কী যা তা বকছিস! বলে শিশিরকে থামিয়ে দিয়ে একেবারে যেন ঘোড়ার মুখের খবর বার করে এনে গৌর বললে, আমাদের দক্ষিণ মেরু অভিযানে লক্ষ্য কী তা জানিস? তারপর আমাদের ঠিক মাত্রা মাফিক কয়েক সেকেন্ড উৎকণ্ঠায় রেখে রহস্যটা প্রকাশ করে বললে, লক্ষ্য হল ফাটল খোঁজা।
ফাটল খোঁজা? আমাদের এবার আর হতভম্ব হবার ভান করতে হল না। কারণ গৌর এইমাত্র যা ছাড়লে তা আমাদের রিহার্সেল দেওয়া চিত্রনাট্যের বাইরে। স্ক্রিপ্ট পালটালেও গৌর তার বেলাইনে যাওয়া সার্থক করে তুলে বলল, হ্যাঁ, ফাটল! কেন ফাটল, কোন ফাটল তাও বুঝতে পারছ না?
নীরবে মাথা নেড়ে আমাদের অজ্ঞতা স্বীকার করতে হল।
নারলিকার-এর নাম শুনেছিস? গৌর যথোচিত মুরুব্বিয়ানার সঙ্গে এবার জিজ্ঞাসা করলে, নারলিকার আর হয়েল-এর নাম?
শোনা থাক আর না থাক, এখন বোকা সেজে মাথা নাড়তে হল। যাক, শোনোনি যখন, শুনে নাও, গৌর রীতিমত গুরুগিরির চালে বোঝালে, এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিতত্ত্ব ব্যাখ্যায় ওই দুজনের নাম একেবারে সবার ওপরের সারিতে। এই দুজনের মধ্যে হয়েল হলেন ইংরেজ আর নারলিকার ভারতীয়। এই নারলিকার কী বলছেন, শোনো। বলছেন যে আমাদের পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণই কমে যাচ্ছে, সূর্য থেকে সরে আসতে আসতে তাই ফেঁপেফুলে আরও বড় হতে থাকার মধ্যে তার খোলসে প্রথম ফাটল ধরবে এখানে সেখানে আর তারপর সেইসব ফাটল থেকে ঠেলে বার হতে থাকবে নতুন মহাদেশ হয়ে ওঠবার মতো পৃথিবীর ভেতরকার পাথুরে মালমশলা!
গৌরকে মনে মনে তারিফ করে ঘনাদার দিকে আড়চোখে একটু তাকিয়ে নিয়ে আমরা হতভম্ব গলায় কোনওরকমে যেন বললাম, এমন ভয়ানক কাণ্ড!
হ্যাঁ, গৌর গলায় প্রলয়ের হুমকির ভয়-বিহ্বলতা মাখিয়ে বললে, একেবারে সর্বনাশা ব্যাপার! পৃথিবীতে প্রাণের জগতের শেষ যবনিকা পতন না হোক, সম্পূর্ণ পালাবদল নিশ্চয়ই। এই সৃষ্টি ওলটানো ব্যাপার এখনই শুরু হয়েছে কিনা তা বোঝবার হদিস ওই ফাটল। সে ফাটল প্রথম কোথায় ধরবে?
গৌর নাটকীয়ভাবে থামল। কিন্তু কোথায় কী? এমন একটা পাকা হাতে ধরিয়ে দেওয়া খেই যাঁর লুফে নেওয়ার কথা, তিনি দেহটাই শুধু আমাদের আড্ডাঘরে রেখে আর কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন!
আশাভরে পাঁচ সেকেন্ড আন্দাজ অপেক্ষা করে গৌরকেই আবার শুরু করতে হল। বললে, পাকা ফলের বেলা যেমন তেমনই পৃথিবীর প্রথম মাথা আর তলার দিকে অর্থাৎ কিনা দুই মেরুর কোথাও। কিন্তু উত্তর মেরু তো ভাঙা নয়, জমা বরফের রাজ্য। সেখানে হরদম এখানে-সেখানে ফাটল ধরছে আর জোড়া লাগছে। আসল ফাটলের আগে একটুআধটু চিড়ধরা সেখানে বোঝার কোনও উপায় নেই। মোক্ষম ফাটলের আগে তো একটু চিড়ধরা ধরতে পারাই সবচেয়ে বড় কথা, আর তা ধরতে যেতে হবে সেই দক্ষিণ মেরুতে। আর শুধু গেলেই তো হবে না। সেই সৃষ্টিনাশা চিড় চেনবার মতো বৈজ্ঞানিক বিদ্যেবুদ্ধি বিচক্ষণতা তো চাই-ই, সেই সঙ্গে চাই যমের দক্ষিণ দুয়ারের সমান সেই আন্টার্টিকার চিরতুষারের বিপরীত মেরুতে টহল দিয়ে টিকে থাকবার ক্ষমতা।
এ মণিকাঞ্চন যোগ তো অসম্ভব বললেই হয়। শিবু গৌরকে একটু দম নেবার ফুরসত দিয়ে সলতের আগুনটা উসকে দিলে।
ঠিক তাই! আড়চোখে একবার যথাস্থানে চোখ বুলিয়ে নিয়ে গৌর আবার শুরু করলে, বিজ্ঞানের ধুরন্ধর যদি বা মেলে, মেরুবিজয়ী বাহাদুর পাচ্ছে কোথায়? আমাদের দক্ষিণ মেরু অভিযানের কর্মকর্তারা তাই হন্যে হয়ে সারা দুনিয়ায় খোঁজ চালিয়ে হয়রান হচ্ছেন।
গৌর তাল বুঝে ঠিক সমের মাথায় থামল। ঘরের সবাইও উদগ্রীব আগ্রহে চুপ। এমন একটা মোক্ষম মুহূর্ত কি বিফলে যাবে?
শিশির আর ধৈর্য ধরতে না পেরে সলতেটা ধরিয়ে দিলে। যেন অবাক হয়ে বললে, কেন? আসল লোকের নামই তাদের মনে পড়ল না? ঘনশ্যাম দাস নামটা তারা শোনেনি?
আমরা আবার সব চুপ। এবার আর বারুদের সলতে নেতিয়ে থাকতে পারে না। কিন্তু কোথায় কী? বারুদের সলতের নয়, আওয়াজ একটা যা পেলাম তা সিগারেট ধরাবার জন্য ঘনাদার দেশলাই জ্বালবার।
এরপর আর নিজেকে সামলে রাখা যায়? মেজাজটা অনেকক্ষণ থেকেই খেঁচড়ে ছিল। এখন একেবারে চিড়বিড়িয়ে টিটকিরি হয়ে বার হল, কী বললে? ওরা খোঁজ করবে ঘনশ্যাম দাসের? ভীষ্ম দ্রোণ গেল তল শল্য শেনাপতি?
হঁঃ—হঁঃ—হঁঃ—হঁঃ—
না, মেঘের গুড়গুড়ুনি নয়, গলা খাঁকারি এবং গলা খাঁকারি আর কারও নয়, স্বয়ং তাঁর।
হ্যাঁ, ঘনাদাই গলা খাঁকারি দিয়ে এবার সরব হলেন। বেশ একটু ভারী গলাতেই শোনালেন—ভীষ্ম দ্রোণ গেল তল শল্য সেনাপতি? কেমন?
ঘনাদার ভারী গলার আবৃত্তিতে কি একটু কান-মলা গোছের মোচড়?
ঠিক বুঝতে না পেরে নীরব হয়েই রইলাম।
ঘনাদাই আবার বললেন, অর্থাৎ হাতি-ঘোড়া হার মানল, রথ টানবে ছাগল! বচনটা এ রকমও হতে পারে!
হাওয়াটা ঠিক কোনমুখো, তা বুঝতে না পারলেও শিবু আলাপটা নেহাত চালু রাখবার জন্যই বললে, হ্যাঁ, তা তো পারেই। ভীষ্ম দ্রোণ কর্ণ দুর্যোধন—তখন সব মহা মহা বীরই খতম হয়ে গেছে, তাই নেহাত নাচার হয়েই তিনি শল্যকে সেনাপতি করেছিলেন তো। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ফলাফল তখন তিনি ভাল করেই বুঝে ফেলেছেন। শল্যের মুরোদ জানতে তো তাঁর বাকি ছিল না।
হ্যাঁ, ঘনাদা যেন সায়ই দিলেন শিবুর কথায়—শল্যের মুরোদ আরেকজনও ভাল করেই বুঝেছিলেন, তাঁর ধারণাটাই শোনা যাক। তিনি বলেছিলেন, ও-ই বীর বিপুল বলশালী মহাতেজস্বী বিচিত্র যোদ্ধা ও ক্ষিপ্রহস্ত। আমার মনে হয়, উনি ভীষ্ম, দ্রোণ ও কর্ণের সদৃশ বা তাঁহাদের অপেক্ষা সমধিক রণ-বিশারদ। উঁহার তুল্য যোদ্ধা আর কাহাকেও লক্ষিত হয় না।
