এই পর্যন্ত বলে সুর করে আবৃত্তি করে ফেলিক্স–
ধন্য সাহেব কোম্পানি,
বই লেখা হয় কলে
কলটি যখন চলে
গুরুমশার ব্যবসা মাটি, ঘুচল দানাপানি,
মরি ধন্য সাহেব কোম্পানি।
বাঃ, বেশ লিখেছে তো! বলে রাম বসু, তার পরে কি হল বল?
এমন সময় খবর পৌঁছল যে, এরা পৌঁছেছে শ্রীরামপুরে। বাবাকে সাদরে আহ্বান করল। বাবাও দেখল, উদ্দেশ্য এক, তবে আর অতদূরে পড়ে থাকি কেন, সবাই মিলে চলে এলাম।
আর টমাসের কি হল?
তোমার চলে আসবার কিছুদিন পরে সেই যে সে বেগানা হল, আজও খোঁজ পাই নি তার। কেউ বলে, গিয়েছে রাজমহলে, কেউ বলে বীরভূমে।
মদনাবাটির পরবর্তী ইতিহাসের মোটামুটি একটা আভাস পায় রাম বসু।
রাত্রিবেলা বিছানাতে শুতেই সারাদিনের বিচিত্র অভিজ্ঞতা মাকড়সার সুতোর মত কোথায় ছিন্ন হয়ে গেল উড়ে, মনে পড়ল রেশমীর অশুকাতর মুখখানা। নিস্পন্দ চোখের কোণ দিয়ে জল গড়াচ্ছে—সমস্ত মুখখানি নিপুণ ভাস্করের গড়া মূর্তির মত স্থির। সামনে দাঁড়িয়ে রাম বসু অথচ চোখে পড়ছে না, দৃষ্টি হারিয়ে গিয়েছে কোন্ অলক্ষ্য দিগন্তে।
কি হল রে রেশমী, কাঁদছিস কেন?
কে উত্তর দেবে? উত্তর দেবার মালিক যে মন সে আজ কোন্ অগম গহনে পৃথ ভুলেছে। বিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে থাকে রাম বসু-দুইজনে মুখোমুখি নির্বাক।
হঠাৎ সম্বিৎ পেয়ে রেশমী বলে ওঠেকায়েৎ দা যে, এখন এলে?
রাম বসু ব্যাখ্যার মধ্যে যায় না, বলে-ব্যাপার কি রে, কাঁদছিস কেন?
ঐ প্রশ্নে চোখের জল আবার দ্বিগুণ বেগে নামে।
রাম বসু বিরক্তির সুরে বলল, কেন কাঁদছিস যদি না বলিস, তবে থাক, আমি চললাম!
ওঃ, বলি নি বুঝি? কায়েৎ দা, আজ সকালে মিস এলমার মারা গেছে।
বলিস কি রে, চমকে ওঠে বসুজা। বলে, হঠাৎ?
ঠিক হঠাৎ নয়, কিছুদিন থেকে শরীর খারাপ চলছিল। প্রায়ই আমাকে বলত, রেশমী বিবি, আমি আর বেশিদিন বাঁচব না।
ওসব কথা বললে আমি আর তোমার কাছে ঘেঁষব না।
মিস এলমার বলত, তাই বলে মনে কর না যে তোমার দৃষ্টান্ত যম গ্রহণ করবে প্রতিদিন সে একটু একটু করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।
বুঝলে কায়েৎ দা, প্রায়ই এমনি কথাবার্তা হত আমাদের মধ্যে।
শেষে কি হয়েছিল বল।
এমন কিছুই নয়, দুইদিন আগে সামান্য জ্বর-কালকে জ্বর বিকারে পরিণত হল, আজ সকালে সব শেষ হয়ে গেল।
রাম বসু বলল, মিঃ স্মিথ খুব দুঃখিত হয়েছে নিশ্চয়?
একবারে ভেঙে পড়েছে, তার সবতাতেই বাড়াবাড়ি।
বলিস কি রে, ভালবাসে, দুদিন বাদে বিয়ে হবে, এমন সময়ে এই কাণ্ড, ভেঙে পড়বে না তো কি?
ভালবাসে না ছাই, মিস এলমার ওকে দুচক্ষে দেখতে পারত না।
কিন্তু আমাকে যে স্মিথ বলেছিল কবচের ফল ফলেছিল!
এই তো ফল দেখলে। তাছাড়া যে পুরুষ কবচ-তাবিজ করে তাদের এমনিটিই হয়ে থাকে, এমনিটিই হওয়া উচিত।
বেশ একটু চাপা ঝাজের সঙ্গে কথাগুলো বলে রেশমী। রাম বসু বুঝতে পারে তার ঝাঁজের কারণ।
এ যে আর এক সমস্যা হল।
কেন?
এখন থাকবি কোথায়?
লেছি রাসেল এখানেই থাকতে বলেছে আমাকে; বলেছে, তুমি আর কোথায় যাবে, যতদিন আমরা আছি এখানে থাক।
যাক, নিশ্চিন্ত হলাম, নইলে কাল আমার যাওয়া হত না।
কাল আবার কোথায় চললে?
শ্রীরামপুরে, কেরী সাহেব ডেকে পাঠিয়েছে।
ওরা কি সব শ্রীরামপুরে এসেছে?
নইলে আর আমাকে ডেকে পাঠাবে কেন?
তবে কি এখন ওখানেই স্থায়ীভাবে থাকবে?
আমার পক্ষে যতখানি স্থায়ী হওয়া সম্ভব।
কিন্তু নরুর কষ্ট হবে না?
ইতিমধ্যে ন্যাড়া এসে অন্নদার মৃত্যুসংবাদ জানিয়ে গিয়েছে।
রাম বসু বলে, মা মরলে কোন ছেলের কষ্ট না হয়?
তার উপরে তুমি আবার চললে!
মার অভাব কি বাপে দূর করতে পারে? থেকেই বা কি করব?
রাম বসুর ঘুম আসতে চায় না, ঘুরে ঘুরে রেশমীর মুখ, রেশমীর চোখের জল মনে পড়ে। এতদিন রেশমীর স্মৃতি যদি বা একটু ঝাপসা হয়ে এসেছিল, অশ্রুধীত হয়ে তা আবার শতগুণ উজ্জ্বল হয়ে উদিত হল তার মনে। একটুখানি কলঙ্কিত না হলে চাঁদ বুঝি এত সুন্দর হত না।
শেষ রাতে একটু ঘুম এসেছিল, হঠাৎ একটা কোলাহলে ঘুম ভেঙে গেল রাম বসুর।
উঠানের মধ্যে সকলে একসঙ্গে তারস্বরে কথা বলছে, বিশেষ উৎসাহের কারণ ঘটে থাকবে। কৌতূহলী হয়ে বাইরে গিয়ে দেখা পাদ্রীদের মধ্যে ডাঃ টমাস দণ্ডায়মান। রাম বসু দেখল টমাসের পোশাক যেমন ছিন্ন তেমনি মলিন, চেহারাও তৎ, উপরির মধ্যে সঙ্গে একটি জরাজীর্ণ মধ্যবয়স্ক বাঙালী হিন্দ।
এই যে মুন্সী, তুমিও এসেছ, আহা প্রভুর মন্দির পূর্ণ হয়ে উঠল–বলে ছুটে এসে টমাস জড়িয়ে ধরে রাম বসুকে।
তার পর, ভাল ছিলে তো ডাঃ টমাস?
খুব ভাল। আনন্দে ছিলাম।
এতদিন ছিলে কোথায়?
বীরভূমে সরুল নামে একটা গ্রাম আছে সেখানে।
সেখানে কি গির্জা আছে নাকি?
কোম্পানীর প্রত্যেক কুঠিটাই যে একটা গির্জা। ওখানকার কুঠিয়াল মিঃ চীপ বড় সদাশয় ব্যক্তি।
সঙ্গে ওটি তোমার চাকর নাকি?
আমার চাকর কোথায়? প্রভুর চাকর। ওর নাম ফকির। ও হচ্ছে ‘খ্রীষ্টের খোয়াডে প্রবেশেছু একটি মেষ।’
বেশ বেশ, বড় আনন্দের কথা, বলে মুন্সী।
ওকে খ্রীষ্টমন্ডলীভুক্ত করে প্রথম খ্রীষ্টান করবার গৌরব লাভ করব আমি।
দেখা যাবে তুমি কত বড় বাহাদুর! মনে মনে বলে রাম বসু।
ইতিমধ্যে কেরী, মার্শম্যান, ওয়ার্ড, ফাউন্টেন প্রভৃতি সকলে একে একে সরে পড়েছে, তার কারণ টমাসের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস প্রত্যেকের একবার করে শোনা হয়ে গিয়েছিল, পুনরায় শোনবার আগ্রহ আর কারও ছিল না।
