রেশমী চিঠি পড়ে বুঝল যে, একবারে ‘অদ্য যুদ্ধ ত্বয়া ময়া’! সে বুঝল যে, এর মূলে আছে নির্বোধ জনের কোন কাজ বা উক্তি, ভাবল এখন আর ফেরবার উপায় নেই, দেখতেই হবে চরম দাঁড়িটানা পর্যন্ত। চাকরকে বলে দিল যে, মেমসাহেবকে জানিও, আমি দুপুরবেলা নিশ্চয় যাব।
ঘটনাগুলো সব সময়ে সমচালে চললে সংসার হয়তো সুখের হত, কিন্তু জীবনের নাটক এমন জমে উঠত কিনা সন্দেহ। ঘটনাগুলো নিয়মিতভাবে চলতে চলতে হঠাৎ মাঝে মাঝে রত্নাকর দস্যুর মত অতর্কিতে ঘাড়ে এসে পড়ে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়, জীবনের পূর্ব শৃখলা নষ্ট হয়ে যায়, জীবননাটক অপ্রত্যাশিত অঙ্ক পরিবর্তন করে। এখানেও তাই ঘটল। রেশমী, জন ও লিজার জীবন বেশ চলছিল, এবারে এল অঙ্ক পরিবর্তনের পালা।
দুপুরবেলা, জন তখন আপিসে, রেশমী লিজার বাড়িতে এসে পৌঁছবামাত্র অতিবিনয়ের প্রচ্ছন্ন বিদ্রপে লিজা তার অভ্যর্থনা করল; আগেও করেছে, কিন্তু তাতে এমন ঘাতকের খড়ের চিক্কণ ভাস্বরতা ছিল না। রেশমী বুঝল, এই অতিভদ্রতা আসন্ন অভদ্রতার ভূমিকা ছাড়া আর কিছু নয়। সে প্রস্তুত হয়েই এসেছিল, এখন মনটাকে ঠেলা দিয়ে জাগিয়ে আরও সচেতন করে নিল।
লিজা বিনা ভূমিকায় বলল, এস রেশমী বিবি, বাড়িঘর সব বুঝে নাও, কেমন দেখছ সব?
বুঝেও না বোঝবার ভান করে রেশমী বলল, তোমার কর্তৃত্বে কি কিছু খারাপ থাকতে পারে, সব চমৎকার!
আর আমার কর্তৃত্বের কথা কেন তুলছ? এখন তো সব তোমার।
রেশমী সরাসরি উত্তর না দিয়ে হাসল।
রেশমীর প্রশান্ত অটলতায় লিজা হাড়ে হাড়ে চটে গেল। সে ভেবেছিল রেশমী রাগ করবে, রাগ করলে তার কাজ সহজ হত, ক্ষুরধার ব্যঙ্গ প্রয়োগের পথ অনায়াস। হয়ে আসত। সে ভাবল, কি মুশকিল, এ যে রাগে না। কিন্তু তাই বলে তো চুপ করে থাকা চলে না। তখন প্রকাও একটা ঝড়ের মত সে ভেঙে পড়ল রেশমীর ঘাড়ে।
লিজা শুধাল, তা শুভ বিবাহটা হচ্ছে কবে? রেশমী বুঝল, সর্বনাশ! জন এই কাণ্ডটি ঘটিয়েছে। নির্বোধ। ভাবল, বোকা সেজে শুনে নিই কতদূর কি গড়িয়েছে।
মুখে কিছু প্রকাশ না করে বলল, বিবাহ! কার সঙ্গে?
আহা, কচি খুকিটি আর কি, কিছুই জানে না! জনের সঙ্গে! নির্বোধ জনের সঙ্গে।
রেশমী বুঝল, ‘সংস্কার অন্তরায়’-এর কি ভাষ্য জন করেছে। সে বলল, জন নির্বোধ হতে পারে, আশা করি মিথ্যাবাদী নয়, তার মুখেই সব শুনতে পাবে।
কেন, তোমার হিন্দু-মুখে বাধছে বুঝি বিধর্মীকে বিয়ে করবার সংবাদটা?
হিন্দু-মুখ আর খ্রীষ্টান-মুখের প্রভেদ আমার কাছে নেই মিস স্মিথ।
ওঃ, দুই মুখ বুঝি এক হয়েছে! কতবার?
মৃদু হেসে রেশমী বলল, অনেকবার।
আর কতদূর গড়িয়েছে, শুনতে পাই কি?
অনেকদূর। বিশদ বিবরণ মিঃ স্মিথের কাছে শুনে নিও।
তাই বুঝি গড়াতে গড়াতে এখন বিয়ে পর্যন্ত এসে পৌঁছবার উপক্রম… শয়তানী!
এই জন্যেই কি দুপুরবেলা ডেকে পাঠিয়েছিলে মিস স্মিথ?
না, শুধু এইজন্যে নয়, আরও কিছু আছে। জান, লাট সাহেবকে বলে এ বিয়ে বন্ধ করে দিতে পারি?
রেশমী শান্তভাবে বলল, যতদূর জানি তেমন কোন আইন নেই কোম্পানির।
ওঃ, আইনও জানা আছে দেখছি! তবে নিশ্চয়ই জান যে হিন্দুর সঙ্গে খ্রীষ্টানের বিবাহ চলে না।
কিন্তু এও জানি যে হিন্দুর খ্ৰীষ্টান হতে বাধা নেই।
সত্যকার বিস্ময়ে লিজা বলল, তুমি খ্রীষ্টধর্ম গ্রহণ করবে?
খ্রীষ্টানের ঘর করতে চলেছি, খ্রীষ্টান না হলে চলবে কেন?
লিজা বলল, শুনেছি তোমরা হিন্দুরা সব করতে, পার কিন্তু ধর্মত্যাগ করতে পার না!
কিন্তু যা শোন নি তা শুনে রাখ, হিন্দু নারী পতির জন্য সবরকম ত্যাগ স্বীকার করতে পারে।
লিজা বলল, দিতে পারবে তার জন্যে তোমার পৈতৃক ধর্ম জলাঞ্জলি?
ভালবাসার পাত্রকে অদেয় কিছুই নেই। সংসারে এমন কিছু থাকতেই পারে না। যা ভালবাসার পাত্রের জন্যে অত্যাজ্য!
ধর্মও?
ধর্ম, ইহকাল, পরকাল, জীবন, যৌবন–সমস্ত।
লিজা বুঝল, এ মেয়ে অসাধারণ; আরও বুঝল, এ পর্যন্ত জয় হল রেশমীর। তাতেই তার রাগ গেল বেড়ে। এতক্ষণ ভদ্রতার সীমার মধ্যেই কলহ চলছিল, এবারে বুঝি সে সীমা লঘিত হল।
কি দিয়ে নির্বোধ জনকে ভোলালে শুনতে পাই কি?
নিশ্চয়ই। রূপ দিয়ে মিস স্মিথ, রূপ দিয়ে—সগর্বে বলল রেশমী।
এতখানি স্পষ্টবাদিতা আশা করে নি লিজা।
লিজাকে নীরব দেখে রেশমী বলল, আর তাতে দোষটাই বা কি মিস স্মিথ? সব নারীই পুরুষকে ভোলাতে চায়, কেউ রূপ দিয়ে, কেউ ধনমান বংশমর্যাদা দিয়ে, আর কেউ বা শুধু বন্ধুত্ব আলাপ-আপ্যায়ন দিয়ে। কেউ পারে, কেউ পারে না।
এই বলে কটাক্ষ নিক্ষেপ করল লিজার দিকে। মেরিডিথ ও রিংলারের সঙ্গে লিজার ব্যর্থ প্রণয়ের ইতিহাস সে শুনেছিল জনের কাছে।
রেশমীর ইঙ্গিতে জ্বলে উঠে লিজা বলল, তুমি কি বাড়ি বয়ে আমাকে অপমান করতে এসেছ?
তুমি ভুল করছ মিস স্মিথ, আমি স্বেচ্ছায় আসি নি, তুমি আমাকে আমন্ত্রণ করে এনেছ, আর এখন বুঝতে পারছি অপমান করবার জন্যেই এনেছ। এবারে আমি চললাম–
বলে সে প্রস্থানের জন্য উদ্যত হল। লিজা বলল, এক মিনিট দাঁড়াও।
তার পরে বলল, শোন রেশমী বিবি, আমার প্রাণ থাকতে এ বিবাহ আমি হতে দেব না।
রেশমী ফিরে দাঁড়িয়ে উত্তর দিল, বেশ তো, চেষ্টা করে দেখ। কিন্তু মনে রেখো, নির্বোধকে নিবৃত্ত করা অত সহজ নয়–
এই বলে ব্যঙ্গে, গর্বে, স্পর্ধায় পূর্ণ একটি কটাক্ষ নিক্ষেপ করে বেরিয়ে চলে গেল রেশমী।
