাঁর নিজের মায়ের পেটের বোন মাদ্রীর ছেলে, তাই টানটা যদি তাদের ওপর একটু বেশি হয়, সেটা অন্যায় নয়। নকুল সহদেবের আর্তনাদে তাই কয়েক মুহূর্তের জন্য আনমনা হয়ে গেছেন শল্য আর সেই ফাঁকে যুধিষ্ঠিরের তীর গিয়ে বিধেছে তাঁর বুকে। যুধিষ্ঠির ছাড়া আর কারও সঙ্গে যুদ্ধ হলে নকুল সহদেবের ওই নকল আর্তনাদকে শল্য কখনও সত্যি বলে ভেবে অন্যমনস্ক হতেন না। শল্যকে এই ভুল করাবার জন্যই যুধিষ্ঠিরকে এ যুদ্ধে নামাবার জন্য শ্রীকৃষ্ণের অত পীড়াপীড়ি। নকুল সহদেবের আর্তনাদও অবশ্য তাঁরই শেখানো, আর সেটা যুধিষ্ঠিরের অজান্তে।
কিন্তু কিন্তু আমাদের দ্বিধাভরে জিজ্ঞাসা করতে হল—মূল মহাভারতে এ সব কথা কোথাও আছে কি?
থাকা তো উচিত, ঘনাদা উঠে দাঁড়িয়ে বারান্দার দরজার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বললেন, তবে সব মূল পুঁথি তো পণ্ডিতদের হাতে এখনও পৌঁছয়নি!
ঘনাদা ঘর ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁর পাশের টিপয়টার ওপরে শিশিরের সিগারেটের টিনটাও অবশ্য নাই।
পরাশরে ঘনাদায়
পরাশর বনাম ঘনাদাও বলা যায়।
বলা যায় ঠিকই, কিন্তু মেলানো যায় কি?
না। গাছে মাছে যদি বা মেলানো যায়, পরাশর আর ঘনাদাকে মিলিয়ে দেওয়া কোনওমতেই সম্ভব নয়। এ যেন গাওয়া ঘির সঙ্গে তক্তপোশ কিংবা তবলার সঙ্গে তেলাপোকা। মিল ওই শুধু ত আর ল-এ। কিন্তু সে তত মাথার গোলের মিল যেন লঙ্কা-ফোড়নের—হাঁচি শুনে হেঁশেলের চালে চামচিকের বাসা খোঁজা।
যে দুজনকে মেলাতে চাচ্ছি তাদের ঠিকানা নিয়েই তো গণ্ডগোল। আমাদের ইনি তো থাকেন বনমালি নস্করের বাহাত্তর নম্বরে, আর অন্যজন শুনেছি কোথায় সেই খিদিরপুরে।
খিদিরপুরের কোথায় কোন পাড়ার কোন গলি বা মহল্লায় তার কিছুই জানা নেই। জানবার উপায়ই বা কী?
না, না হঠাৎ খেয়াল হয়েছে যে উপায় একটা আছে। এ ভরসাটা আর কেউ নয়, শিবুই দিয়েছে।
উপায়টা কী? জিজ্ঞাসা করেছি আমরা।
খুব সোজা উপায়। শিবু ভনিতা করেছে, পরাশরের সব বৃত্তান্ত যাঁর মারফত জেনেছি সেই তাঁকেই গিয়ে ধরা।
তাঁকেই গিয়ে ধরা! শিশির আর গৌর সন্দেহ প্রকাশ করেছে, পরাশর বৃত্তান্তের বর্ণনাকার কৃত্তিবাস ভদ্র না কে, তাঁর কথা বলছ তো?
হ্যাঁ, তাঁর ছাড়া আর কার কথা বলব? শিবু একটু ঝাঁঝিয়ে বলেছে, মহাভারত রচনাকারের কথা বলতে বেদব্যাস ছাড়া নাম করব আর কার?
বেদব্যাস, আমি ঘনাদার ধরনে ধ্বনি করবার চেষ্টা করে অবজ্ঞাভরে অন্য তর্ক, তুলে বলেছি, একটু বুঝেসুঝে কথা বলো। কাকে বেদব্যাস বলছ? তেলাপোকাকে বলছ পাখি। তোমাদের ভদ্র না অভদ্র ওই কৃত্তিবাস পরাশর বৃত্তান্তের সঞ্জয়ও নয়।
সঞ্জয়ও নয়!—শিবু যেন একটু বেশি তেতে উঠল——অত হেনস্থা যাকে করছিস তার কেরামতি যে কতখানি তা বুঝিস! পরাশর বর্মার কি শার্লক হোমস-এর ওই কৃত্তিবাস-ওয়াটসনরা না থাকলে তাদের সব বাহাদুরির অর্ধেক জেল্লাই যে মাটি হয়ে যেত তা জানিস! এই কৃত্তিবাস আর ওয়াটসন নিজেরা বোকা বোকা আহম্মুকে সেজে এমন কায়দা করে তাদের বন্ধুদের বৃত্তান্ত লেখেন যে সেখানে উইটিবিকে মনে হয় যেন পাহাড় আর খিড়কি পুকুরকে যেন অকূল দরিয়া। সঞ্জয়ও নয় বলে নিজের বুদ্ধির বহরটা তাই জানিয়ে ফেলিস না!
শিবুর কথাগুলো নেহাত ফাঁকা গলাবাজি নয়। তার যুক্তিগুলোর ঠোক্করে একটু কাবু হলেও জবাব যাহোক একটা দিতেই যাচ্ছিলাম, কিন্তু শিশির গৌরের বকুনিতে নিজেকে রুখতে হল।
কী সব বেতালা বাজাচ্ছিস? ধমক দিয়েছে গৌর আর শিশির-শিবুর কথায় সায় দিয়ে বলেছে, সঞ্জয় হোক বা বেদব্যাসই হোক, আমরা যা চাইছি সেটুকু তাঁকে দিয়ে হলেই হল। আমরা তো তাঁর কাছে অষ্টাদশ পর্ব মহাভারত চাইছি না, চাইছি শুধু ওই যাকে বলা যায় কুরুক্ষেত্রের ঠিকানাটুকু। সেইটুকু তাঁর কাছে পেলেই হল।
গৌর শিশিরের মীমাংসাই মেনে নিয়ে তারপর পরাশর কথাকার কৃত্তিবাস ভদ্রের পত্রিকার অফিসে খোঁজ করতে গিয়েছি।
কিন্তু কোথায় পত্রিকা?
পত্রিকার অফিসের পাশেই কৃত্তিবাস ভদ্র নিজেও থাকেন বলে শুনেছিলাম।
