জন বলল, আনন্দের কারণ থাক আর নাই থাক, আমি মনঃস্থির করে ফেলেছি।
লিজা হেসে বলল, জন, শুধু সঙ্কল্পে তো বিয়ে হয় না, একটা পাত্রীও প্রয়োজন হয় বলে জানি।
অবশ্যই একজন পাত্রী আছে।
এবার কে সেই সৌভাগ্যবতী জানতে পারি কি?
‘এবার’ শব্দটার খোঁচা বিঁধল গিয়ে জনের মর্মে, সে নিতান্ত বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, এবারে ছাড়া আর কোনবার বিয়ের প্রস্তাব করেছি শুনতে পাই কি?
লিজা অবশ্য ইচ্ছা করলে কেটি ও রোজ এলমারের নাম করতে পারত, কিন্তু সেদিক দিয়ে গেল না, বলল, কিছু মনে কর না জন, মনটা ভাল নয়, তাই হয়তো কি বলতে কি বলে ফেলেছি।
জন বলল, আশা করি মন খারাপের কারণ আমার প্রস্তাবটা নয়?
নিশ্চয়ই নয়। তার পরে বলল, কথা কাটাকাটি থাক, এবারে মেয়েটির নাম বল।
লিজা ঘুণাক্ষরেও টের পায় নি জন ও রেশমীর ঘনিষ্ঠতা।
এবারে জনের উত্তর দেওয়ার পালা। বিয়ের প্রস্তাবটা সে ঝোঁকের মাথায় বলে ফেলেছিল বটে, কিন্তু অত সহজে মেয়ের নামটা মুখে এল না তার। গতকাল সন্ধ্যাতেও রেশমীকে বিয়ে করবার ইচ্ছা তার মনে ছিল না, কিন্তু রেশমীর পলায়ন ও তার চিঠি প্রচণ্ড একটা রোখ জাগিয়ে দিয়েছিল তার মনে। বিশেষ রেশমী যে লিখেছিল ‘সংস্কার অন্তরায়’, তার স্বকৃত ভাষ্য করে নিয়েছিল জন; সে ধরে নিয়েছিল যে, কোন সৎঘরের মেয়ে বিয়ের আগে আত্মসমর্পণ করে না। রেশমীর চিঠিখানা পড়ে অনেকক্ষণ সে মাথায় হাত দিয়ে বসে ভেবেছিল, তার পরে মনে হয়েছিল, ভাল, রেশমী যদি তা-ই চায় তবে বিয়েই করব। জনের মত ভাবালু লোক নীতি বা সঙ্কল্পের দ্বারা চালিত হয় না, চলে ঝোকের মাথায়। সেই ঝোঁকটা থাকতে থাকতে তারা অসাধ্যসাধন করতে পারে, ঝোক চলে গেলেই তারা চরম অসহায়।
জনকে নীরব দেখে লিজা হেসে বলল, কি জন, আগে বিয়ের সঙ্কল্প স্থির করে এখন বুঝি মেয়ের নাম ভাবতে বসলে? না জন, এমন ছেলেমানুষি ভাল নয়।
ছেলেমানুষি দেখলে কোথায়? মেয়ে তো স্থির আছে।
তবে নামটা বলে ফেল।
কিন্তু নামটা এত সহজে আসতে চায় না জনের মুখে, তার মনে পড়ল রেশমীর চিঠি—’সংস্কার অন্তরায়।‘
লিজা বলল, এস আমরা ভাগাভাগি করে নিই, তুমি সঙ্কল্প স্থির করেছ, আমি এখন মেয়ে স্থির করি।
ধন্যবাদ লিজা, তোমাকে কষ্ট করতে হবে না, মেয়েটির নাম রেশমী।
বজ্ৰচালিত হয়ে লিজা বলে উঠল, রেশমী! আর কোন কথা বের হল না তার মুখে।
কি, চুপ করে রইলে যে?
এ যদি পরিহাস না হয় তবে নিতান্ত মূঢ়তা!
কেন, শুনতে পাই কি?
সে যে নেটিভ।
কেন, নেটিভ কি মানুষ নয়?
ওসব তর্কের মধ্যে যেতে চাই নে জন, আমি বলছি এ অসম্ভব।
কেন অসম্ভব? এই কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা জব চার্নকের কি নেটিভ পত্নী ছিল না?
সে একশ বছর আগেকার কথা ছেড়ে দাও, তখন কজন শ্বেতাঙ্গ ছিল এ শহরে?
তাই বলে বিয়েটা কি বিয়ে হয় নি?
লিজা বলল, সেদিন কলকাতায় শ্বেতাঙ্গ সমাজ বলে কিছু ছিল না, সব কিছু চলত। আজকে তুমি নেটিভ বিয়ে করলে আমরা একঘরে হব।
বিয়ের পরে আমার ঘরে কেউ না এলে আমি দুঃখিত হব না।
কিন্তু আমাকেও যে ছাড়তে হবে এ ঘর।
তোমাকে তো একদিন ছাড়তেই হবে, তুমি কি বিয়ে করবে না?
লিজা বলল, ইচ্ছে ছিল করব, কিন্তু তোমাদের পুরুষদের ব্যবহার দেখে সে ইচ্ছা আর বড় নেই।
আমার ব্যবহারে কি দোষ দেখলে শুনি?
লিজা ইচ্ছে করলে রোজ এলামারের প্রসঙ্গ তুলতে পারত, কিন্তু আর আঘাত দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না জনকে। তাই প্রসঙ্গ পাল্টে বলল, জন, সব কথা ভেবে দেখ নি, ও যে বিধর্মী।
কথাটা সত্যই ভেবে দেখে নি জন। কিন্তু হটবে কেন, বলল, ধর্মান্তর গ্রহণ করবে।
কণ্ঠস্বর কোমল করে লিজা বলল, না না জন, এসব ছেলেমানুষি ছাড়।
লিজার কণ্ঠে স্নেহের স্পর্শ পেয়ে জনও নরম হল, শুধাল, তবে কি করতে বল?
আমি বলি রেশমীর প্রসঙ্গটাই ভুলে যাও, আর যদি নিতান্তই ভুলতে না চাও, তবে অনেক শ্বেতাঙ্গ যেমন নেটিভ মেয়ে রাখে, তেমনিভাবে ওকে রাখ না কেন!
মুহূর্তে অগ্নিদীপ্তবৎ জ্বলে উঠে জন বলল, মুখ সামলে কথা বল লিজা, অপমান কর না আমাকে।
এই বলে সে বেরিয়ে যেতে উদ্যত হল। লিজারও প্রচণ্ড রাগ হল, বলল, কি, চললে কোথায়? আশা করি তোমার রেশমীকে নিয়ে একবারে গির্জায় চললে না?
উত্তর না দিয়ে জন হন হন করে বেরিয়ে চলে গেল।
লিজা ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। কিন্তু শান্তি কোথায়, স্বস্তি কোথায়? ভূমিকম্প অন্তে গৃহস্থ সযত্নসজ্জিত গৃহে প্রবেশ করে যেমন চমকে ওঠে, দুদণ্ড আগের চিরপরিচিত গৃহে যেমন নিজেকে অপরিচিত বোধ করে, আপন গৃহকুটিরে যেমন পা ফেলতে ভয় পায়, তেমনি অবস্থা হল লিজার। তার চোখের সামনে দেওয়ালগুলোয় দুঃস্বপ্নের পাণ্ডুরতা, ছাদের কড়িকাঠগুলো অদৃষ্টের শাসনদণ্ডের মত উদ্যত, প্রকাণ্ড আয়নাখানায় নিষ্ঠুর পরিহাসের দীপ্তি, আসবাবপত্রের অতি মসৃণ কোমলতা জল্লাদের অতি-বিনয়ের মত মর্মান্তিক, এক মুহূর্ত আগের সুখবাস পরমুহূর্তে আশার সমাধিতে পরিণত। হঠাৎ চোখ। পড়ল দুখানা তৈলচিত্রের উপরে, তার পিতামাতার ছবি, অমনি বান ডাকল চোখে, সে বানের অন্ত নেই, স্মৃতির চির-নীহারপ দিচ্ছে অফুরান যোগান। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
কিন্তু কেঁদে কর্তব্য সমাপ্ত করবার মেয়ে লিজা নয়। মাতার মৃত্যুর পরে সংসারের দায়িত্ব বহন করতে গিয়ে তৈরি হয়ে উঠেছে তার চরিত্র, তাতে থেকে সোনায় লোহায় সম ভাগে মিশে তাকে করে তুলেছে যেমন সুন্দর তেমনি সুদৃঢ়। চোখের জলের প্রথম বন্যা চলে গেলে সে উঠে বসে কর্তব্য স্থির করে ফেলল, মনে মনে বলল, এ ঘরে প্রবেশ করতে দেব না ঐ নেটিভ মেয়েটাকে! তখনই সে দুপুরবেলা একবার দেখা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে রেশমীর নামে একখানা চিঠি লিখে পাঠিয়ে দিলে চাকর দিয়ে। তার পর সে আবার প্রফুল্লমনে কাজে লেগে গেল।
