রেশমী বলল, যাব।
তার পর বলল, অত রাতে ফেরা সুবিধা হবে না, ধর রাতটা যদি ওখানেই থাকি?
খুব ভাল হবে, আমিও থাকব। বলে টেনে নেয় আর একটু কাছে, কিন্তু কি বলবে লেডি রাসেলকে?
সে কি আমার মত তুচ্ছ লোকের সন্ধান রাখে? যারা রাখে তাদের বলব, আজকের রাতটা কাটাব কায়েৎ দার বাড়িতে।
তুমি লক্ষ্মী মেয়ে রেশমী। তাহলে কথা ঠিক?
নিশ্চয়।
চল তোমাকে বাড়ির কাছ পর্যন্ত এগিয়ে দিই—একাকী ছেড়ে দেওয়া কিছু নয়।
এই বলে রেশমীকে বাহুসংবদ্ধ করে নিয়ে অগ্রসর হয় জন। কর্তব্যপরায়ণ জন।
.
৩.১৫ রেশমীর ‘না’
পরদিন অপরাহ্নে জন রেশমীকে গাড়িতে তুলে নিল, পূর্বনির্দেশমত বেরিয়াল গ্রাউন্ড রোড ও চৌরঙ্গীর মোড়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল সে। সেকালে অনেক শেতাঙ্গ দেশীয় রমণীদের নিয়ে প্রকাশ্যে যাতায়াত করত, ঘর করত, কাজেই কেউ বিশেষভাবে লক্ষ্য করল না রেশমীকে। গাড়ি সোজা উত্তর দিকে চলে কসাইটোলার মোড়ে এসে পৌঁছল, মোড়ের কাছেই জনের অফিস। তখন সন্ধ্যাবেলা অফিস খালি, দু-চারজন আরদালি দারোয়ান মাত্র ছিল। জন রেশমীকে নিয়ে সোজা তেতলায় গেল, তেতলায় তার খাস কামরা।
ড্রয়িংরুমে ঢুকে জন রেশমীকে বলল, বস। রেশমী বসলে জন বলল, রেশমী, তুমি আসবে ভাবিনি।
কি আশ্চর্য, না আসব কেন, কাল তো কথা ঠিক হয়ে গেল!
ইউ আর সাচ এ গুড গার্ল!
আম আই? আর ইউ শিওর?
দুজনে হো হো করে হেসে ওঠে।
আচ্ছা রেশমী, কি বলে বের হলে বাড়ি থেকে?
সে কথা কালকে তো বলেছি।
আমার কি ছাই কালকের সব কথা মনে আছে?
কেবল আমাকে তুলে নেবার কথাটা ভুলতে পার নি!
তাহলে তো নিজেকেই ভুলে যেতে হয়।
কিন্তু আমার ভয় হয়েছিল যে, তুমি ভুলে যাবে।
দেখলে তো যে ভূলি নি।
বাস্তবিক, আশ্চর্য তোমার স্মরণশক্তি।
আবার দুজনে হো হো করে হেসে ওঠে।
প্রাণপ্রাচুর্যের উচছুসিত ফেনা ঐ হাসি, যৌবনে তা সুলভ। বার্ধক্যে প্রাণপ্রবাহ নিস্তেজ, হাসি স্তিমিত। যুবক অকারণে হাসে, কারণ উপস্থিত হলেও বৃদ্ধের মুখে হাসি যোগায় না।
জন শুধাল, আচ্ছা রেশমী, আমার আরদালি যদি খাদ্য এনে দেয় তবে খাবে?
কেন খাব না?
আমার ধারণা ছিল তোমাদের সমাজের সংস্কার অন্তরায়।
আমি আজ কতদিন সমাজছাড়া, দীর্ঘকাল কাটল খ্রীষ্টানদের সঙ্গে, খাওয়া-ছোঁওয়া সম্বন্ধে বাছবিচার ছেড়ে দিয়েছি।
ভালই করেছ।
না করে উপায় ছিল না, রাতদিন একসঙ্গে থাকলে ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলা খুব শক্ত। তাছাড়া ডাঃ কেরীর মত লোকের, মিস এলমারের মত লোকের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলতেই বা যাব কেন?
আর আমার মত লোকের ছোঁয়াচ?
তুমি আর সে বিষয়ে চিন্তা করবার সময় দিলে কই?
রেশমী, আমার মনের কথা যদি জানতে–
তার চেয়ে তোমার আরদালিকে ডাক, খুব খিদে পেয়েছে। মনের কথা না হয়। পেটের খিদে মিটিয়ে নিয়ে ধীরেসুস্থে শুনব।
জনের ইঙ্গিতে আরদালি দুজনের মত খাদ্য নিয়ে এল। জন যতদূর সম্ভব দেশীয় খানার ব্যবস্থা করেছিল, রেশমীর কোন রকম অসুবিধা হল না। উচ্ছিষ্ট পাত্র সরিয়ে নিয়ে গেলে একটি সিগারেট ধরিয়ে জন ও রেশমী আবার মুখখামুখি বসল।
হেমন্তের তৃণবনে একটি হাওয়া লাগবামাত্র যেমন অজস্র পতঙ্গ চঞ্চল হয়ে ওঠে, তেমনি অজস্র তুচ্ছ কথা রঙীন পাখার চপল ভঙ্গীতে চঞ্চল হয়ে উঠল ওদের মুখে। মাঝে মাঝে একটা করে হাসির দমকা হাওয়া লাগে, ততই আরও বেশি চঞ্চলতা প্রকাশ করে তাদের পাখা। অবশেষে এক সময়ে কথার ভাগ কমে নীরবতার ভাগ বাড়ল এবং ক্রমে সব কথা আত্মবিসর্জন করল অখণ্ড নীরবতায়। তখন দুজনে মুখোমুখি নীরবে বসে রইল। দুজন লোক নীরব বসে রইলে বুঝতে হবে যে, হয় তাদের সব কথা বলা হয়ে গিয়েছে, নতুবা এমন কিছু কথা আছে যা অনির্বচনীয়। যুবক-যুবতীর নিছক সান্নিধ্য একরকম জৈব বিদ্যুৎ সৃষ্টি করে—মুখের শব্দের চেয়েও যা গভীরতর অর্থে পরিপূর্ণ। সেই বিদ্যুৎত্ময় নীরবতা দুজনের মধ্যে তখন কথা চলাচল শুরু করে। কথা কুলুপ, নীরবতা কক্ষ।
রেশমীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে জন ভাবছিল, যার নয়নে অধরে, কপোল গ্রীবায়, সন্ধিতে কুন্তলে, বসনে ভূষণে সর্বাঙ্গে এমন অজস্র অমৃতের সঞ্চয় তার কেন এত কৃপণতা; একজন দারুণ পিপাসায় সামনেই পুড়ে মরছে, আর একজন শীতল বারিধি নিয়ে নির্বিকার বসে আছে! জন ভাবছিল, কেন এমন সৌন্দর্য, এমন নিষ্ঠুরতা, এমন তৃষ্ণা, এমন পানীয় পাশাপাশি!
রেশমী জনের মনের কথা বুঝেছিল, ভারি একটা বেদনা বোধ করছিল মনে মনে, তবু শেষ সঙ্কোচটুকু কিছুতে যেতে চায় না। জন কেন একটুখানি জোর করে না! রেশমী যুদ্ধপ্রত্যাশী নয়, তবু একবার যুদ্ধের ভাণ না করে আত্মসমর্পণ করে কিভাবে সে? পরাজয় অবশ্যম্ভাবী তবে আত্মসম্মান রক্ষার পক্ষে অপরিহার্য ঐ যুদ্ধের অভিনয়টুকু। রেশমী ভাবছিল, জন বোধকরি মনে করছে যে এখনও স্তম্ভমূল দৃঢ়। নির্বোধ! এখন একটিমাত্র মৃদু ধাক্কার প্রয়োজন, সেটুকুও কি দিতে রাজী নয় জন? মনে একটুখানি রাগের মতও হল। কিন্তু তখনই দৃষ্টি পড়ল জনের আর্ত অসহায় তৃষিত চোখের দিকে। সে আর স্থির থাকতে পারল না, তার সঙ্কল্প বিচলিত হল। সে মনে মনে বলল, জন, তোমাকে কেবল আত্মসমর্পণ করলাম না, আত্মসম্মান রক্ষার যে সান্ত্বনাটুকু নারীরা হাতে রেখে দেয় সেটুকু অবধি তোমাকে দিলাম। তুমি বড় অসহায় বলেই তোমার দাবি বড় প্রচণ্ড।
