এই কানকাটার যে সব ভয়ংকর ব্যাপারের কথা সুন্দরবনের এক অঞ্চলে মুখে মুখে ফিরছে তা আজগুবি গল্প,না তার মধ্যে কিছু সত্য আছে এখনও স্থির করতে না পারলেও আমাদের বনবিভাগের সাবধানের একটু কড়াকড়ি বাড়াতে হয়েছে, এই হয়েছে। মুশকিল। শিবু শেষ কথাগুলি বলে যেন হতাশ হয়ে থামল। না, আজ শিবুকে সত্যিই বাহাদুরি দিতে হয়। এতক্ষণ ধরে আসর দখল করে রাখলেও সে খেলাটা সাজিয়েছে। ভাল। এখন আমরা ঠিক মতো দু-একটা খুঁটি নাড়তে পারলেই বাজিমাত হতে পারে।
শিবুর এগিয়ে দেওয়া খুঁটিটাই তাই নাড়লাম। বললাম, কড়াক্কড়ি বাড়িয়েছে, মুশকিল তো এই? পাশ দেওয়া বন্ধ তো করেনি? তা কড়াকড়িটা কী বাড়িয়েছে? কী তারা চায়, কী?
কী চায়? শিবুর গলায় গভীর হতাশা। তারা চায় সঙ্গে একজন শিকারি নিতে হবে।
হাসব না কাঁদব এমন গলায় বললাম, এই শুনে তুই এমন একটা মওকা নষ্ট করে এলি? একটা শিকারির অভাবে?
না হে, না। শিবু যেন তার সমালোচনায় জ্বলে উঠে বললে, বন্দুক হাতে পেলেই ঘোড়া টেনে ছুড়তে পারে তেমন শিকারি ভাবছ নাকি! ওরা যা চায় তা অন্য জাতের শিকারি। চোখের দৃষ্টি আর বন্দুকের গুলিতে যার গাঁটছড়া বাঁধা। ডান বাঁ, যে দিকে হোক, যা যখনই দেখে তক্ষুনি তা ফুটো করে দিতে পারে গুলিতে এমন শিকারি ওরা চায়। নইলে ওই কানকাটার তল্লাটে পাঠাবে কোন ভরসায়?
এই ব্যাপার! আমরা এবার অবাক হয়ে শিবুর দিকে তাকালাম-এমন শিকারি দরকার শুনে তুই পিছিয়ে এলি? এমন কারও কথা তোর মনে পড়ল না যে–
অ্যাঃ, ছিঃ ছিঃ—আমাদের কথা শেষ হবার আগেই শিবু লজ্জায় দুঃখে জিব কেটে নিজের কানদুটো মলতে মলতে বললে, হ্যাঁ, তোরা আমার কান দুটো মলে দিতে পারিস। আমার কিনা ঘনাদার কথাটাই মনে হয়নি। ছি–ছি—
থাম! থাম! শিবুর আত্মধিক্কারে বাধা দিয়ে বললাম, তা মওকা তো এখনও শেষ হয়ে যায়নি। ঘনাদাও সশরীরে হাজির। ঘনাদাকে নিয়ে গেলেই তো হয়। কী। বলেন, ঘনাদা?।
প্রশ্নটা সবাই মিলে যাঁর দিকে ফিরে করলাম তাঁর মুখে তখন কোনও ভাবান্তর নেই। ফুরিয়ে আসা সিগারেটটায় শেষ টানের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, সুন্দরবনে যাবার কথা বলছ? হ্যাঁ, শেষ গেছলাম বটে ১৯৭৩-এ। বাঘ তখন সেখানে মাত্র ১৩৫টা। তার পরের বছরই আবার মধ্যপ্রদেশের কানহার ন্যাশনাল পার্কে ভারতের প্রথম ব্যাঘ্র প্রকল্প চালু হওয়ার ব্যাপার দেখতে গিয়ে দেখি, ১৯৫৪-তে যে-প্যাঁচ দিয়ে কানহার ন্যাশনাল পার্কের পত্তন করিয়ে বন্দুক ধরা চিরকালের মতো ছেড়ে দিই বনবিভাগের হিসেবে সেই সাজানো ভুলটা কুড়ি বছরেও ধরা পড়েনি।
দাঁড়ান! দাঁড়ান! আমরা আকুল প্রার্থনা জানিয়ে বললাম, যা বললেন সেই প্যাঁচালো জটে বুদ্ধিশুদ্ধি সব জড়িয়ে গেছে। ধরবার মতো কোনও খেইই পাচ্ছি না। ব্যাপারটা একটু ভাল করে বুঝতে দিন। এই যেমন প্রথম কথা হল, আপনি বন্দুক ছোঁড়া ছেড়ে দিয়েছেন সেই ১৯৫৪-তে! আর এমন একটা প্যাঁচ কষেছিলেন যার দরুন ন্যাশনাল পার্কের পত্তন হলেও বনবিভাগের হিসেবে একটা ভুল থেকে যায়।
নির্বোধের প্রতি অনুকম্পাভরে দুবার মাথা নেড়ে ঘনাদা বললেন, হ্যাঁ, ১৯৫৪-তেই বন্দুক ছোঁড়া চিরকালের মতো ছেড়ে দিই। আর আমার প্যাঁচের দরুন হিসেবের যে ভুলটা সেদিন হয়েছিল বনবিভাগ এখনও তা শোধরাতে পারেনি।
বনবিভাগের হিসেবে ভুল! এবার আমাদের জিজ্ঞাসা—ভুলটা কী?
ভুলটা মোট বাঘের হিসেবের, ঘনাদা জানালেন, ১৯৭২-এ বনবিভাগের মতে কানহাতে বাঘের সংখ্যা হল ১৮০০া ওই অঙ্কটাই ভুল!
তার মানে?—আমাদের সন্দিগ্ধ জিজ্ঞাসা—ওটা যদি ভুল হয় তাহলে ঠিক সংখ্যাটা কত?
ঠিক সংখ্যাটি হল ১৮০২—ঘনাদা যেন অনিচ্ছার সঙ্গে জানালেন—এ ভুল সেই ১৯৭২-এরই নয়, ভুলটা চলে আসছে সেই ১৯৫৪ থেকে। যখন সেই এক খুনে সাহেবের হাতে গণ্ডা গণ্ডা বাঘ মারা যাবার পর দেশময় সোরগোল ওঠার পর মধ্যপ্রদেশের ওই অঞ্চলটা কানহা ন্যাশনাল পার্ক বলে সরকারি ভাবে ঘোষিত হয়। গণ্ডা গণ্ডা বাঘ মারা নিয়ে দেশময় শোরগোল তোলার পেছনে কার কতটুকু হাত ছিল। সে আর ক-জন জানে!
তার মানে? আমরা উদগ্রীব হয়ে জানতে চাইলাম, ওই শোরগোল তোলার মধ্যে আপনিই ছিলেন আর ওই গুনতির ভুলের মধ্যে—
ব্যাপারটা হয়েছিল কী?
ব্যাপারটা এই যে, ঘনাদা যেন নেহাত অনিচ্ছার সঙ্গে বিস্তারিত করে বললেন, তখনকার দিনে এক খুনে মেজাজের সাহেব কল-টল নেড়ে একসঙ্গে একবারে ত্রিশটা বাঘ মারবার লাইসেন্স জোগাড় করেছিল। দুনিয়া থেকে তখনই বাঘের বংশ লোপ পাবার অবস্থা হয়েছে। আজ যেখানে ২৬৪, সেই সুন্দরবনেই বাঘ তখন ১৩৫-এরও নীচে নেমে গেছে। আর বনবিভাগের হিসেবেই যেখানে তিন হাজার বাঘ মধ্যপ্রদেশের সেই কানহায় তখন ১৮০০-রও অনেক কম। দুনিয়ার শিকারি মহলে তো বটেই, সব মানুষদের মধ্যেও বাঘের মতো প্রাণীকে বিলুপ্তি থেকে বাঁচাবার জন্য সংরক্ষণের উপায়ের কথা ভাবা হচ্ছে। সেই সময়ে একটা-দুটো নয় একেবারে ত্রিশ-ত্রিশটা বাঘ খুশি মতো সাবাড়! প্রথমে একটা দুটো থেকে দেখতে দেখতে দেশের সব অঞ্চলের কাগজে এই নিয়ে লেখালেখি শুরু হল। দেশ তখন স্বাধীন। সরকারি মহলে, বিধানসভায়, লোকসভায় প্রশ্ন উঠল এই নিয়ে।
তারপর ক্রমেই ব্যাঘ্র-প্রকল্প শুরু না হলেও মধ্যপ্রদেশের ওই অঞ্চলটা কানহা ন্যাশনাল পার্ক নামে আলাদা করা হল। খুনে মেজাজের সেই ব্যাঘ্রমেধ বিলাসী সাহেবের পাপে শেষ পর্যন্ত কিন্তু সুফলই ফলেছিল ব্যাঘ্র-প্রকল্পের সূত্রপাত হয়ে। মজার কথা এই যে সেই খুনে শিকারি সাহেব কিন্তু তার পুরো লাইসেন্স-এর বরাদ্দমত ত্রিশটা বাঘ মারেনি, মেরেছিল মাত্র আটাশটা।
