ঘনাদা গম্ভীর মুখে ইচ্ছে করেই কিছু যেন উহ্য রেখে থামলেন। নিজেদের মধ্যে বারকয়েক মুখ চাওয়াচাওয়ির পর আমিই সকলের হয়ে মনের সংশয়টা প্রকাশ করলাম স্পষ্ট করেই। বললাম, শল্য সম্বন্ধে এরকম ধারণা সত্যি কারও ছিল নাকি?
তা ধারণাটা কার? আর পেলেন কোথায়?
কোথায় পেলাম? ঘনাদা অজ্ঞতা যেন ক্ষমা করে বললেন, পেলাম স্বয়ং ব্যাসদেবের লেখা মূল মহাভারতে।
মূল মহাভারতে এ কথা আছে? আমি অবজ্ঞাভরে বললাম, তা হলে দুর্যোধনের কোনও মোসাহেব ভাঁড়-টাঁড়ের নিশ্চয়। ব্যাসদেব আবার সে কথা লিখে রেখে গেছেন, এটাই আশ্চর্য।
না, ধারণাটা দুর্যোধনের মোসাহেব কোনও ভাঁড়টাঁড়ের নয়। ঘনাদা গম্ভীর হয়েই জানালেন, কিন্তু ধারণাটা যাঁরই হোক, শুনে হাসি পাবার মতো খুব কি উদ্ভট আজগুবি? শল্য কি কুরুক্ষেত্রের সবচেয়ে বড় যোদ্ধা নয়?
আমাদের ধাতস্থ হবার জন্য কয়েক সেকেন্ড সময় দিয়ে ঘনাদা নিজেই আবার আরম্ভ করলেন—কৌরব পক্ষের ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ কি পাণ্ডব পক্ষের অর্জুন তো শুধু ধনুর্ধারী বীর। আর ওদিকে দুর্যোধন আর এদিকে ভীষ্ম গদাযুদ্ধে ওস্তাদ। কিন্তু শল্যের কথা ভাবো দেখি। ধনুক বা গদা কি যে অস্ত্র হাতে দাও, তাতেই সমান ওস্তাদ। শুধু তো তাই নয়। কুরুক্ষেত্রের সবার সেরা যোদ্ধারা তো শুধু অস্ত্র চালাতেই পারতেন, কিন্তু শল্য ছাড়া স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে পাল্লা দেবার মতো রথ চালাবার ক্ষমতা ছিল আর কার? দুর্যোধন শল্যকে সেনাপতি করায় অন্যেরা যে যাই হাসি তামাশা করুক, পাণ্ডব পক্ষের বিচক্ষণ সমঝদারেরা প্রমাদ গনেছিলেন।
তার মানে! গৌর হঠাৎ উৎসাহিত হয়ে বলে উঠল, শল্য সেনাপতি থাকলে দুর্যোধনেরই কুরুক্ষেত্রে জিৎ হবার কথা।
তাই তো মনে হয়। ঘনাদা যেন সত্যের খাতিরে স্বীকার করতে বাধ্য হলেন। না হলে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ অমন চিন্তিত হবেন কেন? যোদ্ধা হিসাবে শল্যের শ্রেষ্ঠত্ব সম্বন্ধে যে ধারণার কথা জানিয়েছি তা আর কারও নয়, শ্রীকৃষ্ণেরই।
তোয়াজ তোষামোদের বদলে প্রথমেই যাতে কাজ হয়েছে, সেই উলটো খোঁচাই আবার একটু লাগানো উচিত মনে হল। ঘনাদার মতই নাসিকাধ্বনি করে বললাম, হ্যাঁ! শ্রীকৃষ্ণের ধারণা! ওঁর ধারণা, না ধাপ্পা।
ধাপ্পা! শ্রীকৃষ্ণের ধারণাকে বলছিস ধাপ্পা! ঘনাদার হয়ে গৌরই তলোয়ার তুলল।
হ্যাঁ, রসিকতা করে ধাপ্পা! রীতিমত গম্ভীর মুখে বললাম, রসিক চূড়ামণি শ্রীকৃষ্ণের সেদিকে তো গুণের ঘাট নেই। ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণের পর শল্যকে সেনাপতি হতে দেখে যুধিষ্ঠিরের কাছে তাকে নিয়ে একটু ঠাট্টা করেছেন।
না, ঠাট্টা করেনি! যেমনটি চেয়েছিলাম ঠিক সেই মতো ঘনাদারই চাপা গর্জন শোনা গেল—রীতিমত ভাবিত হয়ে যুধিষ্ঠিরের কাছে শল্য সম্বন্ধে নিজের মতটা জানিয়েছেন।
তা জানালেই বা হয়েছে কী?—আমিও পিছু হটবার পাত্র নই, শ্রীকৃষ্ণ বললেই শল্য মহাবীর হয়ে উঠবে নাকি? যার গাড়োয়ানি করে শুল্যের মহাভারতে জায়গা সেই কর্ণ শল্য সম্বন্ধে কী বলতেন জানেন?
জানি। ঘনাদার গলার ঝাঁজটা খুশি করবার মতো—শল্য কর্ণের সারথি হতে রাজি হয়েছিলেন ঠিকই। কিন্তু যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে গোপন বোঝপড়ার দরুন কর্ণকে উঠতে বসতে টিটকিরি দিয়ে জ্বালিয়ে মারতেন। তিতিবিরক্ত হয়ে কর্ণ তাই মাঝে মাঝে তার শোধ তুলতে চাইতেন শল্যকে গালাগাল দিয়ে। কিন্তু সে গালাগাল তো শল্যের জাত তুলে নিন্দে। শল্য তো পাণ্ডব কৌরবদের মতো সিন্ধুনদ পার হয়ে আসা আর্যবংশধর নন। তাঁকে সেকালের বেলুচি বলা যায়। এখন যেখানে বেলুচিস্তান, সেই অঞ্চলেই ছিল তাঁর রাজত্ব। আর্যয়ানার খুঁতখুঁতে গোঁড়ামি তাঁদের ছিল না। তাঁরা পোশাক-আশাকে কার্পাসের তুলোর ধার ধারতেন না। ভেড়ার উটের ললামের মিহি মোটা কম্বলেই তাঁদের পোশাক তৈরি হত আর খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সিন্ধু পার হওয়া আর্যদের মতো গোঁড়ামির বাছবিচার তাঁদের ছিল না—গোরু ভেড়া সব মাংসেই তাঁদের ছিল সমান রুচি। এ সব নিয়ে কর্ণের গালাগাল তাই গায়ে লাগেনি শল্যের। এ সব তো তাঁদের জাতের আচারবিচার নিয়ে নিন্দে। তাঁর বীরত্বের বিষয়ে উপহাস কি ধিক্কার তো তাতে নেই।
বীরত্ব তো তাঁর ভারী!—খোঁচা দিতে এখনও ছাড়লাম না। ভীম অর্জুন, এমনকী নকুল সহদেবও নয়, কুপোকাত হলেন তো ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠিরের হাতে, ভাল করে ধনুক ধরতেও জানতেন কি না সন্দেহ!
হ্যাঁ, মারা গেলেন যুধিষ্ঠিরের হাতে। ঘনাদার গলা এবার জলদগম্ভীর একমাত্র যাঁর হাতে ছাড়া শল্যের আজগুবি হার আর মরণ সম্ভবই ছিল না। শ্রীকৃষ্ণ বাসুদেব তাই আর কাউকে নয়, নাছোড়বান্দা হয়ে যুধিষ্ঠিরকেই সেধেছিলেন শল্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাঁকে সংহার করবার জন্য।
কেন? কেন?—এবার অবাক হওয়া প্রশ্নটা আমাদের সকলেরই—আর কারওর বদলে শুধু যুধিষ্ঠিরকেই এমন পেড়াপীড়ি কেন?
সেইটা ভেবে দেখো না! এতক্ষণে ঘনাদার মুখে টেক্কা তুরুপের আগের মুহূর্তের হাসি। ভীম অর্জুন থেকে শুরু করে আরও সব বাঘা বাঘা যোদ্ধা থাকতে শুধু যুধিষ্ঠিরকেই এমন সাধাসাধির কারণ কী? সারা মহাভারতে আর কারও সঙ্গে যোঝবার জন্য যুধিষ্ঠিরকে একবার একটু ডাক দেওয়ার কথাও কোথাও আছে কি? শুধু শল্যের বেলা যুধিষ্ঠিরকে রাজি না করাতে পারলে শ্রীকৃষ্ণের আর শান্তি নেই। কত ভাবেই না যুধিষ্ঠিরকে তাতাচ্ছেন—
