আমরা এবার নীরব নিস্পন্দ।
ঘনাদা-ই বলে চললেন, আমরা যে কী ভয়ংকর অবস্থায় পৃথিবীতে টিকে আছি তা কজনই বা জানে? এই পৃথিবীর ওপরে আশি থেকে পাঁচশো কিলোমিটার উচ্চতায় আছে মশারির ঢাকনার মতো একটা চৌম্বকমণ্ডল আর একটা আয়নমণ্ডল। এই দুই ঢাকনা না থাকলে কবে পৃথিবীতে আমাদের মতো প্রাণীরা শেষ হয়ে যেত—যেমন গেছল এককালে সেই ডাইনোসরদের বংশ। কেন শেষ হয়ে যেত সেটাই জানা দরকার। আমাদের সৌরজগতের অধীশ্বর হলেন সূর্য। তিনিই প্রাণদাতা, আবার তিনিই মৃত্যুবিধাতা। থেকে থেকে সূর্যের ভেতরে যে সৌরঝটিকা হয় তার কথা নিশ্চয় শুনেছ। সেই সৌরঝটিকায় কল্পনাতীত দ্রুতবেগে উৎসারিত হয় এমন সব তড়িৎকণার প্রবাহ, যার অধিকাংশই আমাদের চৌম্বকমণ্ডলে আর আয়নমণ্ডলে আটকে না গেলে সবংশে আমাদের ধ্বংস করে দিত।
এই আয়নমণ্ডল আর চৌম্বকমণ্ডলের পরিচয় আমাদের জানা। কিন্তু তাদের অবস্থার হদিস পাবার কোনও উপায় ছিল না। সেই উপায়ই উদ্ভাবিত হয়েছে এই খেলনার বাক্সের মতো যন্ত্রটিতে!
ইজমেরন-এর নাম বোধহয় শোনোনি। এটি রাশিয়ার আয়ন আর চৌম্বক মণ্ডল নিয়ে গবেষণা করবার একটি কেন্দ্র। সেই ইজমেরন-এর উদ্ভাবিত এই যন্ত্রে বড় ভয়ানক এক ব্যাপার কিছুকাল আগে ধরা পড়েছে। আমাদের আয়নমণ্ডলের কী সব পরিবর্তন হয়ে চৌম্বক-মেরুই সরে যাচ্ছে। খেলনার বাক্সের মতো মাগনেটো মিটার যন্ত্রটা তাই বৈজ্ঞানিকদের কাছে অমূল্য। সেই যন্ত্রই কিছু দিন আগে চুরি গেছে বলে জানা গেল। পৃথিবীর সব দেশে বড় বড় রাজ্যের গোয়েন্দারা যে কীরকম হন্যে হয়ে সেই যন্ত্র আর চোরকে খুঁজছে বুঝতেই পারো। আমার ভাগ্য, সন্ধানটা আমিই পেয়ে গেলাম সর্বপ্রথম। চোর শিরোমণি বুদ্ধিটা ভাল খাটিয়েছিল। এদেশে ওদেশে পাঁচ-তারা সাত-তারা হোটেল নয়, হিপি সাধু সেজে এক নিরামিষ সরাইতে সে গেরুয়া পরা আধা-সাধু হয়ে জায়গা নিয়েছে। মতলব ছিল, গোলমাল একটু থামলেই আসল জিনিস নিয়ে নিজের মুলুকে পাড়ি দেবে। কিন্তু তা আর বাছাধনের হল না।
তার মানে আপনি তাকে ধরে ফেলেছেন? আমাদের উত্তেজিত জিজ্ঞাসা। এবার ধরে কী করলেন? পুলিশে দিয়েছেন?
পাগল! ঘনাদা আমাদের সরল নির্বুদ্ধিতায় হাসলেন। অমন একটা ঝানু আন্তর্জাতিক দুশমনকে চিনে গোপনে চোখে চোখে রাখবার সুবিধে হেলায় নষ্ট করে তাকে পুলিশে দিতে পারি! সে বহাল তবিয়তেই ওই পবিত্র সরাইতেই আছে—একটু অবশ্য ভ্যাবাচাকা হয়ে।
তার যন্ত্রটা তা হলে নিয়ে এসেছেন বুঝি? আমরা উত্তেজিতভাবে জানতে চাই।
নিয়ে আসব কী? ঘনাদা আবার আমাদের নির্বুদ্ধিতায় হাসলেন। শুধু ফাঁক পেয়ে যন্ত্রটা ভেঙে দিয়ে এসেছি।
ভেঙে দিয়ে এলেন? ওই অমূল্য আশ্চর্য যন্ত্র? আমরা ব্যথিত, স্তম্ভিত।
ভেঙেছি তো কী হয়েছে—ঘনাদা নির্বিকার—ইজমেরন ওরকম বা ওর চেয়ে সূক্ষ্ম যন্ত্র ক-দিনেই বানিয়ে ফেলবে। অন্য কারও হাতে ও যন্ত্র যাতে না পড়ে, তাই জন্য ভেঙে দিয়ে আসা।
কিন্তু—
যেসব প্রশ্ন এরপর জিজ্ঞাসা করবার ছিল তা আর করা হল না। শিবুর অর্ডার দেওয়া ষোড়শোপচার আমিষ খানা প্লেটের পর প্লেট এখন আসতে শুরু করেছে। ঘনাদাকে এখন মাইক দিয়েও কোনও কিছু শোনানো যাবে না।
শিবুর বদলে রামভুজ সিংকেই ঘনাদাকে তোয়াজ করে খাওয়াবার ভার দিয়ে শিবু আর শিশিরকে নিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এলাম।
বারান্দায় বেরিয়েই তাকে প্রথম প্রশ্ন—আচ্ছা, পরাশর বর্মার ওই ছড়াতেই ঘনাদার সব হদিস পেলি?
হ্যাঁ, তাই পেলাম। শিবু গর্বভরেই ব্যাখ্যা করলে, পরাশর বর্মার বিচারে হয়তো ভুল হতে পারে। কিন্তু শাল-দোশালার জ্বালা নিরামিষে সারবে থেকেই হিপি সাধুদের পবিত্র সরাইটার স্পষ্ট ইশারা পেলাম। তার পর কুলুপ খোলার চাবি ফিরছে তারই পিছে পিছে থেকে বুঝলাম, ঘনাদা নিজেই প্রকাশ হবার জন্য ছটফট করছেন। ব্যাপারটা হলও তাই। ওই হোলি ইন বা পবিত্র সরাইয়ের কাছ দিয়ে যেতে গিয়ে প্রথমেই দেখা পেলাম ঘনাদার। উনি যেন আমার অপেক্ষাতেই দাঁড়িয়ে আছেন। এমনিতে হাসিখুশিই বলা যায়, কিন্তু পাঁচ-পাঁচ দিন আমিষের স্বাদ না পেয়ে বেশ একটু কাহিল মনে হল!
ঘনাদার চিঠিপত্র ও মৌ-কা-সা-বি-স
ঘনাদাদু,
তোমার সাথে আড়ি। তুমি কি সব লেখো, দাদা দিদিরা মজা করে পড়ে। আমায় পড়তে দেয় না। লুকিয়ে পড়ে দেখেছি। ভালো করে বুঝতেই পারিনি। এখন থেকে আমার আর আমার মিনু পুতুলরানীর পড়বার লেখা লিখবে। নইলে আড়ি আড়ি আড়ি।
আমি মানে টুকাই আর আমার পুতুলরানী
হ্যাঁ, ঘনাদার নামে এমন চিঠিও আমাদের এখানে আসে। কেমন করে যে আসে সেইটেই আশ্চর্য। কারণ আঁকাবাঁকা অক্ষরে একটি পোেস্টকার্ডে লেখা এ চিঠির ঠিকানা যা দেওয়া ছিল তা এই—
ঘনাদাদু,
৭২ বনমালী লেন
কোলকাতা
বড় পোস্টাফিসের কেউ ঘনাদার নাম দেখে আর নেহাত ছেলেমানুষের হাতের লেখা দেখে মনটা স্নেহে কোমল হওয়ার দরুনই বোধ হয় চিঠিটা ঠিক ঠিকানাতেই পাঠিয়েছে।
টুকাই-এর চেয়ে আর একটু বড় কারওর চিঠিও আসে মাঝে মাঝে। বড় হলেও যুক্তাক্ষরের বেড়া এখনও পার না হওয়া এমন এক পিকলুর—দাদু নয়, ঘনাদাকে লেখা চিঠি—
ঘনাদা,
তুমি ভালো আছো? আমি ভালো আছি। আমার একটা কথা শুনবে? তুমি যা যা সব বললা তা আর একটু সহজ করে লেখা যায় না? তোমার সব কথা যে লেখে সেই বোকা সুধীর না অধীরকে তাই বলো না। আমি আজ তোমাকেও তাই বলছি। এখন থেকে আমার মতো ছোটরা যা বোঝে শুধু সেরকম করে সব বলবে আর লেখাবে। আর কেবল এসো পড়ি—পড়ে-ই তা যেন পড়া যায়। তাতে কোনো দ্বিতীয় ভাগের জোড়া কথা যেন না থাকে।
