.
৩.১৮ রেশমীর ‘হ্যাঁ’
অফিস ছুটি হওয়া মাত্র ছুটতে ছুটতে এল জন, নঈতলাও-এর কাছে গাড়ি থেকে নেমে কোচম্যানকে বলে দিল, তুমি গাড়ি নিয়ে এখন বাড়ি যাও, আমি বেড়িয়ে ফিরব, বলে দিও বিলম্ব হবে।
তার পরে সে দিঘিটার ধারে রেশমীকে খুঁজতে শুরু করল। রেশমী স্পষ্ট লিখেছিল যে পুব-দক্ষিণ কোণে থাকবে। জনের সে কথা মনে ছিল না, সে দিঘিটার তিন দিক খুঁজে তাকে দেখতে না পেয়ে বিস্মিত চিন্তিত হয়ে উঠল, তবে সে কি আসে নি, না কোন দুঃখে দিঘিতেই ডুবে মরল! এই সব কথা ভাবতে ভাবতে যখন পুব-দক্ষিণ দিকে এসে পড়েছে তখন দেখল একটা তেঁতুল গাছের আড়ালে একজন কে যেন বসে আছে। রেশমী, তুমি! বলে সে ছুটে গেল কাছে। রেশমীই বটে।
রেশমী, রেশমী, ডিয়ারি!
কিন্তু রেশমী নড়ল না, সাড়া দিল না, যেমন চুপ করে মুখ গুঁজে বসে ছিল তেমনি বসে রইল।
জন তাকে ধরে তুলতে গেল, রেশমী বাধা দিয়ে সরে গেল।
জন বুঝতে পারে না কি হয়েছে, ভাল করে ঠাহর করে দেখে বিস্ময়ে বলে উঠল–রেশমী, কাঁদছ কেন? এই তো আমি এসেছি, আমার কি কোন অপরাধ হয়েছে?
তবু রেশমী নীরব।
অনেকক্ষণ সাধাসাধির পরে, অনেক কাল্পনিক দোষ স্বীকার করবার পরে রেশমী জনের দিকে মুখ তুলে চাইল, কালো চোখ দুটি আষাঢ়ের নব মেঘভারে ঈষৎ আনত।
কি হয়েছে রেশমী, বল!
এবারে রেশমী কথা বলল, কিন্তু কিছুতেই জনকে কাছে ঘেঁষতে দিল না।
রেশমী, কি দোষ করেছি খুলে বল।
তুমি কি আমাকে অপমান করবার জন্যে তোমার বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলে?
তোমাকে অপমান! আমার বাড়িতে! কি বলছ, আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না! খুলে বল, দয়া করে খুলে বল।
রেশমী তার বিচলিত অবস্থা দেখে বুঝল যে এবারে সে যা বলবে সমস্ত বিশ্বাস করবে জন, বোনের বিরুদ্ধে নালিশ করলেও অগ্রাহ্য করতে পারবে না। তখন দুপুরবেলাকার সমস্ত ঘটনা আনুপূর্বিক বিবৃত করল। রেশমী নিতান্ত বুদ্ধিমতী, তাই তথ্যের এদিক-ওদিক না করে, কেবল সুর ও স্বপ্নের হেরফের করে তথ্যের গুরুত্ব দিল বাড়িয়ে।
সমস্ত শুনে জন বলল, এ সব কিছুই আমার অভিপ্রেত নয়, লিজার অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে।
রেশমী বলল, চমৎকার বিচার। অন্যায় হয়েছে! যাও, এখন লিজাকে ক্ষমা করে বাড়িতে গিয়ে ঢোক, আমার সঙ্গে তোমার সম্বন্ধ এখানেই শেষ।
এ কি কথা রেশমী, তোমাকে ছাড়া আমার জীবন শূন্য।
তোমার জীবন শূন্য হলে আমি কি করব?
তুমি কি করবে? তুমি আমার গৃহিণী হয়ে আমার জীবন পূর্ণ করবে! কি বল রেশমী, হবে তো?
কিন্তু ও গৃহ কি আমার! সেখানে যা অপমান আজ সহ্য করতে হয়েছে!
বিয়ের পরে তোমার অধিকার জন্মাবে ও গৃহে, তখন সাধ্য কি লিজার যে তোমাকে অপমান করে!
কিন্তু লিজা বলেছে কিছুতেই এ বিয়ে সে হতে দেবে না।
তুমি রাজী থাকলে ঠেকাবে কে?
বুদ্ধিমতী রেশমী বুঝে নিয়েছিল যে লিজার চক্রান্তে কলকাতায় দীক্ষা গ্রহণ বাধাপ্রাপ্ত হবে। তাই সে গোড়া থেকে শুরু করল–
আমি যে দীক্ষা গ্রহণ করতে চাই, লিজা তা বিশ্বাস করে না।
সে তো তুমিই ভাল জান।
জানিই তো। তোমাকে অদেয় আমার কিছু নেই। প্রাণ মন জীবন যৌবন মায় পৈতৃক ধর্ম সব তোমার পায়ে সমর্পণ করেছি।
তার ত্যাগস্বীকারে অভিভূত হয়ে জন তাকে কাছে টেনে নেয়। রেশমী বাধা দেয় না, বোঝে এবারে জনকে একটু স্পর্শরসে তাতিয়ে তোলা আবশ্যক।
জন বলে, তোমার ত্যাগের তুলনায় কি দিলাম তোমাকে আমি রেশমী!
তুমি তোমাকে দিলে, তার চেয়ে বেশি কাম্য আমার আর কি থাকতে পারে!
পরস্পরের অভাবিত ত্যাগস্বীকারের আনন্দে দুজনে কিছুক্ষণ অভিভূত হয়ে বসে থাকে, তার পর জন শুরু করে—আমি কালকেই ব্যবস্থা করব যাতে তুমি দীক্ষাগ্রহণ করতে পার।
সে সম্ভব নয় জন।
বিস্মিত জন বলে, কেন সম্ভব নয়?
কলকাতায় দীক্ষা নিতে গেলে বাধা উপস্থিত হবে, লিজা আর-পাঁচজনের সাহায্যে বাধা দেবে নিশ্চয়।
ভুলে যেও না এ কোম্পানির রাজত্ব।
সেইজন্যেই তো ভয়।
কেন?
কেন কি? কোম্পানির বড় সাহেবরা রুখে দাঁড়ালে পাত্রীরা পিছিয়ে যাবে।
বল কি! কিন্তু তারা রুখে দাঁড়াবে কেন?
কিছু মনে কর না জন, লিজাকে তুমি চেন না, তার অসাধ্য কিছু নয়।
না না, রেশমী, লিজার সাধ্য কি এমন করতে পারে!
পারুক না পারুক একটা অপ্রীতিকর ঘটনা তো ঘটবে।
তাহলে কি করবে বল?
চল না আমরা দুজনে কোথাও পালিয়ে যাই, সেখানে গিয়ে আমি দীক্ষা নেব।
লিজার অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণে রেশমী বদ্ধপরিকর; সে স্থির করেছে পৈতৃক ধর্ম পরিত্যাগ করবে, কিন্তু এমনভাবে করবে যাতে লিজাকে অপমানের চুড়ান্ত করতে পারে। সে ভাবে, দেখা যাক লিজার বুদ্ধি বেশি কি আমার বুদ্ধি বেশি!
জনকে নীরব দেখে শুধায়, কি বল?
জন বলে, আমি ভাবছি তেমনি নিরাপদ স্থান কোথায় আছে!
রেশমী মনে মনে স্থির করে রেখেছিল, বলল, কেন, শ্রীরামপুরে পাত্রীরা আছে, সেটা কোম্পানীর রাজত্ব নয়, সেখানে গেলে সমস্ত নির্বিঘ্নে হতে পারবে!
চমৎকার আইডিয়া। সত্যি রেশমী, তোমার কি বুদ্ধি!
তার পরে বলে, কাল সকালেই সেখানে চিঠি লিখে লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি, তার পর পরশু দুজনে রওনা হয়ে যাব। কি বল?
রেশমী বলে, কিন্তু এই দু রাতের মধ্যে তোমার মত বদলে যাবে!
কেন বল তো?
লিজা এসে যেমনি দুটো মিষ্টি কথা বলবে, একটু চোখের জল ফেলবে, অমনি ভাই বলবে, পড়ে মরুক গে রেশমী! সে তো নেটিভ মেয়ে বই নয়। আমি তার চেয়ে ডলি কি পলি মলি কাউকে বিয়ে করব—লিজা, তুমি ব্যবস্থা করে দাও!
