তাহলে? তাহলে?—আমাদের প্রশ্ন করতেই হল—সরকারি গুনতিতে সেই আটাশটাই লেখা আছে তো?
না। ঘনাদা একটু হেসে জানলেন, সরকারি গুনতিতেই পুরোপুরি ত্রিশটা শিকার করা বাঘের কথাই লেখা আছে। আটাশের জায়গায় ত্রিশ ধরার ওই ভুলের জন্যই বনবিভাগের মোট হিসেবে ওই সংখ্যার ভুল থেকে গেছে।
কিন্তু গুনতিতে অমন ভুল হবে কেন? আমরা নাছোড়বান্দা হয়ে জানতে চাইলাম, বনবিভাগের লোকেরা তো শিকার করা বাঘ না দেখে আন্দাজে সংখ্যা বাড়িয়ে দেয়নি।
না, তা দেয়নি। ঘনাদা ধৈর্য ধরে বললেন, মিথ্যে করেও কিছু লেখেনি। তারা বনের মধ্যে শিকার করা বাঘ স্বচক্ষে দেখে দেখেই হিসেব লিখেছে।
তা কী করে হয়?—আমরা সন্দিগ্ধ-আটাশের পর আরও দুটো শিকার করা বাঘ এল কোথা থেকে, গেলই বা কোথায়?
কোথা থেকে এল আর কোথায় গেল তা জানে শুধু একজনই।—ঘনাদা হাতের সিগারেটের শেষটুকু ফেলে ওঠবার উপক্রম করলেন।
তাঁকে চেপে ধরে বসিয়ে আর একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে বসিয়ে বললাম, সে একজন তো আপনি বলুন, ওটা কি ম্যাজিক-এর ব্যাপার?
না, ম্যাজিক নয়—ঘনাদা করুণা করে বিশদ হলেন—আমি তখন বারশিঙ্গা হরিণের খোঁজে ওই কানহার জঙ্গলে ঘুরে বেড়াচ্ছি। বারশিঙ্গা হল ডালপালা মেলা শিং-এর এক অপরূপ হরিণ। আজ সরকারি কড়াকড়িতে সে হরিণের সংখ্যা চারশো ছাড়াতে চলেছে আর সেই ১৯৫৪-তে সে হরিণ গোটা পঞ্চাশ-ষাটটা ছিল কিনা। সন্দেহ! বারশিঙ্গার সন্ধানে ওখানকার জঙ্গলে ঘোরার সময়েই ওই খুনে বাঘ শিকারির কথা কানে আসে। ওই জাতের বেপরোয়া খুনে শিকারিদের অত্যাচারে বাঘ বলে প্রাণীবংশটাই যে লোপ পেতে বসেছে তাই নিয়ে সব দেশের সহৃদয় জ্ঞানীগুণী বৈজ্ঞানিক মহলে জোর আন্দোলন চলছে। অবাধ বাঘ শিকার বন্ধ না করলে ভারতবর্ষে এই প্রাণীটি কিছুদিন বাদে আর দেখা যাবে না তাই জানিয়ে সরকারি ওপর মহলে লেখালেখিও কম হচ্ছে না। তারই ভেতর ত্রিশ-ত্রিশটা বাঘ মারবার লাইসেন্স দেবার মতো এমন অন্যায় কী করে হল তা নিয়ে দিল্লি ছোটাছুটিতে তখন কোনও লাভ নেই, আর তার সময়ও নেই জেনে খোদ খুনে শিকারির সঙ্গেই দেখা করবার চেষ্টা করলাম। দেখা করা শক্তও ছিল না। কারণ ত্রিশটা বাঘ মারার হুকুম যে জোগাড় করেছে সে তো শিকারে নয়, যেন ঘটা করে বিয়ে করতে এসেছে এমনই তার সমারোহ। জঙ্গলের মধ্যে চাকর-বাকর-বাবুর্চি-খানসামা নিয়ে তাঁবুই পড়েছে তিনটে। তার মধ্যে বড় তাঁবুটা যেন রাজদরবার।
অন্য দুই তাঁবুর খবরদারির পর সেখানে যাবার তখন অনুমতি পেলাম যেন ভিখিরির মতো। ভেতরে যখন ঢুকলাম তখন শিকারি সাহেব বিকেলের নাস্তা করছেন। সামনের টেবিলে পাখ-পাখালি আর খরগোশ হরিণের মতো হরেক রকম জংলি শিকারের মাংসের সব প্লেট সাজানো। শিকারির হাতে কিন্তু তরল বস্তুর গেলাসই ধরা।
যা শিকার করতে এসেছেন সেই বাঘের মতোই চেহারা। সেই রকমই গলায় আমায় বললে, কী? কী চাস তুই? এই জঙ্গলেও তোদের হাত থেকে রেহাই নেই? এখানেও এসেছিস ভিক্ষে করতে?
হ্যাঁ, ভিক্ষে করতেই এসেছি, সবিনয়ে বললাম, দয়া করে যদি সে ভিক্ষা দেন।
কী? কী ভিক্ষা চাস এই জঙ্গলে? শিকারি সাহেব গর্জন করে বললো।
আজ্ঞে, সবিনয়ে বললাম, শুধু দশটা বাঘ।
দশটা বাঘ! তার সঙ্গে রসিকতা ভেবে সাহেব রাগে প্রায় ফেটে পড়ে আর কী! আমার সঙ্গে চালাকি করতে এসেছিস? আভূভি নিকালো—
দোহাই আপনার হাতজোড় করে একবার বললাম, আমার কথাটা দয়া করে একটু শুনুন। আপনি এ পর্যন্ত কুড়িটা বাঘ মেরেছেন। আরও দশটা মারবার আপনার হুকুম আছে। আমাদের ভারতবর্ষের খাতিরে, বাঘের বংশের খাতিরে ওই দশটা বাঘ আর মারবেন না। ওগুলো দুনিয়াকে ভিক্ষে দিন।
কে কার কথা শোনে? আভি নিকালো হিয়াসে! বলে সাহেব যেন খ্যাপা গণ্ডারের মতোই আমার দিকে তখন ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়েছে।
সেই ঝোঁকেই তাঁবুর মেঝেতে মুখ থুবড়ে পড়ার পর টেবিলে খানার প্লেটগুলো তার গায়ের ওপর ছুড়ে দিয়ে তার গেলাসটার তরল বস্তুও তার ওপর ঢেলে দিয়ে। চলে এলাম।
সাহেব তখন মেঝে থেকে উঠে রাগে চিৎকার করছে, পাকড়ো উসকো, পাকড়ো উ বদমাস কো—
কিন্তু কে পাকড়াবে! জঙ্গলে মিলিয়ে যাবার আগে সাহেবের লোকজন তাঁবু থেকে বেরিয়েছিল বটে, কিন্তু ওই বার হওয়া পর্যন্তই।
সাহেবকে একটু শিক্ষা দিয়ে আসার পর জঙ্গল যেন আমার কাছে বিষ হয়ে উঠল। একদিন যায়, দুদিন যায়, আর সাহেবের, একটা একটা করে নতুন বাঘ শিকারের খবর পাই। রাগে দুঃখে আমার যেন হাত-পা কামড়াতে ইচ্ছে হয়।
এই অবস্থায় বনবিভাগের সদর দপ্তরে গিয়ে দেখা করলাম। তারা যে নিরুপায় তা জেনেও আইন কেউ ভাঙলে তাদের কতদূর এক্তিয়ার তা জেনে নিলাম।
তারপর কিছুদিনের জন্য জঙ্গল ছাড়লাম। ফিরে যখন এলাম তখন সাহেবের সাতাশটা বাঘ মারা হয়ে গেছে। ক-দিন বাদে আটাশটাও পূর্ণ হল। তারপরই বনবিভাগের স্থানীয় কর্তা আর সেপাই সান্ত্রীদের ডেকে শিকার করা বাঘের লাশ দেখালাম।
বনের মধ্যে এক জংলা ঝোপের ধারে শিকার করা বাঘের লাশ পড়ে আছে। খুনে শিকারি সাহেব সেটা তখনও সরিয়ে নিয়ে যাবার সময় পায়নি। সেটার কথা বনবিভাগের দপ্তরে জানায়ওনি।
প্রমাণের জন্য শিকারির মারা বাঘটার পেটের ওপর পা রেখে দাঁড়িয়ে একটা ফটো তোলালাম। বেপরোয়া খুনে হলেও সাহেব যে অব্যর্থ শিকারি তা তার বাঘটার কানের ভেতর দিয়ে নির্ভুল গুলি চালানোতেই প্রমাণ করে বোঝাতে ফুটো কানের যেটা দিয়ে গুলি যাওয়ার দরুন রক্ত ঝরে পড়েছে সেই কানটা টেনে দেখালাম। বাঘটার বয়স বুঝতে তার মুখটা হাঁ করে দাঁতগুলোর অবস্থাও দেখলাম।
