বাঘটা চলে গেলেও বাহুবন্ধন ওদের শিথিল হল না, দৃঢ় হল না ঘনিষ্ঠতা। এখনও ভয়ের কারণ যায় নি, এই বিশ্বাস জাগিয়ে রেখে ওরা তেমনি রইল দাঁড়িয়ে। এমন কতক্ষণ। চলত কে জানে, কিন্তু হঠাৎ সেই সময়ে কোকিলের কুহুতে বুঝি নূতন শর নিক্ষিপ্ত হল, আমের বোলের গন্ধ বুঝি আর একটু চেপে এল, বাতাসের হু-হুতে বুঝি নবীন ইন্দ ধনিত হল, আর শুক্লা তৃতীয়ার কৌতূহলী চন্দ্ৰ বুঝি শাখা-প্রশাখা ভেদ করে কৌতুকের পিচকারি আর একটু বেগে নিক্ষেপ করল–কি হচ্ছে ভাল করে বোঝবার আগেই জনের ওষ্ঠাধর স্পষ্ট হল রেশমীর অধরোষ্ঠে। এমনি চকিতে জ্বালাময় সুখময়, বিষময় অমৃতময়, বেদনা আনন্দময়, সুখদুঃখের নির্যাসময়, বকুজ্জ্বল অগ্নিময় অভিজ্ঞতার সুতীব্র সুদীর্ঘ শূল আমূল নিহিত হল রেশমীর সত্তায়। সে এক ঝটকায় নিজেকে ছিনিয়ে নিয়ে বেগে ছুটে গেল বাড়ির দিকে, পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখল না জনের অবস্থা। কিয়ৎক্ষণ অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে অপরাধীর ন্যায় ধীরপদে জন চলতে শুরু করল।
এতক্ষণ কৌতুকপরায়ণ অদৃষ্ট দুটি অবোধ তরুণতরুণীর প্রেমের লীলা দেখে নিশ্চয় খুব হাসছিল—এবারে তার ছুটি হল।
তত্ত্বজ্ঞানীরা চিরকাল ধরে আলোচনা করে আসছেন মূলত মানুষ ভাল কি মন্দ। কিন্তু সত্য কথা এই যে, মানুষ মূলত ভালও নয়, মন্দও নয়, মূলত মানুষ বিচিত্র, অদ্ভুত অপ্রত্যাশিত তার প্রকৃতি। তাই সমাধিতে বসে প্রেমসূত্র রচনায় তার সঙ্কোচ নেই; তাই অচিরগত প্রেয়সীর শ্মশান ভস্ম তার হাতে আবীরমুষ্টি হয়ে ওঠে, তাই সমাধির ফুলে প্রেমের মালা রচনা করে সে। এ কি ভালমন্দের কাজ! এ কাজ অভূতের। বোধ করি এই হচ্ছে মানব-প্রকৃতির সত্য! কিংবা তার চেয়েও অধিক—এই বোধ করি বিশ্বপ্রকৃতির সত্য। জীর্ণ পত্ৰপুষ্প রচনা করে নূতন জীবনের ভূমিকা, প্রেমের সমাধি গঠন করে নূতন প্রেমের রঙ্গমঞ্চ, শ্মশানের বুকে অঙ্কুরিত হয় পঞ্চবটী আর একদিন অবশেষে সমাধিস্থ মৃতদেহ নবতর জীবনের পাত্র হাতে করে দেখা দেয় জ্যোতির্ময় রূপে। জীবনের অশ্ব সবেগে সোল্লাসে সার্থকতার মুখে টেনে নিয়ে যায় মৃত্যুর অনড় রথখানা। পরাজিত মৃত্যু আনন্দধ্বনি তোলে, জয় জীবনের জয়।
.
৩.১৪ কর্তব্যপরায়ণ জন
বাণগ্ৰস্থা মৃগীর মত ছুটে এল রেশমী, পথে লোকজন ছিল না, নইলে সে অবস্থায় তাকে দেখলে অবাক হয়ে যেত—একটা আস্ত মেয়ে এমনভাবে ছুটছে কেন! বাগানের খিড়কি দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ল বাড়িতে, একেবারে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়ল, সে রাতে আহার করবার জন্যেও উঠল না।
সমস্ত অবস্থা ধীরভাবে বিবেচনা করে দেখবার মত মনের অবস্থা তার ছিল না; যখন যে-ভাবটা প্রবল হয়ে উঠেছিল সেইটাকেই নিচ্ছিল চরম বলে; ফলে পলে পলে, পলকে পলকে মনের মধ্যে তার ভাবান্তরের বন্যা প্রবল হয়ে উঠেছিল। প্রথমে অপ্রতিরোধ্য দুর্জয় একটা রাগ হল জনের উপরে, মনে হল অসহায়তার সুযোগ নিয়ে ঘোতর অপমান করেছে সে রেশমীকে। কিন্তু একবারও তার মনে হল না যে, অসহায় অবস্থা কেবল রেশমীর ঘটে নি, হাতে পেলে জনকে ছেড়ে কথা কইত না বাঘটা। তার পর জনকে কাপুরুষ বলে মনে হল, নইলে একলা পেয়ে মেয়েদের সঙ্গে এমন ব্যবহার কোন পুরুষে করে না। কিন্তু তখনও ভেবে দেখল না যে, মনে মনে সে-ও আকৃষ্ট হয়েছিল জনের প্রতি। খুঁটিয়ে দেখলে তাকে স্বীকার করতেই হত যে, তার মনটাও বেশ নুয়ে পড়েছিল জনের দিকে। দুইখানি মনের মেঘ যখন বেশ জলভার-অবনত হয়ে কাছাকাছি এসে পড়েছে, তখন বাঘটা হঠাৎ এসে পড়ে তাদের মধ্যে বিদ্যুতের রাখী বেঁধে দিল। এতদিনের ধীর মন্থর মন্দাক্রান্তা এক মুহূর্তে শার্দূলবিক্ৰীড়িত ছন্দে পরিণামে গিয়ে পৌঁছল।
এই হল গিয়ে তার মনের সাক্ষ্য। কিন্তু দেহ সাক্ষ্য দেয় ঠিক উল্টো। দেহ থেকে থেকে জনের স্পর্শপুলক স্মরণ করে উল্লাসে কেঁপে কেঁপে ওঠে। সেই চুম্বিত মুহূর্তটাকে স্মৃতির উপরিতলে টেনে আনবার জন্য চেষ্টার তার অবধি নেই, কিন্তু ঠিকমত পেরে ওঠে না। স্বচ্ছ জলের নীচে দেখা যায় সেই স্বলিত চুনিটা, হাত বাড়িয়ে দেয়, আর একটু নীচে, আর একটু, তবু রয়ে যায় অপ্রাপ্য; চোখে মনে হয় এত কাছে, তবু হাতটা পৌঁছয় না কেন, বুঝতে পারে না বিমূঢ় দেহ। একি রহস্য! একি রহস্যময় যন্ত্রণা! ইন্দ্রধনুর মধ্যে দুটি একটি রঙ আছে, মন বলে আছে বই কি, চোখ তবু ধরতে পারে না, মন যত নিবিষ্ট হয়, চোখ হয় তত উদ্ভ্রান্ত, চোখে আর মনে কিছুতেই সাক্ষ্য মেলাতে পারে না। রেশমীর মন যতই বলছে জন কাপুরুষ, অত্যাচারী, নিষ্ঠুর, দেহ ততই আগ্রহে সেই চুম্বনে উজ্জ্বল মুহূর্তটিকে যথাযথ আকারে উদ্ধার করতে চায়। মন ও দেহের দ্বৈরথ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে রেশমী ভাবে, একি আপদ! এমন সময়ে তার চোখে পরে জনের ছবিখানা। এখানা আবার কে আনল বলে উত্তেজিত হয়ে ওঠে সে। এনেছিল সে নিজে। রোজ এলমারের মৃত্যুর পরে তার ঘর থেকে ছবিখানা সরিয়ে নিয়ে এসেছিল সে নিজের ঘরে। সরিয়ে ফেলবার উদ্দেশ্যে ছবিখানা হাতে নিয়ে হঠাৎ চমকে ওঠে, জনের মুখে একসঙ্গে দেহ ও মনের বিপরীত সাক্ষ্যের চিহ্ন পড়ে তার চোখে চোখ দুটো দেখে মন বলে ওঠে, এ তো নিষ্ঠুরতায় পূর্ণ; অধরোষ্ঠের গুণ-পরানো ছোট্ট ধনুকটার বিলাস বঙ্কিমা দেখে দেহ সর্বাঙ্গে কণ্টকিত হয়ে ওঠে, চুম্বনঘন সেই মুহূর্তটি অমৃতসিক্ত ক্ষুদ্র একটি শরের মত নিক্ষিপ্ত হয় তার বুকে। কি করছে ভাল করে বোঝবার আগেই দেহ সেখানে মুদ্রিত করে দেয় একটি চুম্বন। পরমুহূর্তে মন করে ওঠে প্রতিবাদ, ছবিখানা দূরে নিক্ষিপ্ত হয়। এইভাবে কতক্ষণ চলত বলা যায় না, কিন্তু এক সময়ে এই অসম দ্বন্দ্বে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল কখন, কাপড় বদলাতেও গেল ভুলে।
