ধাঁধার কপাটে মাথা ঠুকেও আমরা কিন্তু হাল ছাড়িনি। আমিই খোদ ব্যাসদেব আর কাশীরাম দাসের তরফে লড়তে উঠেছি। বলেছি, আস্পর্ধাটা একবার দেখলেন! একেবারে খোদার ওপরই খোদকারি! ধ্রুপদ রাজার লক্ষ্যভেদের সভায় ভীষ্মের ওই যে চোখে অণু কী পড়ার ও বর্ণনা কোথায় পেয়েছে, জিজ্ঞাসা করুন তো!
ঠিক! ঠিক? শিবু আমায় মদত দিয়েছে, কোনও মহাভারতে ও কথা নেই। ব্যাসদেবের মূল মহাভারতেও না, কে না জানে ধনুকে বাণ লাগাতে গিয়ে হঠাৎ শিখণ্ডীকে দেখতে পেয়ে ভীষ্ম তীরধনুক ছেড়ে চলে যান?
হ্যাঁ, চলে তো যানই, কিন্তু শিখণ্ডীকে দেখে, না চোখে অণু কী উড়ে পড়ার দরুন, তা কে জানে? গৌর নিজের কোট ছাড়েনি, ভীষ্মের ধনুক ছেড়ে চলে যাওয়ার দুটোই কারণ হতে পারে। এক, যখন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের প্যাঁচ, তখন ভীষ্মকে তীর ছুঁড়তে
দেওয়ার জন্য শিখণ্ডীকে সামনে আনার সঙ্গে চোখে অণু কী ফেলে দিয়ে মতলব হাসিলটা একেবারে নিশ্চিত করে নিয়েছেন। চতুর চূড়ামণি শ্রীকৃষ্ণের পক্ষে সেইটেই কি স্বাভাবিক নয়? কী বলেন ঘনাদা?
ঘনাদা কিছুই বলেননি। কাটলেটের প্লেট সাফ করে পাশে নামিয়ে রাখার পর হাতের সিগারেটে সুখটানের সঙ্গে চায়ের পেয়ালায় মৌজ হয়ে চুমুক দিতে দিতে একটু রহস্যময় হাসি হেসেছেন।
আমরা কিন্তু ওই যা বুঝতে-চাও-বোঝো মার্কা হাসির ফুটকি দিয়ে প্রসঙ্গটা শেষ করতে দিইনি। গৌরের ওপরই আবার চড়াও হয়ে বলেছি, থাক, থাক, ঘনাদাকে আর সাক্ষী মানতে হবে না। সবই তোমার চতুর চূড়ামণি শ্রীকৃষ্ণের প্যাঁচ বলেই মেনে না হয় নিলাম, কিন্তু ভীষ্মদেবের চোখে অণু কী পড়ার ওই ছত্রগুলি কোথায় পেয়েছ, শুনি? কাশীরাম দাস ওরকম কিছু লিখেছেন বলে তো কেউ কানে শুনিনি।
শোনোনি? গৌর তাচ্ছিল্যভরে বলেছে, তা শুনবে কী করে? কাশীরাম দাস তো ও সব লেখেননি।
তবে? আমরা যেন শেয়ালের গন্ধ পেয়ে শিকারি কুকুর হয়ে উঠেছি।
তবে আর কিছু নয়, গৌর বাহাদুরির সঙ্গে বলেছে, ও লাইন ক-টা আমারই লেখা—মুখে মুখে বানিয়ে তোমাদের শোনালাম।
মুখে মুখে বানিয়ে আমাদের শোনালে? আমরা একেবারে স্তম্ভিত। গৌর যেন ধর্মস্থান অপবিত্র করে তারই বড়াই করছে, এমন আঁতকে-ওঠা মুখের ভাব করে ঘনাদার কাছে কড়া গোছের একটা প্রায়শ্চিত্ত-টিত্ত গোছের বিধান চেয়েছি, শুনুন আপনি, শুনুন! আজে বাজে কিছু নয়—খোদ মহাভারতের ওপরেই ওর নোংরা হাত চালিয়েছে।
ঘনাদা একটু তেতেছেন কি?
না, মোটেই না। সেই রহস্যময় হাসির সঙ্গে এবার শুধু একটু কণ্ঠধ্বনি শোনা গেছে। আমাদের সকলকে বাদ দিয়ে ঘনাদা শুধু শিশিরকে সম্বোধন করে বলেছেন, তা ভালই তো লাগল!
কী, ভাল লাগল কী? গৌরের মহাভারতের ওপর খোদকারি না শিশিরের দেওয়া সিগারেটের ব্র্যান্ড, তা কিছুই বোঝা গেল না।
মহাভারত দিয়ে আর কিছু হবার নয় বুঝে শিবু এবার অন্য রাস্তা ধরে বিজ্ঞানের শরণ নিলে। হঠাৎ যেন অত্যন্ত গোপন খবর ফাঁস করবার মতো করে বললে, নভেম্বরে আমরা আবার দক্ষিণ মেরুতে যাচ্ছি, জানিস তো?
আমরা যাচ্ছি মানে! শিশির যথাবিহিত বিস্ময় প্রকাশ করলে। আহা, আমরা মানে আমাদের ভারতের একটা বৈজ্ঞানিক দল, তাও বুঝিস না! শিবু শিশিরকে লজ্জা দিয়ে চট করে গলাটা নামিয়ে জিজ্ঞাসা করলে, কিন্তু এবার কেন যাচ্ছে তা জানিস?
এরপর একটা লাগসই রহস্যময় উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দেবার কথা ছিল আমার। সেই সঙ্গে ঘনাদাকে উসকে দেবার মতো ঝাঁঝালো কিছুর ফোড়ন দেওয়ার ভারও ছিল আমার ওপর।
কিন্তু বারবার ঘনাদাকে তাতাবার চেষ্টায় হার মেনে মেজাজ তখন আমার বিগড়ে গেছে। শিবুর গোপন খবরটার সব রহস্য আমি ঠাট্টার সুরে নস্যাৎ করে দিয়ে বললাম, যাচ্ছে কেন আবার? যাচ্ছে স্কেটিং ক্লাব খুলতে?
স্কেটিং ক্লাব! আমার আচমকা বেয়াড়াপনায় বেশ বিরক্ত হলেও শিবুর হতভম্ব গলা দিয়ে আপনা থেকে প্রশ্নটা বেরিয়ে গেছে।
হ্যাঁ, স্কেটিং ক্লাব। আমি এবার বোেঝালাম, হাজার হাজার মাইল জমা বরফের মাঠ পড়ে আছে। যেখানে যতদূর খুশি স্কেটিং রিং বসাও। শুধু জাহাজ থেকে উঠে বা প্লেন থেকে নেমে পায়ে স্কেটের জুতো জোড়া পরার অপেক্ষা, আর—
থামো? এক ধমকে আমায় চুপ করিয়ে দিয়ে শিশির রহস্যটাকে নিজের মতো করে পাক দিতে চেয়ে বললে, ও সব স্কেট-টেট-এর বাজে ফকুড়ি নয়। আসলে আমাদের দ্বিতীয় অভিযান যাচ্ছে অ্যান্টার্টিকায় শেয়াল ছাড়তে!
শেয়াল ছাড়তে! বলে যে বিস্ময়টা প্রকাশ করতে যাচ্ছিলাম তা শুরু করেই থামতে হল।
শিশিব তখন সবিস্তারে নিজের বক্তব্যটা বুঝিয়ে দিচ্ছে। রহস্যটা সরল করে বললে, হ্যাঁ, যাচ্ছে শেয়াল ছাড়তে। ছাড়তে যাচ্ছে কোন শেয়াল? না আমাদের এই হুক্কা হুয়া-ডাকা শেয়াল নয়। উত্তর মেরুর সেই তুষারধবল রেশমি পশমের খেঁকশেয়াল যার ফার, মানে পশমি চামড়া হিরে মুক্তোর চেয়ে দামি। দক্ষিণ মেরুতে পেঙ্গুইন ছাড়া ডাঙায় চরবার কোনও প্রাণী তো নেই। উত্তর মেরুর এই শেয়াল সেখানে ছাড়লে তাই দেখতে দেখতে হাজারে হাজারে বেড়ে উঠে আমাদের ফরেন এক্সচেঞ্জ মানে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যাপারে ওই যাকে বলে গোপালের দধিভাণ্ড হয়ে উঠবে।
আমরা যে যাই বলি, আড়চোখে নজরটা ঘনাদার দিকে ঠিকই থাকে। শিশিরের আজগুবি শেয়াল-চাষের পরিকল্পনা শোনার মধ্যেও তাই ছিল। শিশির যা গুলবাজি শুরু করেছিল, ঘনাদা তা থেকে অবলীলাক্রমে একটা ফ্যাকড়া টেনে বার করে পেঁচিয়ে তুলতে পারতেন। উত্তর থেকে দক্ষিণ মেরুতে ওই সাদা শেয়াল চালান থেকে সেখানে পেঙ্গুইনের পোলট্রি বানিয়ে দুনিয়ার খাদ্য সমস্যার সুরাহা করবার পরিকল্পনা কেন হালে পানি পেল না, তার একটা জমজমাট বিজ্ঞান-রহস্যের ফোড়ন দেওয়া গল্প ফাঁদবার এমন সুযোগ পেয়ে তাঁর তো ঝাঁপিয়ে পড়বার কথা, কিন্তু সেরকম কোনও চিড়িবিড়িনির লক্ষণ না দেখে গৌর আরও কড়া পাঁচন গুলল।
