অত্যন্ত ব্যথিত আর হতাশভাবে বিদায় নেবার আগে রশিদ খাঁ কিন্তু নাছোড়বান্দা হয়ে একটি দামি মলিদা ঘনাদার জন্য রেখে গেছে। আমাদের ওজর আপত্তি কিছুই সে শোনেনি। দামের কথা তো মুখে আনতেও দেয়নি। ঘনাদা আর আমাদের সাধ্যের কথা ভেবে আমাদের সমস্ত আপত্তি এক কথায় খন্ডন করে বলে গেছে যে দামের জন্য কোনও পরোয়াই নেই। একজন যথার্থ পয়লা নম্বর সমঝদার জহুরির জন্য যে রেখে যেতে পারছে এই তার গর্ব।
শেষ পর্যন্ত রশিদ খাঁ-কে বিদায় দিয়ে পরাশর বর্মার খিদিরপুরের বাসায় যেতে বেশ একটু দেরি হয়ে গেছে। রাত তখন প্রায় দশটা। অসময়ে তাঁকে বিরক্ত করতে যাওয়া ঠিক হবে কি না ভেবে মনে যা একটু দ্বিধা ছিল বাসায় পৌঁছেই তা দূর হয়ে গেছে। পরাশর বর্মার বাইরের ঘর শুধু খোলা না, সেখানে তখন তিনি বন্ধু কৃত্তিবাস ভদ্রের সঙ্গে কাব্যচর্চায় মশগুল।
আমাদের দেখে, হেসে ও মাথা নেড়ে, পরাশর সাদর অভ্যর্থনাই জানালেন ঠিক, কিন্তু পরের পর যেরকম ছড়া আর কবিতা তখন পড়ে যাচ্ছেন খাতা থেকে তাতে আমাদের কোনও কথা ধৈর্য ধরে শোনার অবসর আছে বলে মনে হল না। তবু গরজ বড় বালাই।
তাই তাঁর কবিতা আর ছড়া পাঠের মধ্যে একটু-আধটু যা ফাঁক পেলাম তাতেই আমাদের সমস্যা যতটা সংক্ষেপে সম্ভব, কাতরভাবে তাঁকে জানিয়ে তিনি কী বলেন তো শোনার অপেক্ষায় রইলাম।
অপেক্ষা যে বৃথা মনে মনে তখন হতাশভাবেই মেনে নিয়ে নেহাত নিরুপায় হয়েই বসে বসে এ কাব্য-যন্ত্রণা কখন শেষ হবে তাই ভাবছি।
কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার! অপেক্ষা করতে হলই না বলা যায়। একটা কী ছড়া শোনাতে শোনাতেই মাঝপথে থেমে পরাশর আমাদের দিকে ফিরে যা বললেন তাতে আমরা একেবারে তাজ্জব!
আরে তোমরা আর কতক্ষণ বসে থাকবে! বলে একটু থেমে হঠাৎ বললেন, শোনো শোনো, এই ছড়াটা একটু ভাল করে শুনে নাও!
ছড়া শুনব? আমাদের মুখগুলো সব হাঁ।
হ্যাঁ, শোনো! পরাশর নির্বিকারভাবে বলে চলেন, ইচ্ছে করলে টুকেও নিতে পারো! হ্যাঁ, টুকে নেওয়াই বোধ হয় ভাল।
আমাদের দিকে কাছে-রাখা একটা প্যাড আর পেনসিল ছুঁড়ে দিয়ে পরাশর যে ছড়াটা আউড়ে গেলেন তা এই—
যে দিকে চাও সে দিকেতেই ধাঁধা
তবুও জানি, সঠিক
কারণ বিনা হয় না কার্য—
দুই-এ যেন শিকল দিয়ে বাঁধা।
সেই শিকলের একটা শুধু
আংটা যদি পাই।
হয়তো টেনে তুলতে পারি।
আমূল ধাঁধাটাই।
এতদূর পর্যন্ত শুনিয়ে পরাশর আবার একটু থামলেন। তারপর আচমকা কী যেন একটা ঝিলিক মনের মধ্যে পেয়ে গিয়ে একটানা বলে গেলেন—
কেউ কি জানে, কোথায় কী হয়,
কেনই বা হয়, কীসে?
শাল-দোশালার ধরলে জ্বালা
সারতে পারে হয়তো নিরামিষে।
যা করো আর যাই বা ভাবো
এইটি জেনো সার,
বাঘের ঘরেই ঘোগের বাসা
কোথ্থাও নয় আর।
বাঘটা কেমন না থাক জানা
ভাবনা করা মিছে,
এই জেনো ঠিক, কুলুপ খোলার
চাবি ফিরছে তারই পিছে পিছে।
পরাশর বর্মা যেভাবে তাঁর ছড়া আওড়ানো শেষ করে আবার নিজেদের সামনে রাখা খাতাটা খুলে বন্ধু কৃত্তিবাসের দিকে ফিরলেন তাতে সেটা স্পষ্টই আমাদের বিদায় দেওয়া বলে বোঝা গেল।
সে অবস্থায় জোর করে সেখানে বসে থাকা যায় না। নিরুপায় হয়েই হতভম্ব মুখে আমাদের সে-ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হল।
কিন্তু এখন আমরা করব কী? পরাশর বর্মার বাড়ির গলি থেকে বড় রাস্তায় বেরিয়ে একটা বাস-স্টপের কাছে দাঁড়িয়ে সেই প্রশ্ন নিয়েই আমরা পরস্পরের মুখের দিকে চাইলাম।
এ আবোল-তাবোল ছড়া আমাদের শোনাবার মানে? গৌর বেশ একটু তেতো গলাতেই তার ক্ষুব্ধ বিস্ময়টা প্রকাশ করলে।
আমরা কী জানতে ওঁর কাছে এলাম, আর উনি আমাদের সঙ্গে কী রসিকতা করলেন! শিশিরের ঝাঁঝালো মন্তব্য।
একটা ট্রাম এসে যাওয়ায় তাতে এরপর সবাই চড়ে বসলাম। এত রাত্রে এসপ্ল্যানেডে যাওয়ার ট্রামটা প্রায় খালি। পেছনের দিকে চারজনে সেই একই ব্যাপার নিয়ে উত্তেজিত আলোচনায় মত্ত হয়ে রইলাম।
আমাদের সঙ্গে পরাশর বর্মার এ ব্যবহারটা কি অপমান বলে ধরব, না শুধু একটু উপহাস?
উপহাসই যদি হয় তা উনি আমাদের করেন কী অধিকারে? আমাদের কি উনি অবোধ শিশু পেয়েছেন!
দাঁড়াও! দাঁড়াও! আমাদের মধ্যে শিবুই মাথাটা একটু ঠাণ্ডা রেখেছিল এতক্ষণ। সে এবার হঠাৎ গম্ভীরভাবেই আমাদের থামিয়ে আলোচনাটার মোড় একটু ফিরিয়ে দিয়ে বললে, আচ্ছা, ছড়া শোনাবার আগে, বন্ধু কৃত্তিবাসকে কবিতা শোনাবার ফাঁকে ফাঁকে উনি দু-একটা কী সব জিজ্ঞাসা করছিলেন না?
হ্যাঁ, করছিলেন। শিশির গরম মেজাজেই বললে, উনি আমাদের কারওর ওপর বা বাহাত্তর নম্বরের সম্বন্ধে কিছু বিরক্ত হয়েছিলেন কি না এমন কী দু-একটা আজেবাজে প্রশ্ন!
আমরা ওঁকে তো জানিয়েইছিলাম তখন, গৌর শিশিরের কথাতেই সায় দিয়ে জানালে, সেরকম কোনও কিছুই হয়নি। পাড়ার মধ্যে নতুন একটা হোটেল খোলায় পাড়াটার জাত গেল বলে দু-চারবার একটু গজগজ করেছিলেন বটে, কিন্তু সেটা আমাদের সঙ্গ ছাড়বার মতো রাগ বা বিরক্তি কিছুই নয়।
বরং তাঁর মেজাজ যে হালে রীতিমত খোশ ছিল তার প্রমাণ হিসেবে কাশ্মিরি শালওয়ালার কথাটা আমি বলেছিলাম, বললে শিশির। মেজাজ খোশ না থাকলে শালওয়ালাকে তার কারবারের বিষয়েই জ্ঞান দিয়ে অমন মোহিত করবার মর্জি তাঁর হয়?
এসপ্ল্যানেডে ট্রাম গিয়ে পৌঁছনো পর্যন্ত এ আলোচনা আমাদের চললেও কোনও মীমাংসায় পৌঁছনো যায়নি।
