আছে বই কি, চৈত সংক্রান্তির মেলায় কতবার গিয়েছি!
কঙ্কালীতলার মা জাগ্রত জানিস?
খুব জানি। কতবার মানত করেছি, কোনদিন ফলে নি!
কেন ফলে নি এখন বোঝ! তোর মনে যে পাপ!
পাপ কোথায় দেখলে কায়েৎ মশাই?
এই যে খিরিস্তান হতে যাচ্ছিস। তবে শোন, কাল রাত্রে স্বপ্ন দেখেছি, কঙ্কালী মা বলছেন, ফকরে খিরিস্থান হয়েছে কি তাকে আস্ত গিলে খাব!
সাহেব ঠেকাতে পারবে না?
সাহেবের বাবার সাধ্য নেই ঠেকায়।
তবে কি করব মশাই?
যা এখনই পালিয়ে চলে যা, গিয়ে কঙ্কালীতলায় ভাল করে একটা পূজা দে গে। আর কখনও এমুখো হোস নি।
এই বলে তখনই সে ফকিরকে পথখরচা যুগিয়ে দিয়ে রওনা করে দেয়।
পরদিন ভোরবেলা “খ্রীষ্টের খোঁয়াড়ে প্রবেশেছু মেষ”-কে পলায়িত দেখে টমাস বিমর্ষ হয়ে পড়ে।
টমাস শুধায়, কি মুন্সী, নীরব কেন?
ভাবছি, রেশমীও যদি ফকিরদের পন্থা অনুসরণ করে তখন তো কৃষ্ণদাস আছেই।
নিরুৎসাহিত টমাস বলে, তা আছে বটে, কিন্তু দুয়ে অনেক প্রভেদ।
হাঁ, একজন পুরুষ আর একজন স্ত্রীলোক।
শুধু স্ত্রীলোক? অপূর্ব সুন্দরী!
তাতে তোমার কি লাভ? সঙ্গে তো মালিক আসছে!
টমাস সংক্ষেপে বলে, মিঃ স্মিথকে আমি পছন্দ করি নে।
আমিও করি নে। আচ্ছা ডাঃ টমাস, প্রথম ধর্মান্তরের ফল তুমিই কেন ভোগ কর না। জনকে তাড়িয়ে দিয়ে রেশমীকে তুমি বিয়ে কর না কেন?
বলা বাহুল্য এটা রাম বসুর মনের কথা নয়। সে চায় জনে টমাসে একটা গোলমাল পাকিয়ে উঠে রেশমীর ধর্মান্তর-গ্রহণ বাধাপ্রাপ্ত হক।
কৃতজ্ঞ হয়ে টমাস বলে, মুন্সী, তুমি সত্যই আমার বন্ধু, কিন্তু তা হওয়ার নয়।
কেন, আমি যতদূর জানি রেশমী তোমার প্রতি বিরূপ নয়।
সে কথা তো আমিও জানি। আমাকে দেখলেই সে লজ্জায় পালিয়ে বেড়ায়।
তবে কেন না হবে?
দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে টমাস বলে, মিঃ স্মিথ জানিয়েছে যে বিয়ের পরে ভারী রকম দান করবে আমাদের মিশনে।
টমাস ও রাম বসু দুজনেই বুঝল এর পরে আর যুক্তি নেই।
সময়োচিত কিছু বলা কর্তব্য মনে করে রাম বসু বলল, তাই তো! তবে উপায়?
উপায় তিনিই করবেন যিনি কৃষ্ণদাসকে জুটিয়ে দিয়েছেন, আবার যিনি রেশমীকে জোটাতে যাচ্ছেন।
তা বটে, তা বটে, বলে রাম বসু, আবার দেখ তিনি শুধু কৃষ্ণদাসকে জুটিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হন নি, তার ঠ্যাঙ ভেঙে দিয়ে তোমার কাজের পথ কেমন সুগম করে দিয়েছেন।
এ দুয়ে যোগাযোগের কথা তো ভেবে দেখি নি। বুঝিয়ে দাও দেখি। রাম বসু আরম্ভ করে।
এ তো অত্যন্ত সহজ বিষয় ডাঃ টমাস, এখনই বুঝিয়ে দিচ্ছি। ফকির পালিয়ে গেল কেন?
টমাস বলে, কেউ তার কান ভারী করে থাকবে।
সেটা অসম্ভব নয়, বলে রাম বসু, কিন্তু পালাল পা দুখানার সাহায্যে। এখন বোঝ পা ভাঙা হলে নিশ্চয় চলে যেতে পারত না।
সে কথা সত্য।
এখন দেখ কৃষ্ণদাস ছুতোর পা ভেঙে পড়ে আছে, তাই না তুমি তাকে নিরাপদে ধর্মতত্ত্ব শোনাবার সুযোগ পেয়েছ।
কিন্তু হাত ভাঙলেও সে সুযোগ পেতাম।
ভাঙা হাত নিয়ে সে-ও পালাবার সুযোগ পেত। এখন পা ভেঙেছে বলেই লোকটা অচল।
তা বটে।
তবে কি এটাকে ভগবানের বিশেষ দয়া বলে মনে করা চলে না?
কিন্তু তার কথাটাও একবার ভেবে দেখ, লোকটা কষ্ট পাচ্ছে।
আর সে ফকিরের মত পালিয়ে গেলে তুমি যে কষ্ট পেতে!
খুব কষ্ট পেতাম মুন্সী, বিশ বছর এদেশে ধর্মপ্রচার করছি অথচ একটা নেটিভকে খ্রীষ্টান করবার সুযোগ পেলাম না।
এতদিন পরে গোড়ায় কোপ মেরে বিধাতা সেই সুযোগ এনে দিয়েছেন।
গোড়ার কোপটা কি?
কৃষ্ণদাসের ভাঙা পা।
টমাস বলে, কিন্তু লোকে কি বলবে জান, আমি ভাঙা পায়ের সুযোগ নিলাম।
হয় ভাঙা মন নয় ভাঙা পা-একটা কিছু না ভাঙলে কেউ ধর্মান্তর-গ্রহণ করবার জন্যে ব্যাকুল হয় না।
ভাঙা মন বলতে কি বোঝায় মুন্সী?
সেটা শুধিও রেশমীকে, ভাঙা মনের ব্যথা নিয়ে আসছে সে।
ঘুরে ফিরে আবার দুজনে রেশমীর প্রসঙ্গে এসে পড়ে।
টমাস শুধায়, রেশমীর মন ভাঙল কিসের আঘাতে?
খুব সম্ভব মিঃ স্মিথের প্রেমের আঘাতে।
জনের নাম শোনবামাত্র টমাস চাপা তর্জন করে ওঠে, আই ডোন্ট লাইক দি ফেলো! আমি ওকে পছন্দ করি নে!
আর পছন্দ না করে উপায় কি? ও যে মোটা দানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে!
বেশ তো, টাকা দিক, রেশমী খ্রীষ্টান হক, কিন্তু ঐ রাস্কেলটাকে বিয়ে করতে যাবে কেন?
ভুলে যাচ্ছ ডাঃ টমাস, টাকার প্রতিশ্রুতি বিয়ের জন্যে, খ্রীষ্টান করবার জন্যে নয়।
এমন দায়বদ্ধভাবে খ্রীষ্টান করা অনুচিত।
মুন্সী হেসে বলে, ডাঃ টমাস, দায়ে না পড়লে কেউ কখনও অন্য ধর্ম গ্রহণ করে না।
তা হক, আমি রেশমীর জন্যে অন্য বরের চেষ্টা করব।
রাম বসু বাহ্যত অত্যন্ত নিস্পৃহভাবে বলে, দেখ, যদি পাও।
বলা বাহুল্য জনের উপরে সেও হাড়ে-হাড়ে চটে গিয়েছিল অথচ করবার কিছু ছিল না। একে তো রেশমীর নিতান্ত একয়ে স্বভাব, তার উপরে জন খেতাঙ্গ। এখন সে ভাবল কাঁটা দিয়ে যদি কাঁটা উদ্ধার হয় মন্দ কি? টমাস যদি গোলমাল বাধিয়ে দিতে পারে, তবে হয়তো শেষ পর্যন্ত রেশমীর ধর্মান্তর-গ্রহণও বন্ধ হতে পারে। স্পষ্টত কিছু বলা উচিত মনে করল না, এসব কথা কেরীর কানে যাওয়া অবিধেয়। তাই সে নিস্পৃহ ভাব ধারণ করল।
দুজনে যখন এইভাবে চলতে চলতে একটা কানাগলির মাথায় এসে উপস্থিত হয়েছে, এমন সময় ফেলিক্স উল্লাসে চীৎকার করতে করতে ভিতরে ঢুকল-ডাঃ টমাস, মুন্সী, তোমরা এখানে চুপ করে কি করছ? চল চল, গঙ্গার ঘাটে চল!
