মীমাংসা হয়নি তারপর পাঁচ-পাঁচটা দিন কাটাবার পরও। এ পাঁচ দিন ঘনাদার কোনও হদিস মেলেনি তা বলা বাহুল্য। দিশাহারা হয়ে আর-একবার নিজেদের মান খুইয়ে পরাশর বর্মার কাছেই যাব, না পুলিশে খবর দেব—যখন সব ঠিক করবার জন্য সাতসকালেই আড্ডাঘরে সবাই জড়ো হয়েছি তখন শিবুর হঠাৎ মাথায় যেন কীসের ঝিলিক খেলে গেল। হাতের চায়ের পেয়ালাটা বেসামাল হয়ে ফেলে দিতে গিয়ে সামলে সে উত্তেজিত স্বরে বললে, আচ্ছা, পরাশর বর্মার ধাঁধার ছড়াটা কোথায়? কার কাছে?
কাগজে টোকা ছড়াটা আমার কাছে ছিল। সেটা পকেট থেকে বার করে শিবুর হাতে দিয়ে ঠাট্টার সুরে বললাম, এ ছড়ার মধ্যেই ঘনাদার অন্তর্ধান রহস্যের হদিস আছে নাকি?
থাকতেও পারে, বলে গম্ভীর মুখে শিবু আমাদের সকলকে অবাক করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
বিকেলবেলা ফিরে এল আমাদের তেমনই অবাক শুধু নয়, একেবারে হতভম্ব করে। সে একা ফেরেনি। সঙ্গে তার স্বয়ং ঘনাদা।
হ্যাঁ, ঘনাদা ফিরলেন!
কিন্তু এ তাঁর কী রকম ফেরা!
সেই মার্কামারা ধুতি শার্ট আর পায়ে অ্যালবার্ট শু পরা ঘনশ্যাম দাস নয়, পায়ে বিদ্যাসাগরি হলদে চটি, পরনে ধুতি পাঞ্জাবিগুলো সাদা হলেও তার ওপর কাঁধে ঝোলানো গেরুয়া চাদর আর মাথায় গেরুয়া রঙের গান্ধীটুপি।
এ বেশে তিনি কোথা থেকে এলেন? ছিলেনই বা কোথায়?
কোথায় যে ছিলেন, তা তাঁকে সমাদরে তাঁর মৌরসি আরাম-কেদারায় বসিয়ে শিবুর পাড়া কাঁপানো হাঁকে নীচের রামভুজকে ফরমাশ দেওয়া থেকেই বুঝি বোঝা গেল। মুরগি-মটন-মছলি-আন্ডার যাবতীয় জানা অজানা খানার সে কী লম্বা ফর্দ! সাতদিন উপোস করা বা প্রাণের দায়ে শাকপাতা চিবানো কেঁদো বাঘের সে যেন প্রথম নিয়মভঙ্গের খাওয়ার ফিরিস্তি।
কিন্তু পাঁচ-পাঁচ দিনের উপোস-ভাঙা এমন রাক্ষুসে খিদে ঘনাদার হল কেন? মাছ-মাংসের মুখ না দেখে কোথায় ছিলেন তিনি এ ক-দিন?
কোথায় আর?
পাড়ার জাত গেল বলে যার সম্বন্ধে বাঁকা টিপ্পনি করেছিলেন একদিন, দেশি-বিদেশি, আর দেশির চেয়ে বিদেশিই বেশি, নবীন সাধুদের নতুন গড়ে ওঠা আমাদের পাড়ার সেই পবিত্র হোটেলে, মাছ-মাংসের নয়, পেঁয়াজের গন্ধও যার ত্রিসীমানায় কেউ পায় না, সেখানেই।
দুনিয়ায় এত জায়গা থাকতে ঘনাদা ওখানে যাবেন কোন দুঃখে?
নিজেদের মধ্যেই আলাপের ধরনে কথাটা বললেও, প্রশ্নটা যাঁর উদ্দেশে করা, তিনি উত্তর দিলেন আমাদের চমকে।
গেছলাম আর কেন? ওই রশিদ খাঁকে এড়াতে।
আমাদের মনের সন্দেহটা আমাদের মুখের ওপর ঘনাদা অমন করে ছুঁড়ে মারবেন, ভাবিনি।
অত্যন্ত অপ্রস্তুত হয়ে তাই যতটা পারি, সামলাবার চেষ্টা বললাম, না, না, সে। কী বলছেন!
রশিদ খাঁ, মানে ওই শালওয়ালা আপনার কত বড় ভক্ত তা তো নিজেদের চোখেই দেখলাম।
খাঁটি ভক্ত না হলে কেউ অমন দামি মলিদাটা আপনার জন্য জোর করে গচ্ছিত রেখে যায়!
না, না, আসল কথাটা লুকোবেন না!
শেষের কাতর অনুরোধটা বিফলে গেল না!
তিনি যে একটু গলেছেন, গলার স্বরেই তা বুঝতে দিয়ে যেন একটু দ্বিধাভরে বললেন, নেহাত শুনবে তা হলে?
শুনব না মানে! শিশির তার সিগারেটের টিনটা খুলে সামনে ধরে তার লাইটারটা জ্বালতে জ্বালতে বললে, পাঁচ-পাঁচ দিন আপনি নিরুদ্দেশ। তারপর দেখা যখন পেলাম তখন এই আপনার বেশ! সত্যি কোথায় ছিলেন সেইটেই না জানলে, উদ্বেগে দুর্ভাবনায় গ্যাসট্রিক আলসার হয়ে মারা যাব।
তা হবে না! শিবুই এবার ফোড়ন কাটল, উনি ছিলেন আমাদের পাড়ায় ওই নতুন গড়ে ওঠা ওই হোলি ইন মানে পবিত্র সরাইখানা।
সত্যি, ওই হোলি, মানে ওই–ওই নতুন হিপি হোটেলটায়?
এবার বিমূঢ় বিস্ময়টা আমাদের স্বতঃস্ফূর্ত আর আন্তরিক। জিজ্ঞাসাগুলোও তাই।
ওখানে থাকবার জন্য এই সাজ নিয়েছিলেন।
পাঁচ-পাঁচটা দিন ওখানে কাটালেন ওই হিপি-মার্কা সাধুদের সঙ্গে স্রেফ নিবামিষ খেয়ে?
কিন্তু কেন?
কেন?—ঘনাদা এই শেষ প্রশ্নটার জবাব দিলেন গাঢ় গম্ভীর স্বরে—শুধু একটা বাক্সের জন্য। নেহাত খুদে একটা বাক্স, পাঁচ ইঞ্চি লম্বা আর তিন ইঞ্চিটাক চওড়া।
ওই বাক্সটার মধ্যে–কী আছে ও বাক্সে? হিরে মানিক?
না। ঘনাদা আমাদের মূর্খতায় ধৈর্য ধরে বললেন, আছে অতি সূক্ষ্ম, মানে চুলের চেয়েও অনেক সরু স্ফটিকের সুতোয় বাঁধা একটি ছোট্ট চুম্বক।
এই! আমাদের হতাশাটা গলায় লকোনো রইল না।
হ্যাঁ, ওই, ঘনাদা তেমনই ধৈর্যের অবতার হয়ে ধীরে ধীরে বললেন, সমস্ত মানুষ জাতটাই নিশ্চিহ্ন করে দেবার মতো যে সর্বনাশা পরিণাম আমাদের মাথার ওপর খাঁড়ার মতো ঝুলছে, তার কথা আগে থাকতে জানিয়ে দেবার একমাত্র খেলনা বলতে পারো, যা চালাতে বিন্দুমাত্র কোনও শক্তির দরকার হয় না, অমন পঞ্চাশ ষাট একশো বছর পর যা আপনা থেকেই শূন্যাঙ্কের আশি ডিগ্রি নীচে অতি নিম্নতাপেও কাজ করে যেতে পারে। আর সে কাজটা কী জানো?
নির্বোধ বিস্ময় দেখাবার জন্য অভিনয় করবার দরকার হল না এবার।
মুখগুলোর ওপর একবার চোখ বুলিয়ে ঘনাদা বোধহয় খুশি হয়েই বললেন, মানুষ জাতের প্রাণভোমরা আমাদের দুনিয়ার যেসব কাণ্ডকারখানার কাটাকুটির ওপর ভাগ্যের জোরে টিকে আছে তারই মাপজোখ কষা, মাপ করা হল ওই খেলনার বাক্সের কাজ। ওর নাম হল ম্যাগনেটো মিটার, আমাদের প্রাণভোমরার একরকম ইলেকট্রোকার্ডিয়োগ্রাম বলতে পারো। কিন্তু এ যন্ত্রের দরকার কী?
