মনের সঙ্গে এইরকম অবিশ্রাম ঝগড়া করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল রেশমী, ভাবল, একবার দেখেই আসি না, ব্যাপার কি! তাছাড়া, গুলবদনীর প্রতিও তো একটা কর্তব্য আছে। কিন্তু সমাধিস্থল শূন্য দেখে মনটা কেমন দমে গেল, নিজের নৈরাশ্যকে অস্বীকার করবার উদ্দেশ্যে বারংবার মনকে বোঝাতে লাগল, আহা, কড়া কথা বলবার সুযোগ হল না। সমাধিস্থলে গিয়ে বসে পড়ল বিষণ্ণ মনে।
কিছুক্ষণ পরে পত্রমর্মরে সচকিত হলে পিছন ফিরে রেশমী দেখল, পাশেই জন কতকগুলো সাদা করবী ফুল হাতে দণ্ডায়মান। জনকে প্রত্যাশা করে নি সে, কাজেই বিস্মিত হল। জনও কম বিস্মিত হয় নি রেশমীকে দেখে। সেও আগে দেখতে পায় নি রেমশীকে, একটা গাছের আড়াল পড়েছিল, অপ্রস্তুত হয়ে সে তাড়াতাড়ি ফেলে দিল হাতের ফুলগুলো।
রেশমী বলে উঠল, ফুল ফেলে দিলে কেন?
জন বলল, রেশমী, তুমি তো সাদা ফুল পছন্দ কর না!
কিন্তু সাদা ফুল যে পছন্দ করে তার জন্যেই তো এনেছিলে?
কে বলল, তোমার জন্যে আনছিলাম।
আমাকে তো প্রত্যাশা কর নি এখানে।
নিশ্চয় করেছি, বলে জন। বলে, প্রেমিকের প্রত্যাশা কি কখনও যায়!
রেশমী জনের কথা বিশ্বাস না করলেও তার অপ্রস্তুত ভাব দর্শনে খুশি হল। চাঁদ কি খুশি হয় না সমুদ্রের উদ্বেল ভাব দর্শনে?
জন শুধাল, তুমি এতদিন এখানে আস নি কেন রেশমী?
কেমন করে জানলে যে আসি নি?
আমি যে এসে এসে হতাশ হয়ে ফিরে গিয়েছি।
হতাশ হলে কেন? সমাধি তো ছুটে পালায় নি!
সম্পূর্ণ অসহায়ভাবে জন বলে ফেললে, তুমি জান রেশমী, আমি এখানে কেন। আসি?
নিতান্ত নিরীহের মত রেশমী বলল, কেমন করে জানব?
অধীর আবেগে জন বলে উঠল, জান না? নিশ্চয় জান।
কি জানি?
আমি তোমাকে ভালবাসি, কায়মনোবাক্যে ভালবাসি, তোমাকে ছাড়া আর কাউকে ভালবাসি নে।
জনের উক্তির পক্ষে অন্য কোন প্রমাণের প্রয়োজন ছিল না, তার কণ্ঠস্বরই যথেষ্ট প্রমাণ।
বলা বাহুল্য, রেশমী মনে মনে খুশি হল—এহেন কণ্ঠস্বরে এহেন উক্তিতে কোন্ নারী না খুশি হয়!
কিন্তু এ কথার কি উত্তর দেবে রেশমী? যেখানে কথাটা অবিশ্বাস্য বা অগ্রাহ্য সেখানে উত্তর যেগায়, অন্যত্র মৌনই যে শ্রেষ্ঠ উত্তর। কিন্তু গোলমাল বাধায় এই মৌন ভাবে, মৌন সম্মতির লক্ষণ হতে পারে আবার অসম্মতির লক্ষণ হতেও বাধা নেই।
রেশমীর নীরবতায় শঙ্কিত জন তার পাশে বসে পড়ে রেশমীর হাত দুটি হাতের মধ্যে টেনে নিল, রেশমী ছাড়িয়ে নিল না হাত। এতেই রেশমীর মনোভাব বোঝা উচিত ছিল জনের, কিন্তু কিছু বুঝতে না পেরে উদ্বিগ্নভাবে তাকিয়ে রইল রেশমীর মুখের দিকে।
এসব ক্ষেত্রে পুরুষ নির্বোধ। মেয়েরা অনেক অনায়াসে পুরুষের মনের ভাব বুঝতে পারে। বুদ্ধিজীবী পুরুষ প্রমাণ চায়, সংস্কারজীবী নারী অনুমান করে নেয়।
হঠাৎ লাফিয়ে উঠে জন বলল, দাঁড়াও, তোমার জন্যে লাল ফুল নিয়ে আসি, বনের মধ্যে দেখেছি একটা পলাশ গাছ!
এই বলে সে বনের ঘনায়মান অন্ধকারের মধ্যে ছুটে চলে গেল। বনের মধ্যে সন্ধ্যাবেলায় বিপদ হতে পারে জেনেও বাধা দিল না রেশমী। দ্রৌপদীও তো বাধা দেয় নি পাণ্ডবদের নীলপদ্যের সন্ধানে যেতে।
রেশমী সুখস্বপ্নগ্রস্তের ন্যায় বসে রইল, কিছু চিন্তা করবার মত মনের অবস্থা তার ছিল না, জনের স্পর্শে তখন তার দেহের উপশিরা উচ্চ নিখাদে আহত বীণাযন্ত্রের মত রী রী করছিল। কখন যে ফিরে এল জন কিংশুকের স্তবক নিয়ে, কখন যে তার খোঁপায় খুঁজে দিল কিংশুকের বহ্নিবলয়—ভাল করে জানতেও পায় নি রেশমী, তার পর যখন জন তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে চুম্বনে চুম্বনে সহস্র ভ্রমর-চিহ্নিত নিশ্চল পদ্মের মত উদভ্রান্ত করে দিল তখন আর কিছু জানবার অবস্থা ছিল না তার, বাহ্যজ্ঞানলুপ্ত হয়ে দিব্যজ্ঞানের স্বর্ণতোরণ দিয়ে তখন চলে গিয়েছে সে কোন আদিম অবস্থার মধ্যে। তখন সেই অবস্থায় সে একরকম করে অনুভব করল, আকাশের সবগুলো গ্রহনক্ষত্র সোনার ঘণ্টা হয়ে জ্যোতির্ময় সঙ্গীত ধনিত করছে, অরণ্যের সবগুলো তরুলতা অযুত বাহু আন্দোলন করে মহানত্যে মত্ত হয়ে উঠেছে, আর পৃথিবীর সব ধূলিকণা মহোৎসবের ক্ষেত্রে যে ধুলোট রচনা করেছে আত্মবিস্মৃত স্বয়ং মহাকাল সেখানে লুটোচ্ছে, চরাচরের চৈতন্য চেতনার শেষ প্রান্তে উপনীত হয়ে আপনাকে ফেলেছে হারিয়ে, সিন্ধুতে বিন্দুবিলীন।
প্রথম সম্বিৎ পেল জন, দেখল রাত্রি প্রায়োত্তীর্ণ প্রথম প্রহর, বুঝল নিরাপত্তার কাল অনেকক্ষণ গত।
সে বলল, রেশমী, এবারে ওঠ। রেশমী কোন কথা না বলে কেশবাস বিন্যস্ত করে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
তখন দুইজনে বাহুবদ্ধ অবস্থায় বেরিয়ে এল সমাধিক্ষেত্র থেকে।
সমাধির উপরে যখন মুগ্ধ নরনারীর এই লীলা চলছিল তখন খুব সম্ভব অসহায় জনের একটা হিল্লে হল ভেবে সমাধির অভ্যন্তরে রোজ এলমার স্বস্তিতে পাশ ফিরে শুয়েছিল। আর তার আশেপাশে যেসব মৃত নরনারী শায়িত ছিল খুব সম্ভব তারাও অনেকদিন পরে মর্ত্যজীবনের এই প্রহসন দেখে নিজ নিজ জীবনস্মৃতি স্মরণ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। জীবনে মরণে মানুষ সত্যিই বিচিত্র!
জনহীন নিরালোক পথে চলতে চলতে জন বলল, রেশমী, কাল সন্ধ্যায় আসবে আমার ওখানে?
বিস্ময়ে বলে ওঠে রেশমী, তোমার বাড়িতে?
না না, বাড়িতে কেন? কসাইটোলা আমার অফিসে ঘরগুলো সন্ধ্যাবেলায় খালি থাকে, তুমি বাড়ির কাছে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকো, গাড়ি করে তুলে নিয়ে যাব, আবার পৌঁছে দিয়ে যাব গাড়ি করে। যাবে?
