তীব্র ব্যঙ্গে জনের পৌরুষ সচেতন হয়ে ওঠে। বলে, আমি শপথ করছি—
বাধা দিয়ে রেশমী বলে, থাক, আর শপথে কাজ নেই।
তবে কি করব?
পারবে?
বলে দেখ।
এ দুটো রাত তুমি বাড়িতে না-ই গেলে, তোমার অফিসে তো দিব্যি থাকবার ব্যবস্থা আছে, সেখানে এ দুটো রাত কাটাও না কেন!
তোমার যদি তাই ইচ্ছা তবে সেই রকমই হবে।
কিন্তু বাড়িতে একটা খবর দিতে হবে তো?
সে বরঞ্চ অফিসে গিয়ে পাঠিয়ে দেব।
বিস্ময়ে জন বলে ওঠে, তুমি যাবে আমার সঙ্গে অফিসে?
শুধু যাব না, থাকব দু রাত তোমার কাছে ওখানে।
আনন্দে জন বলে কাটাবে দু রাত আমার সঙ্গে?
যার সঙ্গে সারাজীবন কাটাতে যাচ্ছি তার সঙ্গে অতিরিক্ত দুটো রাত কাটাতে পারব না?
কিন্তু বিয়ের আগে? তুমি তো জান রেশমী, আমি কত দুর্বল।
তুমিও তো জান জন, আমি কত শক্ত। এই বলে সে উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ওঠ জন, আর দেরি নয়।
দুজনে অফিসের তেতলায় এসে পৌঁছায়। তার পরে রেশমীর পরামর্শে জন লিজাকে চিঠি লিখে জানাল, বন্ধুদের সঙ্গে সে সুন্দরবনে চলল শিকারে, ফিরতে দু-চার দিন বিলম্ব হবে। আর একখানা চিঠি সে লিখল ডাঃ কেরীকে, তাতে খোলাখুলি রেশমীর খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণের আকাক্ষা জানাল, জানাল যে ধর্মান্তরের পরে জন তাকে বিবাহ করবে, আরও জানাল পরশু দিন কোন সময়ে তারা দুজনে পৌঁছবে শ্রীরামপুরে। স্থির হয়ে থাকল যে ভোরবেলাতে একজন আরদালি চিঠিখানা নিয়ে শ্রীরামপুরে রওনা হয়ে যাবে।
.
৩.১৯ ভাঙা পা ও ভাঙা মন
কেরীর মুখে জনের পত্রের মর্ম শুনে রাম বসুর মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল, ঘরে এসে শুয়ে পড়ল সে। এতদিনে সে বুঝল, যে আগুন নিয়ে খেলা শুরু করেছিল, ঐ আগুনের খেলার দক্ষতায় এতকাল ধরে সে দর্শককে তাক লাগিয়ে দিয়েছে; নীরব নৈপুণ্যে যেন বলেছে, দেখ জ্বলন্ত পাবক, অথচ কোথাও স্পর্শ করে নি আমাকে; আজ হঠাৎ সে আবিষ্কার করল কখন অজ্ঞাতসারে আগুনের ফুলকি গিয়ে পড়েছে ঘরের চালে, সব দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠবার মুখে। পাদ্রীদের সঙ্গ তার পক্ষে অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল সত্য, কিন্তু সে তো তাদের ধর্মপ্রাণতার জন্যে নয়। পাদ্রীদের সাহচর্যে পেত সে পাশ্চাত্ত্য জানবিজ্ঞানের, পাশ্চাত্তের উদার সংস্কৃতির আভাস-ঐটুকুই তার কাম্য, তাদের ধর্মোৎসাহ কখনও তাকে বিচলিত করে নি। সেইজন্যেই দীর্ঘকাল তাদের সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও কখনও সে ধর্মান্তর গ্রহণ করবার জন্য সত্যকার উৎসাহ বোধ করে নি। সত্য কথা বলতে কি, জ্ঞানে যেমন তার উৎসাহ, ধর্মবিষয়ে তেমনি তার উদাসীনতা। হিন্দুধর্ম ও খ্রীষ্টধর্ম দুয়ের সম্বন্ধেই তার সমান ধারণা—ওগুলো যেন অপরিহার্য আপদ। ওগুলো হচ্ছে রসাল আমের নীরস আঁঠি। মাঝে মাঝে সে বলেছে বটে যে শীঘ্রই ধর্মান্তর গ্রহণ করবে। স্ত্রীর মৃত্যুর পরে কেরীকে বলেছিল এবারে ধর্মান্তর গ্রহণ করার পক্ষে শেষ অন্তরায় দূর হল। এখন একদিন সুপ্রভাতে “খ্রীষ্টের খোঁয়াড়ে” এসে ঢুকবে। এইভাবে দীর্ঘকাল তাদের আশা জইয়ে রেখেছিল। কেন? পাদ্রীদের আন্তরিকতা আকর্ষণই একমাত্র উদ্দেশ্য। কেন? তাহলে তাদের কাছে থেকে পাশ্চাত্ত্য জ্ঞানবিজ্ঞানের তাপ অনুভব করতে বাধ্য হবে না। পাদ্রীরা যুগপৎ বহন করে এনেছিল মধ্যযুগ ও নবযুগের বাণীনবযুগের বাণীকে গ্রহণ করবার আশাতেই সহ্য করত সে মধ্যযুগের বাণীকে। কিন্তু মধ্যযুগ যে এমনভাবে প্রতিশোধ নিতে উদ্যত হবে ভাবতে পারে নি সে।
রেশমীকে ভালবেসেছিল রাম বসু। সে প্রেম একটু ভিন্ন জাতের। রেশমীর কাছে প্রত্যাখ্যানের পর সে ভালবাসা যেমন চতুৰ্গণ প্রবল হয়েছিল তেমনি কায়িক সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এ যেন চাঁদের প্রতি মানুষের টান। এখন হঠাৎ সংবাদ এল সেই চাঁদে গ্রহণ শুরু হবে, একসঙ্গে রাহু ও কেতুর গ্রাস, জনের ও খ্রীষ্টধর্মের। চাঁদ যাবে চিরকালের জন্যে নিভে, তার ভুবন হবে চিরকালের জনন অন্ধকার। কি করে বাঁচবে সে? এইসব দুরপনেয় চিন্তাজালে যখন সে জড়িয়ে পড়ে ক্লান্ত, তখন প্রচণ্ড উল্লাসে টমাস ছুটতে ছুটতে এসে চীৎকার করে উঠল : মুন্সী, সুসংবাদ শুনেছ? মরুভূমির পথিকের সম্মুখে দয়াময় বিধাতা স্বর্গীয় খাদ্য নিক্ষেপ করেছে, সুন্দরী রেশমী আসছে খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করবার উদ্দেশে।—কি মুন্সী, তোমাকে বিমর্ষ দেখছি কেন?
শরীরটা বড় ভাল নেই ডাঃ টমাস।
বল কি, নাড়ীটা দেখি।
জোর করে তার হাতে টেনে নিয়ে নাড়ী পরীক্ষা করে বলে, কই, এমন কিছু তো নয়।
রাম বসুকে স্বীকার করতে হয় যে সত্যই এমন কিছু নয়।
তবে আর কি, ওঠ, উৎসবের আয়োজন করা যাক। কি বল?
রাম বসু নীরস ভাবে বলে, কিছু করতে হয় বই কি।
বিস্মিত টমাস বলে, কিছু! এমন উপলক কি আর জুটবে? একে তো প্রথম ধর্মান্তর, তাতে আবার রেশমীর মত সুন্দরী মহিলা। আমি ভেবেছিলাম ঐ ফকিরের মত গোঁয়ার চাষাটাকে দিয়েই বুঝি ধর্মান্তরের অভিযান শুরু হবে। এখন ভাবছি বেটা পালিয়েছে ভালই হয়েছে।
রাম বসু মনে মনে হাসে, হাসবার সঙ্গত কারণও আছে।
ফকিরকে রাম বসুই গোপনে ভাগিয়ে দিয়েছিল, বলেছিল, তুই কেন এখানে মরতে এলি?
ফকির বলেছিল, সাহেব বলেছে খিরিস্তান হলে ভাল খেতে পরতে পারবি।
কিন্তু সে কদিনের জন্যে?
কেন? ব্যাকুলভাবে শুধায় ফকির।
তবে শোন। কঙ্কালীতলার পীঠস্থান মনে আছে?
