সে ভাবল, তবে এক ফুল কে দিয়ে গেল? কাল যখন এসেছিল, ছিল না এ ফুল। তবে সেই অজ্ঞাত ব্যক্তি আরও পরে এসেছিল—অর্থাৎ প্রায় সন্ধ্যাবেলা। তার পরে ভাবল, যে-ই দিক ক্ষতি কি? কর্নেল যে দেয় নি এই তো যথেষ্ট। ফুলগুলি সমাধির শিয়রে রেখে সে মূঢ়ের মত বসে রইল। এমন সময়ে পিছনে পত্ৰমৰ্মরে পদশব্দ শুনে চমকে পিছনে চাইল-রেশমীর হাতে লাল ফুল! এক মুহূর্তে ফুলের রহস্য পরিষ্কার হয়ে গেল তার মনে।
জন উঠে দাঁড়াল, রেশমী বিবি, তুমি?
হাঁ মিঃ স্মিথ।
তুমি কাল এই ফুলগুলো দিয়ে গিয়েছিলে?
হাঁ মিঃ স্মিথ।
আমি ভাবছিলাম, আবার কে এল!
এলেই বা ক্ষতি কি? মৃত্যুর কাছে তো রেষারেষি চলে না।
অবশ্যই চলে না, তাছাড়া তোমার সঙ্গে আমার রেষারেষিই বা হতে যাবে কেন? দাঁড়িয়ে রইলে যে? ফুলগুলো দাও। বস।
রেশমী ফুলগুলো সমাধির শিয়রে সাজিয়ে দিয়ে বসল। লাল ফুল। রেশমীর ফুলে আর জনের ফুলে মেশামেশি হয়ে গেল।
মৃতকে কি লাল ফুল দেয় রেশমী বিবি?
মিস এলমার মরেছেন, একথা আমার মন মানতে চায় না।
হায়, যদি তা সত্য হত!
সত্য হতে বাধা কি? সবই তো মনের ব্যাপার!
ফাল্গুনের হাওয়ার দমক বড় বড় বনস্পতিগুলোর মধ্যে চাপা দীর্ঘনিশ্বাসের মত হুহু করে ওঠে; নানা ফুলের মিশ্র গন্ধ ছড়িয়ে দেয় অব্যক্ত অস্পষ্ট আকৃতি; হাজার পতঙ্গের চঞ্চল পাখা অদৃশ্যের উত্তরীয়-প্রান্তের মত হঠাৎ গায়ে এসে ঠেকে; আর অলক্ষ্য ঘুঘুটা একটানা বিলাপের রশি নামিয়েই চলেছে অতলের তল সন্ধান করে।
কথা ফুরিয়ে গিয়েছে অনেকক্ষণ দুজনের, দুজনে মূঢ়ের মত বনের রহস্যের দিকে তাকিয়ে নির্বাক বলে থাকে। মৃত্যুর কাছে মুখরতার স্থান নেই।
রেশমী কি ভাবছিল কেমন করে বলব। তবে জনের আর্ত ভাব, ফুল নিয়ে আগমন বোধ করি তাকে খুশি করে নি। কাল যখন সে দেখল যে সমাধিতে কারও ফুলের চিহ্ন নেই, সে নিশ্চয় জানত জন ছাড়া ফুল দেওয়ার লোক আর কেউ নেই,-তখন মনে মনে বেশ একটু খুশি হয়েছিল। নিজের মনকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিল যে, ভালই হল, মৃত্যুর পরে নিঃসপত্ন অধিকার সে পেয়েছে মিস এলমারের। কিন্তু খুশি কি কেবল সেই জন্যেই? হয়তো মনের নীচের তলায় আরও একটা কারণ ছিল—জনের আর কোন টান নেই মিস এলমারের উপরে, নইলে মৃত্যুর দুদিন পরেই এমন করে ভুলে যেত না, সমাধির শিয়রে দুটো ফুল নিতান্ত নিম্পরেও দিয়ে থাকে। আজকে জনকে দেখে মনে লাগল তার খোঁচা, তবে দেখছি ভোলে নি; ভাবল, ভালই তো, এত শীগগির ভোলা কি শোভন? আবার ভাবল, দুটো ফুল দেওয়া নিতান্ত সামাজিক প্রথা, ওর সঙ্গে ভোলা না ভোলার কোন সম্বন্ধ নেই।
মিঃ স্মিথ, তুমি আজই প্রথম এলে?
রেশমী বিবি, গতকালও এসেছিলাম।
তবে ফুল দাও নি কেন?
এনেছিলাম সাদা গোলাপ, সমাধির শিয়রে ঠেকিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে গেলাম, সাদা গোলাপ আমার প্রিয়ার বড় প্রিয় ছিল।
সমাধির ফুল কি ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
কেন?
মৃত্যুর দান ফিরিয়ে নিতে নেই।
এই তো তুমি এখনই বললে যে রোজিকে তুমি মৃত ভাবতে পার না!
তুমি তো পেরেছ দেখছি।
কেমন করে জানলে?
তোমরা পুরুষরা প্রেয়সী মরলে নিতান্ত দুঃখিত হও না।
চমকে উঠে জন বলে, সে কি কথা!
তরুণতর প্রেয়সীর সন্ধানে সুযোগ পাও তোমরা।
রেশমী বিবি, তুমি যেমন কোমল তোমার কথাগুলো তেমনি কঠিন।
খুশি হল মনে মনে রেশমী। বলল, তোমাদের মনকে আঘাত করতে পারে এমন কঠিন কথা মেয়েদের অজ্ঞাত।
কি উত্তর দেবে জন ভেবে পায় না।
কোকিল দুটো সুরের টানাপোড়েনে আকাশটা প্রায় আচ্ছন্ন করে ফেলল।
জন বলল, রেশমী বিবি, চল, আর থাকা উচিত নয়, সন্ধ্যায় অনেক সময় শ্বাপদ বের হয় এদিকে।
রেশমী উঠল।
কাল আবার আসবে তো বিবি?
দেখি, চেষ্টা করব, সময় পাওয়া দুর্ঘট।
না, অবশ্য এসো, তোমার হাতের ফুল বড় ভালবাসত মিস এলমার।
তুমি নিশ্চয় আসছ মিঃ স্মিথ?
আমার আর অন্য কি কাজ আছে বল। চল তোমাকে একটু এগিয়ে দিই।
দুজনে অগ্রসর হয় পশ্চিমদিকে এবং লোকালয়ের কাছাকাছি এসে চলে যায় দুজন দুদিকে।
জন মনে মনে ভাবে, রেশমী বিবি আসবে তো?
রেশমী মনে মনে ভাবে, পৃথিবী রসাতলে গেলেও জনের না এসে উপায় নেই।
পরদিন নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগে মিস এলমারের সমাধির কাছে পৌঁছে জনের মন দমে গেল। কেউ নেই। কিন্তু যখন তার নজরে পড়ল সমাধির শিয়রে টাটকা তাজা ফুলের রাশ, সে হতাশ হয়ে একবারে বসে পড়ল। রেশমী এসেছিল এবং ফুল দিয়ে চলে গিয়েছে। জনের মনে হল এ অন্যায়, মনে হল রেশমী অত্যন্ত বিশ্বাসঘাতক, মনে হল সুখ-সৌন্দর্য আশাপূর্ণ পৃথিবী একবারে নিরর্থক। সে চুপ করে বসে হাঁটুর মধ্যে মাথা খুঁজে পড়ে রইল।
অদূরে একটা সমাধির আড়ালে দাঁড়িয়ে জনের হেনস্তা দেখে রেশমীর চোখে কৌতুকের আভা ফুটল, ওষ্ঠাধরে হাসির রেখা ফুটল, সমস্ত মুখে চোখে ফুটল সার্থকতার আলো, সে যা চাইছিল তা-ই ঘটল। বলা বাহুল্য সে আগেই এসেছিল আর ফুলগুলো রেখে একটু আড়াল হয়েছিল জনের মনোভাব যাচাই করবার উদ্দেশ্যে, সে পরীক্ষা করতে চায় জীবিত ও মৃতের মধ্যে কার টান বেশি? গতকাল পর্যন্ত তার ধারণা ছিল মৃত চাঁদের টানে যেমন জোয়ার ফেনিয়ে ওঠে সমুদ্রের বুকে, তেমনি আজও মৃত এলমার ফেনিয়ে ফাঁপিয়ে তুলছে জনের বুক। কিন্তু এইমাত্র জনের যে দশা স্বচক্ষে সে দেখল, বুঝল যে এক্ষেত্রে মূতের উপরে জীবিতের স্থান। তার মনে কেমন একটু দয়াভাবের সঞ্চার হল এই হতভাগ্য যুবকটির উপরে, কেমন যেন একটু মাতৃভাব। প্রত্যেক প্রেমের সঙ্গে মাতৃভাব মিশ্রিত, প্রত্যেক নারী সম্ভাবিত মাতা, এই অর্থে নিতান্ত বালিকাও অত্যন্ত বয়োজ্যেষ্ঠ পুরুষের চেয়ে জ্যেষ্ঠতর।
