হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে রেশমী বলল, জন, আর ঠায় বসে থাকতে পারছি না, আমি কাপড় বদলাতে চাই, শোবার ঘর কোথায় দেখিয়ে দাও।
জনের মত নির্বোধ লোকেও কথাটার ইঙ্গিত বুঝল, কৃতজ্ঞতায় আনন্দে তার দুই চোখ চকচক করে উঠল, বলল, এটা তোমার শোবার ঘর রেশমী, পাশেই স্নানের ঘর, সেখানে ব্যবস্থা আছে। যাও ভিতরে যাও, আমি ‘নক’ করলে তুমি আসতে বল।
কোন উত্তর না দিয়ে রেশমী শয়নগৃহে প্রবেশ করল।
রেশমী ক্লান্ত হয়েছিল, ভাবল স্নান করে নিই, তাহলে আরাম পাওয়া যাবে। স্নানের ঘরে ঢুকে শাড়ি শেমিজ খুলে ফেলে শীতলজলে খুব আরাম করে সে স্নান করে নিল, তার পরে মাথাটা মুছে শোবার ঘরের প্রকাণ্ড আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াবার জন্যে চিরুনি হাতে নিয়ে প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে একবারে মুগ্ধ হয়ে গেল। বিধাতাপুরুষ সদ্যসৃষ্টি বিষদৃশ্যের দিকে তাকিয়ে খুব সম্ভব এমনি বিস্ময় বোধ করেছিল; আদিম নারী ইভ পলে প্রথমবার নিজেকে প্রতিবিম্বিত দেখে নিশ্চয় এমনি মোহ বোধ করেছিল; সমুদ্রোথিত উর্বশী পুরুষের আঁখিতারায় নিজেকে প্রতিবিম্বিত দেখে নিশ্চয় এমনি তন্ময়তা বোধ করেছিল। কেশবিন্যাস, বেশবিন্যাস ভুলে গিয়ে রেশমী অপলক তাকিয়ে রইল নিজের জীবন্ত ছায়ার দিকে। স্ফুটনোম্মুখ সূচ্যগ্র ম্যাগনোলিয়ার কুঁডির মত চিবুক থেকে একটির পর একটি জলবিন্দু ঝরে বুকের দুর্গম গিরিসঙ্কটে অবিরত ধারার সৃষ্টি করেছে; মসৃণ তপ্ত উজ্জ্বল ত্বকের স্পর্শে জলবিন্দু মুস্তাবিন্দুর চেয়ে রমণীয় হয়ে উঠেছে; আর স্নানের আয়েসে মৃদু স্পন্দিত বক্ষের আন্দোলনে তালে তালে কাঁপছে সেই মুহার। রেখামনোরম কণ্ঠ, জলে সিক্ত আঁখিপশ্ন; ভেজা অলকাগুলো বিচিত্র রেখায় ললাটপ্রান্তে লিপ্ত; চোখের দৃষ্টি স্বভারাতুর মধুকরী তরীর মত নিরুদ্দেশের দিকে উধাও, আর চুম্বনের কুঁড়িভরা অধরাষ্ঠের দুই কোণে বিস্মিত পুলকের আভাস। রেশমীর আর পলক পড়ে না; তৃপ্তি হয় না তার মনে হল, সে যেন আর কাউকে দেখছে। রূপ দেহলগ্ন, সৌন্দর্য দেহবিবিক্ত; নিতান্ত সৌন্দর্যচেতন নারীর কাছেও আপন সৌন্দর্য সম্পূর্ণ আয়ত্ত নয়; রূপসী স্বাধীন, সৌন্দর্যময়ী আপন সৌন্দর্যের অধীন; সে নিতান্ত অসহায়। দেব-সমাজে যার অসীম প্রতাপ সেই উর্বশীর মত অসহায়, দুর্বল, পরাধীন আর কে।
আয়নার কাছে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রহস্যময়ী হায়ার দিকে রেশমী; সে ভুলে গেল জনের কথা, ভুলে গেল বেশবিন্যাসের কথা, ভুলে গেল বাহ্যজ্ঞান। তার মনে পড়ে গেল মদনাবাটির পন্বলে ছায়া-দর্শনের স্মৃতি; তার মনে হল, সেদিন সৌন্দর্য ছিল পাতার আড়ালের কুঁড়ি, আর আজকের সৌন্দর্য পত্রাবরণ মুক্ত, নিরাবরণ, নিরাভরণ, আবৃন্তপ্রস্ফুট পুষ্প।
হঠাৎ দরজায় ঠক ঠক আওয়াজে তার আচ্ছন্ন ভাব কেটে গেল, মনে পড়ল, বাইরে অপেক্ষমাণ জনের কথা। কেমন একটা বিস্বাদে বিতৃষ্ণায় তার মন ভরে গেল; কেবলই মনে হতে লাগল, এ অন্যায়, এ অন্যায়, জনের এ অন্যায় দাবি। তার মনে হল, জন সৌন্দর্যের দস্যু, তার দেহ মন্থন করে হরণ করে নিতে চায় সৌন্দর্যটুকু। এ অন্যায় দাবি জন, এ অন্যায় দাবি!
আবার দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ। রেশমী কাপড় পরে নিল, আর টেবিলের উপর থেকে কলম তুলে নিয়ে এক টুকরো কাগজে কি যেন লিখল, তার পরে উকষ্ঠ ব্যাকুল ঠক ঠক আওয়াজ উপেক্ষা করে স্নানের ঘরসংলগ্ন ঘোরানো লোহার সিঁড়ি দিয়ে সোজা নেমে গিয়ে বেরিয়াল গ্রাউন্ড রোডের বাড়ির দিকে দ্রুত চলতে শুরু করে দিল।
আরও কিছুক্ষণ পরে, বিলম্বশঙ্কিত জন ‘ভিতরে আসছি রেশমী’ বলে ঘরে ঢুকে পড়ে দেখল ঘর শূন্য, কেউ কোথাও নেই। ভয়ে আশাভঙ্গে যখন সে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে, চোখে পড়ল কাগজের টুকরো-খপ করে তুলে নিয়ে পড়ে ফেলল এক নজরে। তার মনে হল সে বুঝি ভাষা ভুলে গিয়েছে; বারংবার পড়ে, মনে মনে পড়ে, অবশেষে নিজেকে শোনাবার উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে পাঠ করল-”জন, পারলাম না। ক্ষমা কর। সংস্কার অন্তরায়। আমার মন তুমি জান, ঠিক বুঝে নিতে পারবে আমার কথার অর্থ। রেশমী।”
ভন্ন মহীরুহের মত একেবারে ভেঙে গিয়ে বসে পড়ল জন, চিন্তা করবার শক্তি তার লোপ পেল। রেশমীর মনের কথা জন ঠিক বুঝতে পারল কিনা জানি নে। কিন্তু কি তার যথার্থ অন্তরায়? সংস্কার না সৌন্দর্য? সে ভাবল সৌন্দর্য, লিখল সংস্কার, তার কলম আর মন চলল ভিন্ন পথে। অথবা সৌন্দর্যই প্রবল করে তুলল তার সংস্কারকে। অথবা সুন্দরী নারীর মনের কথা স্পষ্ট বোধগম্য হলে মানুষ শিল্পসৃষ্টি করবার অসাধ্য সাধনে আত্মনিয়োগ করত না কখনও।
৩.১৬-২০ ননদ-কাঁটা
পরদিন জন বিনা ভূমিকায় লিজাকে বলল, লিজা, আমি স্থির করেছি বিয়ে করব।
লিজা এমন প্রস্তাবের জন্যে প্রস্তুত ছিল না, তাই হঠাৎ উত্তর দিতে পারল না। তার নীরবতা খুঁচিয়ে উত্তর আদায় করবার আশায় আবার জন বলল, কি, উত্তর দিলে না যে? এবারে লিজাকে কথা বলতে হল, বলল, এর চেয়ে আনন্দের আর কি হতে পারে।
জন বলল, মুখে যাই বল না কেন, তোমার আনন্দ যে হয় নি তা মুখ দেখেই বুঝতে পারছি।
লিজা বলল, আনন্দ না হওয়ার কারণ তো দেখছি না।
সত্য বলতে কি, জনের প্রস্তাবে লিজা হকচকিয়ে গিয়েছিল। রোজ এলমারের সমাধিতে ঘাস গজাবার আগেই এমন প্রস্তাবের প্রত্যাশা করে নি সে জনের কাছে। সে মনে মনে ভাবলধন্যি এই পুরুষ জাতটা!
