উপরে যাহা লেখা হইল তাহা সামান্য একটু নমুনা মাত্র। আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিলে বিস্তারিত আরও আশ্চর্য সব কাহিনী-সার পাইবেন। ইতি–
মৌ-কা-সা-বি-স
মৌ-কা-সা-বি-স-এর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ করবার ইচ্ছা আছে। গৌর এবং আমি এক্ষুনি যোগাযোগটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব করতে চাই। কিন্তু শিশির ও শিবু কিছুদিন অপেক্ষা করাই উচিত মনে করে।
ঘনাদার শল্য সমাচার
কোন ভাগ্যে একটা বেফাঁস বচন মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছিল কে জানে! কিন্তু তাইতেই অমন একেবারে কেল্লা ফতে!
গোলা-গুলি, রকেট, বোমা, টর্পেডোতে যা হয়নি, এ যেন এক গুলিতেই তা হাসিল।
এ ক-দিন কী আর করতে বাকি রেখেছি।
প্রথমে খানা-দানার এলাহি কাণ্ডকারখানা! সেসব খানার খুশবুতে শুধু বাহাত্তর নম্বর কেন, সমস্ত বনমালি নস্কর লেন ছাড়িয়ে গোটা ভোটের তল্লাটটাই ম-ম করে উঠেছে।
আজ হিঙের কচুরি আর চিংড়ির কবরেজি কাটলেট, পরের দিন চিকেন চাওমিন আর সুইট অ্যান্ড সাওয়ার মাছ।
দু-চার দিন এমন রসালো খানাপিনায় মুখ মেরে গিয়ে অরুচি ধরবে, তার উপায় নেই।
এ তো মন মাতানো মেনু তৈরির মামুলি কেতাবি ছক নয়, একেবারে নতুন বৈজ্ঞানিক ফরমুলার ফিরিস্তি।
বেশ ক-দিন খানদানি চৰ্য-চোষ্যেব পর হঠাৎ একদিন যখন যেমন মরসুম, তার মতো ফলমূল সন্দেশ-রসগোল্লা রাবড়ির সাত্ত্বিক আহার।
পুরো সাত্ত্বিক আহারটা ঘনাদার কাছে অবশ্য যোলো আনা সই নয়। তাই একদিন মাত্র তা চালিয়েই সটান বিরিয়ানি পোলাও মোরগ মসল্লম আর শিক কাবাবের প্লেট সাজাতে হয়েছে।
বিরিয়ানি পোলাওয়ের জায়গায় মোগলাই পরোটা, মোরগ মসল্লমের বদলে রগন জোস আর শিক কাবাবের জায়গায় চিৎপুরি চাপ বদল করেও ফল সেই একই।
প্লেটগুলো অবশ্য ঠিক সাফ হয়ে যাচ্ছে। শিশিরের সিগারেটের টিনগুলো যথারীতি শিস দিয়ে আবরণ মুক্ত হয়ে যথাসময়ে খালি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ঘনাদা যেন সেই এক ভিজে বারুদের সলতে, তুবড়িতে আগুন লাগানো দূরের কথা, তা থেকে ভাল করে ক-টা আগুনের ফুলকিও বার করা যাচ্ছে না।
ঘনাদা কি বিরক্ত? গরম মেজাজে আছেন? না, না মোটেই না। ওই চেলাকাঠ-মার্কা মুখে যতটা খোশ-ভাব ফোটা সম্ভব, তা ঠিকই ফুটেছে মনে হচ্ছে।
গলার বোল কিন্তু শুধু হু আর হাঁ, আর মুখে সেই ধাঁধা-পেঁচানো মৃদু একটু হাসি, মিশরের কোনও স্ফিংকস-এর মুখে যা হয়তো খোদাই করা আছে।
ধরাছোঁয়া যায়, প্রতিরক্ষার তেমন দুর্দান্ত ম্যাজিনো লাইনও ভেদ করা যায় অল্পে, কিন্তু শুধু হু হাঁ আর ধাঁধাটে হাসির এই বেয়াড়া বেড়া পার হওয়া যায় কী করে?
চেষ্টার কিছু ত্রুটি অবশ্যই হয়নি। একেবারে মহাভারত ধরেই আরম্ভ করা হয়েছে।
আরম্ভ করেছে গৌর। শিশিরের সঙ্গে তার আগে থাকতেই যেমন মহলা দেওয়া সেইমত দুজনে যেন চাপা গলায় নিজেদের মধ্যে কী আলোচনা করতে করতে হঠাৎ গরম হয়ে গর্জে উঠেছে।
বাঁ হাতের ওপর ডান হাতের মুঠোর তুড়ি মেরে গৌর বলেছে, হ্যাঁ, দুর্যোধন! আলবত দুর্যোধন!
আমরাও, মানে শিবু আর আমিও ঠিক সিনারিয়ো অর্থাৎ চিত্রনাট্য মাফিক হঠাৎ যেন চমকে উঠে উদ্বেগটা জানিয়েছি, আরে, আরে! হল কী! হঠাৎ দুর্যোধন নিয়ে এত রাগারাগি কীসের!
কীসের? শিশির যেন অতি কষ্টে মেজাজ ঠাণ্ডা রেখে বলেছে, গৌর কী বলে, জানো! বলে, সারা মহাভারত হল দুর্যোধনকে ঠকিয়ে সব কিছু থেকে ফাঁকি দেওয়ার গল্প। আর এ ঠগবাজির প্যাঁচালো বুদ্ধি জুগিয়েছে আর কেউ নয়, স্বয়ং বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ। বলে, তিনি প্যাঁচ না খেলালে দ্রৌপদীর বিয়ে হত ওই দুর্যোধনেরই সঙ্গে।
কী! আমাদের গলাগুলো উদারা থেকে তারায় তুলে দিয়ে বলেছি, ঠকিয়ে ফাঁকি না দিলে দুর্যোধন তা হলে দ্রৌপদীকে বিয়ে করবার যা পণ সেই লক্ষ্যভেদও করতে পারত!
সে পারুক না পারুক, তাতে কী আসে যায়! গৌর নিজেই এবার আমাকে মহড়া দিয়েছে, তার হয়ে লক্ষ্যভেদ করবার জন্য তো স্বয়ং ভীষ্মই ছিলেন। তাঁকে কীভাবে ঠুটো করা হয়েছিল তা নতুন করে শুনতে চাও? এই শোনো তা হলে
পুনঃ পুনঃ ধৃষ্টদ্যুম্ন স্বয়ম্বর স্থলে।
লক্ষ্য বিন্ধিবারে বলে ক্ষত্রিয় সকলে।
তাহা শুনি উঠিলেন কুরুবংশ পতি
ধনুর নিকটে যান ভীষ্ম মহামতি।
এক টানে তুলি ধনু গঙ্গার কুমার
আকর্ণ পুরিয়া তাতে দিলেন টঙ্কার।
তারপর হাঁকি কন চির ব্রহ্মচারী,
নিজের নিমিত্ত আমি নহি ধনুর্ধারী
লক্ষ্যভেদে কন্যা লভি দিব দুর্যোধনে
এত বলি ধনুর্বাণ ধরেন যতনে।
কিন্তু এ কি! অকস্মাৎ এ কেমন হইল।
দু চোখে দুটি ক্ষুদ্র অণু কি প্রবেশিল!
কিছু না দেখেন ভীষ্ম চক্ষু করে জ্বালা
ধনুর্বাণ ফেলে দেন হয়ে ঝালাপালা।
একটু কি হাসি ফোটে শ্রীকৃষ্ণের মুখে?
এ কাহার লীলা তবে বোঝো সকৌতুকে!
তৈরি হয়েই ছিলাম। গৌর থামতেই প্রায় ঝাঁপ দিয়ে পড়ে একেবারে সুপ্রিম কোর্টে আর্জি জানিয়েছি, শুনলেন আপনি, শুনলেন? গৌরের মহাভারতটা শুনলেন?
কিন্তু কোথায় কাকে কী বলছি? কলকাতা মামলার আপিল যেন তুলেছি কামসকাটকায় হাইকোর্টের হাকিম আর্জির মানেই যেন বোঝেন না!
ঘনাদা তাঁর কাটলেটের প্লেটের আসল মাল সাফ করে ফ্রায়েড পোট্যাটো ফিংগারগুলো টোম্যাটো সস মাখিয়ে তারিয়ে শেষ করতে করতে আমাদের দিকে
একটু মৃদু হাসি জড়ানো হু শব্দ করেছেন। হাসিটি অবোধ্য আর হু মানে যা বুঝতে চাও, বোঝে।
