টমাস দেখল মুন্সীই একমাত্র শ্রোতা, পাছে সেও অন্য সকলের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, তাই সবলে তার হাত ধরে বসিয়ে সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের বিস্তারিত ভাষ্য কথনে নিযুক্ত হল। রাম বসু টমাসের প্রকৃতি জানত, বুঝল সকালবেলাটা এই পর্বেই যাবে।
.
৩.১২ উদ্দেশ্য—তীর্থদর্শন
চণ্ডী বক্সী রেশমীর দিদিমা মোক্ষদা বুড়িকে হাত করে নিয়ে রেশমীর নামীয় বিষয় আশয় জোত-ব্ৰহ্মত্র বাড়িঘর দখল করে বসেছিল। লোক কানাকানি করছে অনুমান করে যত্রতত্র বলে বেড়াত, আরে বাপু, একটু দেখাশোনা না করলে পাঁচভূতে লুটে খাবে, বুড়ো মানুষ সামলাতে পারবে কেন?
তার পরে বলত, কি গেরো! যত দায় কি আমার ঘাড়ে এসে চাপবে!
লোকে মনে মনে বলত, কথাটা মিথ্যা নয়, গায়ে এবং আশেপাশে পাঁচ গাঁয়ের এমন অনেকগুলো বিষয়-আশয়ের ভার ঘাড়ে চেপেছে বটে তোমার।
চণ্ডী বক্সী বলত, এ যেন কাকের বাসায় কোকিলের ছানা পুষছি, ডানায় জোর পেলেই উড়ে পালাবে, তখন কাকস্য পরিবেদনা! মানে বুঝলে তো মুৎসুদ্দি, কাকের কেবল মনে ব্যথা। এর চেয়ে অনেক ভাল ছিল যদি নিজের জোত-জমির তদারক করতাম।
সে খেদের প্রয়োজন ছিল না চণ্ডীর, নিজস্ব বলতে এক ছটাক জমিও ছিল না তার। চণ্ডীর মত লোকের পক্ষে পরস্বই নিজস্ব।
কিন্তু লোকের কাছে যাই বলুক, মনে শান্তি ছিল না চণ্ডীর। সে জানত রেশমী এখনও জীবিত, আর আছে সাহেবের হেফাজতে। কোনদিন যে হঠাৎ দেখা দেবে, তখন বিষয়-আশয় যাবেই, না জানি কোন প্যাচে পড়বে, ভেবে তার দুশ্চিন্তার অন্ত ছিল না। বিপদে মধুসূদন মহারাজা নবকৃষ্ণ বাহাদুর কিছুকাল আগে দেহরক্ষা করেছেন, কাজেই কে তখন রক্ষা করবে চণ্ডীকে!
কিন্তু মেঘ যতই কালো হক দু-একটা রজতরেখা না থেকে যায় না। চণ্ডীর অভিপ্রায়ের প্রধান অন্তরায় তিনু চক্রবর্তী নিহত হয়েছে। গাঁয়ের লোকে আজও বুঝতে পারে নি তিনুর হত্যাকাণ্ডের রহস্য। কেবল চণ্ডী ঠিক অনুমান করেছিল। অসৎ লোকের ধূর্ত না হলে চলে না, সাধুসজ্জনেরই নির্বোধ হওয়া সাজে।
চণ্ডী বুঝেছিল যে, তিনু চক্রবর্তী তার অভিপ্রায় জানতে পেরে রেশমীকে রক্ষা করবার উদ্দেশ্যে গিয়েছিল বজরায়। অন্ধকারে শত্রমিত্র একাকার। মরতে মরল তিনু। এটাকেও সে বিধাতার অভিপ্রায় বলে ব্যাখ্যা করত।
সে বলত, মিত্যুঞ্জয়,—মিত্যুঞ্জয় তার দুষ্কর্মের প্রধান সঙ্গী,-বল দেখি এটা কেমন করে ঘটল? আমি যদি অন্যায় কাজ করতেই গিয়ে থাকি, মরা উচিত ছিল আমার, মরল কেন তিন?
লোকে বলে সাহেব অন্ধকারে গুলি চালিয়েছিল।
বাবা মিত্যুঞ্জয়, অন্তর্যামীর চোখেও কি আলো অন্ধকার আছে? তিনি তো দেখেছিলেন কে মরছে, রক্ষা করলেন না কেন?
মৃত্যুঞ্জয় বলে, আপনিই বুঝিয়ে দিন, আমরা যে লোকের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না।
তাতে দুঃখিত হয়ো না বাবা, শাস্ত্রের ধর্ম বোঝা সহজ নয়।
তার পরে বেশ শাস্ত্রালোচনার উপযুক্ত শান্ত সংযত ভাবে উপবেশন করে বলে, গীতায় শ্রীভগবান কি বলেন নি যে পরিত্রাণায় সাধুনাম, বিনাশায় চ দুস্কৃতাম, সম্ভবামি যুগে যুগে! আরে বাপু, তিনু যখন মরল তখন বুঝে নিতে হবে যে লোকটা দুষ্কৃতকারী, আমি যখন বেঁচে গেলাম বুঝে নিতে হবে যে আমি সাধু।
একটু থেমে পুনরায় বলে, পড় পড়-গীতা পড়, ভাল করে গীতা পড়লে কোন কাজ করতে বাধবে না।
চণ্ডী খুব সম্ভব শাগরেদের মহিমা সম্পূর্ণ অবগত ছিল না, নতুবা এমন উপদেশ কেন দিতে যাবে!
মৃত্যুঞ্জয় বলল, এখন কি করবেন ভাবছেন?
একবার কলকাতা যেতে হবে।
কলকাতায় কেন?
আমার মনে হচ্ছে খুঁড়িটা ওখানেই গিয়েছে, সেখানে সাহেবের সাহেবে মুখ শোকাশ্রুকি, কতদূর কি গড়াল একবার সরেজমিনে দেখে আসা ভাল–জানই তো ক্ষেত্রে কর্ম বিধীয়তে।
আর কাকে সঙ্গে নেবেন?
বেশি লোক নেওয়া কিছু নয়, জানাজানি হবে যাবে।
তবে একাই যাচ্ছেন?
একেবারে একাকীও কিছু নয়। তুমি যেতে পারবে না?
বাধা কি।
আর সঙ্গে নিতে হবে মোক্ষদা বুড়িকে।
তাকে আবার কেন?
ছেলেমানুষ, কিছুই বোঝ না দেখছি। কলকাতা কোম্পানির মুল্লুক, আইনের রাজত্ব। ঘুড়িটার প্ররোচনায় সাহেবগুলো গোলমাল বাধতে চেষ্টা করলে মোক্ষদাকে এগিয়ে দেব, বলব যে বুড়ি এসেছে নাতনীকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। বুঝলে না? তা হলে আমাদের আর কোন দায় থাকবে না।
ভাল বলেছেন, কিন্তু বুডিকে তো এত বলা যায় না।
যা বলা যায়, বলেছি, কালীঘাটে যাচ্ছি মা কালীকে দর্শন করতে। বুড়ি নেচে রাজী হয়েছে।
তবে তো চারদিক বেঁধেই অগ্রসর হয়েছেন।
অগ্রসর আর কোথায় হলাম, এখনও তো জোড়ামউ গায়ে বসে আছি। যাও তুমি গিয়ে গোছগাছ করে নাও, কাল সকালেই বেরিয়ে পড়ব।
পরদিন সকালে মোক্ষদাকে নিয়ে চণ্ডী আর মৃত্যুঞ্জয় কলকাতা রওনা হয়ে গেল।
লোকে বলাবলি করল, চণ্ডী মুখে কটুকাটব্য করলেও মনটায় সাদা। বুড়িকে নিয়ে তো গেল কালীঘাটে—একা যেতে তার কি বাধা ছিল? যাই বল, দোষে গুণে মানুষ।
তিনু চক্রবর্তীর অভাবে চণ্ডীর প্রকৃত উদ্দেশ্যের সন্ধান কেউ জানতে পারল না।
.
৩.১৩ জীবিত না মৃত?
বেরিয়াল গ্রাউণ্ড রোডের পুবদিকে সুন্দরবনের মধ্যে খানিকটা জায়গা গাছপালা কেটে পরিষ্কার করে নিয়ে নূতন সমাধিক্ষেত্র স্থাপিত হয়েছে। তারই একদিকে একটি সদ্যোনির্মিত সমাধি পাথর দিয়ে গাঁথা, এখনও চুন-সুরকি ভাল করে শুকোয় নি। একদিন বিকালবেলা জন কতকগুলো সাদা ফুল নিয়ে সেখানে এসে উপস্থিত হল। ধীরপদে বিষণ্ণ মুখে সমাধির কাছে এসে চমকে উঠল—একি, এ ফুলগুলো দিয়ে গেল কে? কাল অবশ্য সে এসেছিল, কিন্তু ফুল তো রেখে যায় নি। সাদা গোলাপের একটি তোড়া নিয়ে কাল এসেছিল সে, তোড়াটি রেখেছিল সমাধির শিয়রে। অনেকক্ষণ বসে থেকে উঠে যাওয়ার সময়ে তোডাটি নিয়ে গিয়েছিল। সাদা গোলাপ রোজির খুব প্রিয় ছিল; ইদানীং কতদিন তাকে হোয়াইট রোজ বলে ঠাট্টা করত। মনে পড়ল রোজি বলেছিল যে কর্নেল ডাকে আমাকে রেড রোজ বলে, এখন আবার তোমাদের মধ্যে ওয়ার অব রোজেস না বেধে যায়। রোজের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ সাদা গোলাপের তোড়াটি সঙ্গে করে সে বাড়ি ফিরেছিল। এখন আবার সেখানে সাদা ফুল দেখে তার বিস্ময়ের অন্ত রইল না, সেই সঙ্গে একটুখানি ঈর্ষাও কাঁটা ফুটিয়ে দিল। আমার প্রিয়জন আর কারও প্রিয়, এ চিন্তা প্রেমিকের পক্ষে হৃদ্য নয়, এমন কি প্রিয়জনের মৃত্যুর পরেও এ চিন্তার ধারা অবসিত হয় না, হয়তো বা বাড়ে। মৃত্যু যখন পর্দা ঝুলিয়ে দেয়, তখন সমস্ত সম্বন্ধের অবসান হয়—থাকে একমাত্র প্রেমের সম্বন্ধ; সেই সম্বন্ধ অপর কোন জীবিত মানুষ স্মরণ করে রেখেছে প্রেমিকের পক্ষে তা অসহ্য। তার মনে একবার বিদ্যুতের কশা আঘাত করে গেল-কর্নেল নয় তো? তখনই আবার মনে পড়ল, না! কর্নেল রোজির মৃত্যুর দিনেই আড়াই-মণী মিস স্পেংলারের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে; অবশ্য কর্নেলের পক্ষে যতখানি আত্মসমর্পণ সম্ভব। এ তার নিজের চোখে দেখা। যখন সবাই রোজ এলমারের মৃতদেহের সঙ্গে সমাধিক্ষেত্রের দিকে যাচ্ছিল তখন কর্নেলকে দেখা গেল নবলব্ধ প্রিয়তমাকে নিয়ে জুড়িগাড়ি হাঁকিয়ে যেতে। পাষণ্ডটা নামল না, একটু থামল না, এমন কি একবার টুপিটাও তুলল না! সবাই মনে মনে তাকে ধিক্কার দিল, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, জনের মনে কেন যেন আনন্দ হল। ওঃ, এবার বেশ প্রমাণ হয়ে গেল তোমার প্রেম কতটা সত্য। মৃত্যুর কাছে চালাকি খাটে না।
