ওদিকে জনের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। পরদিন যথাসময়ে গেল সে রোজ এলমারের সমাধিতে, বসে রইল সন্ধ্যা যতক্ষণ না গড়িয়ে যায় ঘনান্ধকার রাতে, এল না কেউ। একবারও তার মনে পড়ল না যে, কাল এখানে বাঘ বেরিয়েছিল, আজও বের হতে পারে। মনের বাঘের মুখে যে ধরা পড়েছে বনের বাঘে তার কি করতে পারে। অবশেষে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ফিরে এল। এমনি প্রতিদিন যায়, প্রতিদিন হতাশ হয়ে ফিরে আসে। লিজা তার বিষণ্ণ উদভ্রান্ত ভাব দেখে ভাবে, আহা বেচারা জন, কত কষ্টই না পাচ্ছে! লিজা ভাবে, এত অল্প বয়সে এত বেশি দুঃখ পেল জন। কেটির শোক ভুলতে না ভুলতে রোজির শোক। এক-একবার ভাবে জনকে সান্ত্বনা দেবে, কিন্তু ভাষা পায় খুঁজে; ভাই-এর শোককে মনের মধ্যে গোপনে লালন করে চুপ করে থাকে, ভাবে বেচারা জন।
রেশমী মিস এলমারের সমাধিতে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল; জানত যে, সেখানে গেলে জনের সঙ্গে দেখা হওয়া অনিবার্য। সে মনে মনে ভাবল, থাক ওখানে আহাম্মুকটা বসে। বিকাল হলেই বুঝতে পারত জন ওখানে বসে আছে। নির্বোধের নিরর্থক প্রতীক্ষা স্মরণ করে মাঝে মাঝে সে কৌতুক অনুভব করত; আবার রাগও হত, পড়ুক একদিন বাঘের মুখে, হক উচিত শিক্ষা। লোকে বলে প্রেম অন্ধ। ওটা বাড়াবাড়ি, আসলে প্রেম কানা, নিজের দিকের চোখে মাত্র দেখতে পায়।
ক্রমে জনের মনেও প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। সে ভাবল সে কি অকৃতজ্ঞ। ঐ একটা নেটিভ মেয়ের জন্যে সে কিনা স্বর্গের দূতী রোজিকে অবহেলা করেছে। হি হি, এ কি কাপুরুষতা! ভাবল, এ দুঃখ তার ন্যায্য প্রাপ্য, এ তার শিক্ষা। তখনই সে মনঃস্থির। করে ফেলল, রোজি ছাড়া আর কোন মেয়ের কথা স্বপ্নেও চিন্তা করবে না সে। টেবিলের উপরে তাকিয়ে দেখল, এতদিনকার অযতে মিস এলমারের ছবিতে ধুলো জমেছে, অনেকদিনের ফুলগুলো শুকিয়ে মলিন অবস্থায় পড়ে আছে। তখনই সে তুলে আনল তাজা ফুল, সাদা গোলাপ, ধুলো ঝেড়ে ছবিখানাকে সাজাল, আর অনেকদিন পরে তন্ময় হয়ে তাকাল রোজির মুখে। কি সুন্দর চোখ দুটি আনন্দে কৌতুকে সৌন্দর্যে ঝলমল করছে। আর সেই সঙ্গে যে একটুখানি অবিশ্বাসের ভাব ছিল চোখ দুটিতে–সেটুকু পড়ল না অবশ্য জনের চোখে।
জনের মনে পড়ল একদিনের বিশ্রলাপ। জন বলেছিল, রোজি, তোমাকে চিরকাল আমি ভালবাসব।
রোজি উত্তর দিয়েছিল, তার মানে এ-বেলাটা!
ক্ষুব্ধ জন বলেছিল, রোজি, তুমি আমাকে এমন চপল মনে কর?
তোমার দোষ কি জন, ভালবাসা বটাই চপল।
তাই বলে এবেলা ও-বেলা?
এক বেলার জন্যে পেলেই বা মন্দ কি?
দেখে নিও রোজি, আমি সারাজীবন বাসব ভাল।
আমার মৃত্যুর পরেও? শুধিয়েছিল রোজি, চোখে জেগেছিল কৌতুকময় অবিশ্বাসের ভাব।
নিশ্চয়।
কিন্তু কেন জন, চপল বস্তুকে চিরস্থায়ী করবার এই ব্যর্থ চেষ্টা কেন?
তোমাকে ছাড়া আর কাউকে যে আমি জানি নে।
আমাকেই বা কতটুকু জান?
তোমাকে সবটুকু জানি।
জনের ছেলেমানুষি দেখে রোজি হেসেছিল।
জন নিতান্ত অবুঝ না হলে বুঝতে পারত যে, তার প্রতি রোজির মনোভা আর যাই হক, ভালবাসার নয়। যে ভালবাসে, ভালবাসাকে চপল জেনেও চিরন্তন মনে করে সে। তাত্ত্বিকের কাছে ভালবাসা চপল, প্রেমিকের কাছে চিরন্তন।
হবিখানা দেখে আজ সেই সব কথা মনে পড়ল জনের। ছবিখানাকে টেনে নিয়ে সে চুম্বন করল; সঙ্কল্প করল, আজ রোজির সমাধিতে গিয়ে ফুল দিয়ে সাজিয়ে দেবে। সঙ্কর করবামাত্র দেহে মনে নৃতন এক তেজ ও উৎসাহ বোধ করল সে, তখন সদর্পে সমস্ত অপবাদ ঝেড়ে ফেলে দিয়ে সদম্ভে খাড়া হয়ে দাঁড়াল। তার পর অনেকদিন পরে দুই পকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে প্রফুল্ল মনে একটা হাল্কা গানের সুর শিস দিতে দিতে দ্রুতবিক্ষেপে বেরিয়ে চলে গেল আপিসের দিকে। কর্তব্যপরায়ণ জন।
বিকালবেলা মিস এলমারের সমাধিক্ষেত্রে এসে উপস্থিত হল জন। সেখানে আর কাউকে না দেখতে পেয়ে সে যে হতাশ হয় নি এই কথাটাই মনকে বোঝাবার জন্যে শিস দিতে দিতে বারকয়েক প্রদক্ষিণ করে নিল সমাধিটা। তার পরে ফুল সংগ্রহের আশায় প্রবেশ করল বনের মধ্যে। আজ অফিস থেকে সোজা আসছিল, তাই ফুল আনতে পারে নি।
ওদিকে সমাধির কাছে এসে দাঁড়াল রেশমী। এতদিন পরে হঠাৎ আজ আসতে গেল কেন সে? রেশমী মনকে বোঝায়, একবার বোকা মানুষটার আহামুকি দেখে আসি; বলে, পুরুষের বোকামি দেখতে আমার বড় ভাল লাগে। এ ছাড়া আর কিছু তার মনের অগোচরে থাকলে কেমন করে জানব! একথা অবশ্য সত্য যে, জনের প্রতি বিদ্বেষ সত্ত্বেও তাকে অনেকদিন না দেখে কেমন যেন দমে গিয়েছিল সে। মনকে বোঝাত, একবার দেখা পেলে দুটো কড়া কথা শুনিয়ে দিতাম; বুঝত যে, রেশমী রোজি নয়, রেশমী ন্যায্য কথা বলতে জানে। কিন্তু কড়া কথা বলবে কাকে? মানুষটার যে দেখা নেই। মন বলে, যাও না কেন সমাধিস্থলে, শুনিয়ে দিয়ে এস কড়া কথা। রেশমী বলে, পাগল নাকি! তাহলে ভাববে তার সঙ্গে দেখা করবার জন্যেই এসেছি। তার চেয়ে আসুক না এ বাড়িতে। মন বলে, তুমিও পাগল হলে দেখছি। এ বাড়িতে আর কোন সুবাদে আসবে সে? রেশমী বলে, আচ্ছা বাড়িতে না হয় না-ই এল, কিন্তু বাড়ির সামনের পথেও কি যাতায়াত করতে নেই? মন বলে, তুমি কি পথে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে ঝগড়া করবে নাকি? রেশমী বলে, দূর, তা কেন, তবে একবার দেখতাম। মন বলে, দেখবার এত আগ্রহ কেন? সন্দেহজনক নয় কি? রেশমী বলে, আগ্রহ আবার কিসের দেখলে? লোকটা কতখানি শুকিয়ে গিয়েছে তাই একবার দেখতাম। মন বলে, শুকোবে কোন্ দুঃখে? তোমার বিরহে নাকি? আর যদি দেখ যে, না শুকিয়ে বেশ মোটাসোটা হয়ে উঠেছে? রেশমী বলে যে রকম আহাম্মুক, হতেও পারে।
