ফাগুনের পত্র-মর্মরে পায়ের শব্দ মিশিয়ে রেশমী কাছে গিয়ে ডাকল, মিঃ স্মিথ।
চকিতে মুখ তুলে চাইল জন, তার মুখে জ্বলে উঠল আলো, বলে উঠল, বিবি, তুমি এসেছ?
এবং তার পরেই কি করছে ভাল করে ভেবে দেখবার আগেই হাত বাড়িয়ে রেশমীর হাতখানা ধরে-পাছে ছলনাময়ী পালিয়ে যায়, পাছে রহস্যময়ী স্বপ্নে পরিণত হয়—বসাল তাকে সমাধির উপরে।
তোমার ফুলগুলো দেখে আমার মন দমে গিযেছিল, ধারণা হয়েছিল তুমি এসে চলে গিয়েছ।
চলে যাব কেন, অন্য সমাধিগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম।
কি আর দেখবার আছে ওগুলোতে?
বল কি মিঃ স্মিথ, মৃতের সমাধি বড় রহস্যময়।
না বিবি, এ তোমার ভুল, রহস্যময় যদি কিছু থাকে তবে তা জীবন, যেমন রহস্যময় তেমনি সৌন্দর্যময়, তেমনি সার্থক।
কিন্তু মিঃ স্মিথ, মৃত্যুও কি জীবনের অঙ্গ নয়, মৃত্যুর রহসও যে জীবনের রহস্যের অন্তর্গত।
তোমার কথা ঠিক বিবি, কিন্তু মৃত্যুর মধ্যে প্রবেশের পথ যে জীবনের তোরণ দিয়ে, সমাধিতে প্রবেশ করতে হয় আঁতুড়ঘর দিয়ে।
সেই কথাই তো বলছিলাম, জীবনে প্রবেশের দুটি দরজা, আঁতুরঘর আর সমাধি।
বিবি, তোমাদের হিঙুদের দর্শনশাস্ত্রে সহজাত অধিকার।
তার পর বলে উঠল, আহা তুমি যদি হিঙু না হতে!
তবে কি নিগ্রো হলে খুশি হতে? বলে খিল খিল করে হেসে উঠল রেশমী, যেন প্রেমিকার শিয়রে বীজনরত বনাঙ্গনার হাতে বেজে উঠল রেশমী চুড়ির গোছা।
জীবন-মৃত্যু সম্বন্ধে এত কথা ওদের জানবার নয় যারা বলে, তাদের মনে রাখা। উচিত প্রেম মুখে অজ্ঞাত ভাষা যুগিয়ে দেয়, আবার প্রেমই হরণ করে মুখের ভাষা; যে বসন্ত বনে বনে ফুল ফুটিয়ে তোলে সেই বসন্তই দমকা হাওয়া তুলে আবার তা ঝরিয়ে দেয়।
ওদের মুখের কথা গেল বন্ধ হয়ে, কিন্তু মানুষ তো শুধু মুখ দিয়েই ভাব প্রকাশ করে না। চৈত্রসন্ধ্যায় আকাশ-কোণায় ছোট ছোট বিদ্যুৎ-সঞ্চারের মত ওদের চোখের কোণে কোণে ফুটল জিজ্ঞাসা, শুক্লা তৃতীয়ার চাদের ফালির মত ওদের ওষ্ঠাধরে ফুটল হাসির রেখা, পিপাসার অদৃশ্য মরীচিকা ওদের সর্ব অঙ্গ ঘিরে আলোকরশ্মির চমক তুলতে লাগল।
অবশেষে ওদের মুখের কথা গেল একবারে বন্ধ হয়ে। বসন্তের রাতে হাওয়ার মাতামাতি যখন ক্ষণতরে স্তব্ধ হয়ে যায় তখন আমের বোলের ঘন গন্ধ চেপে ধরে অরণ্যের বুক, সে চাপ একাধারে অসহ্য সুখের আর দুর্বহ দুঃখের, তা সহ্য করা বা সরিয়ে ফেলা দুই-ই সমান কঠিন।
কিছুক্ষণ পরে,কতক্ষণ পরে তা ওরা জানে না, প্রেমের জগৎ দেশকালের অতীত,জন আচমকা বলে উঠল, রেশমী বিবি, আমি তোমাকে ভালবাসি।
নিজের কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল জন, কে বলল তার মুখ দিয়ে ঐ কথা? বোকার মত, কিঞ্চিৎ লজ্জিতভাবে তাকিয়ে রইল; ভাবল, না জানি এখনই কি রূঢ় উত্তর শুনতে হবে।
অত্যন্ত সহজভাবে রেশমী বলল, এবারে ওঠ মিঃ স্মিথ, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।
উত্তরের সহজ প্রসন্নতায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল জন, ফাঁসির হুকুমের বদলে বেকসুর খালাসের রায়।
তখনই পরমুহূর্তে নৈরাশ্যের ধাক্কা অনুভব করল বুকে—এখনই ফিরতে হবে?
অবশ্য রেশমী ওঠবার জন্যে কিছুমাত্র ব্যস্ততা প্রকাশ না করায় আনন্দিত হল; কিন্তু তখনই আবার কেমন আশাভঙ্গের ভাব প্রবল হয়ে উঠল মনে, আসল কথাটার জবাব তো মিলল না। বেকসুর খালাস আসামী ফাঁসির দায় থেকে মুক্ত হয়ে দেখে, মুক্তি মিলল বটে, কিন্তু আর কিছু তো মিলল না। বাড়িঘর আত্মীয়স্বজন মায় রাহাখরচ কিছুই নেই সম্মুখে!
কোন্ কৌতুকপরায়ণ অদৃষ্ট প্রেমের নাগরদোলায় চাপিয়ে মানুষকে নিয়ে নিষ্ঠুর পরিহাস করে, কি আনন্দ পায় সে-ই জানে।
ওঠ মিঃ স্মিথ, সন্ধ্যা হল যে!
সন্ধ্যা হল তো কি হল?
বাঃ, তুমিই তো কাল বলেছিলে যে, সন্ধ্যাবেলায় এদিকে বাঘ বের হয়!
হয় হক, ক্ষতি কি?
ক্ষতি আর এমন কি, কেবল দুজনের ঘাড় ভেঙে রক্ত পান করবে!
বীর্য প্রকাশ করে জন বলল, ডিয়ারি, আগে আমার ঘাড় ভাঙবে।
কিন্তু তাতেই বা কি লাভ হবে, দু-দণ্ড পরে যদি আমার ঘাড় ভাঙে!
দুশমনটার এমন দুঃসাহস কখনো হবে না।
হওয়ার কি কারণ? সে তো আমার সঙ্গে প্রেমে পড়ে নি?
ইনডীড! বলে হেসে ওঠে জন।
হাসির দমকায় ভাবালুতার কুয়াশা যায় কেটে। হাসি তত্ত্বজিজ্ঞাসার প্রথম সোপান।
দুজনে সমাধিক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে রাস্তার উপর আসে। এমন সময় চমকে উঠে জন ইশারা করে দেখায়, ভীত বিস্ময়ে রেশমী দেখে অদূরে গাছপালার আড়ালে সঞ্চরমাণ শার্দূলরাজ। টু শব্দটি করে না কেউ। ঘনিষ্ঠ হয়ে আসে জনের কাছে রেশমী। জন বাহুবন্ধনে রেশমীকে টেনে নেয়। বাঘের ভয় বাহুবন্ধনের যে জোর দাবি করে তার চেয়ে বোধ করি কিছু অধিক ছিল জনের বাহুতে; বাঘের ভয় পুরুষের যে ঘনিষ্ঠতা দাবি করে। তার চেয়ে বোধ করি কিছু অধিক ছিল রেশমীর নৈকট্যে; দুজনে প্রায় একাঙ্গ হয়ে স্থাণুর মত, মূঢ়ের মত, শিশুর মত, জগতে সবচেয়ে সুখীর মত দাঁড়িয়ে থাকে, ভয়ে, আনন্দে, বিচিত্র সৌভাগ্যে; আবার এখনই ছাড়াছাড়ি করতে হবে সেই দুর্ভাগ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁপে; নির্বাক তাকিয়ে থাকে ওরা বাঘটার দিকে; শীঘ্র চলে যাক, ধীরে ধীরে যাক, আর কখনও যেন না আসে, আবার কাল যেন এইভাবে আসে-কত কি বিরুদ্ধ ভাবনার বলাকা উড়ে উড়ে যায় ওদের মনে। মুগ্ধ প্রণয়ী-যুগলের লীলার প্রতি দৃকপাত মাত্র না করে শাল-রাজ নির্দিষ্ট পথে চলে গেল। যে অরণ্যে এদের প্রণয়ের ভূমিকা সৃষ্টি হয়েছিল সেই অরণ্যের শাল-রাজ নির্মোচ্য গ্রন্থি এঁটে দিল ওদের বসনে। বহু যুগ আগে অরণ্যের এক সর্প যে-ভূমিকার সৃষ্টি করে দিয়েছিল আদিম দম্পতির জীবনে, সেই অরণ্যেরই আর এক পশু তারই আর এক অধ্যায়ের সূচনা করে দিল বহুযুগ-পরেকার আর এক দম্পতির জীবনে।
