শ্রীরামপুরে গেলে কতকাল আর রেশমীর সঙ্গে দেখা হবে না ভেবে সে তখনই রওনা হয়ে গেল রাসেল সাহেবের কুঠির দিকে কোথায় যাচ্ছে জানাল না টুশকিকে। রাম বসু জানত রেশমীর স্মৃতি ছোট্ট একটি কাঁটার মত বেঁধে টুশকির বুকে। রাম বসু ভাবে, অকারণে দুঃখ দিয়ে কি লাভ!
৩.১১-১৫ শ্রীরামপুরে পুনর্মিলন
শ্রীরামপুরে ঘাটের কাছেই ‘ডেনমার্ক টাভার্ন’। কেরী সেখানে খোঁজ করতে রাম বসুকে লিখেছিল। ডেনমার্ক টাভানে পৌঁছতেই কেরী দৌড়ে এসে রাম বসুকে ধরল, ওয়েলকাম মুন্সী, ওয়েলকাম। আমি জানতাম তুমি আসবেই।
কেরী উৎসাহে চীৎকার করে ডাকে, মিঃ মার্শম্যান, মিঃ ওয়ার্ড, শীগগির এস, আমাদের বন্ধু মিঃ বসু এসেছে।
কেরীর আহ্বানে পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ওয়ার্ড আর মার্শম্যান।
তার পরে পরিচয়, করমর্দন ও সৌজন্যের পালা শুরু হয়। রাম বসু দেখে ওয়ার্ড আর মার্শম্যান দুজনেরই বয়স অল্প, ত্রিশের দু-চার বছরের উপর, তার অধিক নয়।
কেরী বলে, মুন্সী, আমি তোমার সবিশেষ পরিচয় এদের দিয়েছি, এদের পরিচয় দিই।
তার পরে একটু থেমে বলে, এদের পরিচয় মুখে আর দেব কি-ক্রমে প্রকাশ পাবে। এদের আগমনে আমার শক্তি শতগুণ বেড়ে গিয়েছে, আমরা জোর কদমে ছাপখানার কাজ শুরু করে দিয়েছি।
রাম বসু শুধায়, কিন্তু তোমরা কলকাতা থাকতে শ্রীরামপুরে আস্তানা গাড়লে কেন? এ সব কাজের জন্য কলকাতাই প্রশস্ত।
তাই তো ইচ্ছা ছিল এদের, কিন্তু মাঝখানে এক ভ্রান্তিবিলাস ঘটে যাওয়ার এখানে বাস করা ছাড়া আর গত্যন্তর রইল না।
এমন কি ভ্রান্তিবিলাস ঘটতে পারে যাতে এমন হওয়া সম্ভব?
তবে খুলে বলি, বলে কেরী।
এদের জাহাজ কলকাতায় পৌঁছবার আগে সেখানকার কাগজে ছাপা হল যে, কয়েকজন প্যাপিস্ট পাদ্রী আসছে। লেখা উচিত ছিল ব্যাপটিস্ট কিন্তু লেখা হয়ে গেল ‘প্যাপিস্ট’!-কি না পোপের চেলা, রোমান ক্যাথলিক। তুমি নিশ্চয় জান যে, কলকাতার খ্রষ্টীয় সমাজ প্রোটেস্টান্ট খ্রীষ্টান, রোমান ক্যাথলিক গুরু পোপের চেলাদের বড় ভয় তাদের। তখনই সরকারী হুকুম বের হল যে, ওরা যেন কলকাতায় নামতে না পারে। অগত্যা তাদের নামতে হল শ্রীরামপুরে। এ শহর ইংরেজ কোম্পানির অধীন নয়, ডেনমার্কের রাজার রাজত্ব। এখানকার খ্রীষ্টীয় সমাজ সাদরে এদের বরণ করে নিল।
কিন্তু এই সামান্য ভুল কি সংশোধন করা যায় না? শুধায় রাম বসু।
মুন্সী, ভুল বড় মারাত্মক বস্তু, আর সবচেয়ে মারাত্মক—ছাপার ভুল।
তার পরে একটু থেমে সকলের দিকে তাকিয়ে বলে, আমরাও ছাপাখানা খুলেছি, আর ছাপাখানার দৈত্যদানবদের—আমরাই ছাপাখানার দৈত্যদানব-বলে দিয়েছি, দেখো সাবধান, তোমরা এক মারাত্মক ছাপার ভুলের শহিদ, তোমরা যেন আবার ভুল ছেপে বোসো না।
সকলে হো হো করে হেসে ওঠে।
এমন সময়ে মার্শম্যান বাইরের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ওই যে একটি ক্ষুদে দৈত্য আসছে।
এক গেলি ভিজে প্রফ হাতে প্রবেশ করে ফেলিক্স কেরী, এই প্রফটা এখনই দেখে দিতে হবে।
কেরী ছোঁ মেরে প্রফটা কেড়ে নিয়ে তন্ময় হয়ে যায়।
মুন্সী এগিয়ে এসে ফেলিক্সের করমর্দন করে জিজ্ঞাসা করে, তার পর মাস্টার কেরী, কেমন আছ?
খারাপ থাকবার উপায় কি! দিনরাত্রি আমি আর মিঃ ফাউন্টেন কাজের মধ্যে ডুবে রয়েছি।
কি ছাপছ?
‘মথীয়ের লিখিত সুসমাচার।’
ওটা কবে শেষ হল?
তুমি চলে আসবার পরে বাবা একাই শেষ কবেছে।
তোমার পিতার তুলনা হয় না মাস্টার কেরী।
প্রুফ নিয়ে ফেলিক্স ফিরে যেতে উদ্যত হলে রাম বসু বলল, চল তোমার সঙ্গে গিয়ে ছাপাখানার কাজ কেমন হচ্ছে দেখি গে। আর অমনি মদনাবাটি ত্যাগের পরেকার ইতিহাসটুকুও শুনে নেওয়া যাবে।
বেশ তো, চল, বলে ফেলিক্স, কাছেই ঐ বাড়িটা আমাদের ছাপাখানা।
ওদের যেতে দেখে কেরী বলে, মুন্সী, এক মিনিট দাঁড়াও।
তার পরে বলে, মুন্সী, তুমি আজ এই মুহূর্ত থেকে আমাদের মিশনের কাজে নিযুক্ত হলে, বেতন ত্রিশ টাকা। কেমন, রাজী তো?
রাম বসু বলে, ডাঃ কেরী, কবে আমি তোমার কথার অন্যথাচরণ করেছি।
ওরা দুজনে বেরিয়ে যায়। কেরী মার্শম্যান আর ওয়ার্ডকে বলে, মুন্সীর সঙ্গে পরিচয় হলে দেখবে পাণ্ডিত্যে, বাগ্মিতায়, নিষ্ঠায় ওর দোসর নেই হিন্দুস্থানে।
তুমি তো চলে এলে মুন্সী, কেন চলে এলে আজও জানতে পারলাম না, তার পরে শুরু হল বিপদ, একটার পরে একটা।
বিগত কাহিনী বলে যায় ফেলিক্স। প্রথমে বাংলা পাঠশালাটি গেল ভেঙে, হিরুর মা একদিন রাতে বাসনকোসন চুরি করে পালাল—সেই সঙ্গে পালাল কুঠির আমলা গোমস্তার দল তবিল ভেঙে। এদিকে মার পাগলামি আরও বাড়ল, ওদিকে উড়নী সাহেব নোটিশ দিল কুঠি দেবে উঠিয়ে। আমি বাবাকে বললাম, চল যাই কলকাতায় ফিরে। বাবা কি বলে জান মুন্সী? সে বলল, জীবন-যুদ্ধে এক পা হটলে আর কখনও এগোনো সম্ভব হয় না। বাবা বলল, এইটুকু অসুবিধেয় পড়ে যদি কলকাতায় ফিরি, তবে কলকাতায় অসুবিধা দেখলে শেষ পর্যন্ত বিলেত ফিরে যেতে ইচ্ছা হবে। না ফেলিক্স, তা হয় না।
মুন্সী তন্ময় হয়ে শোনে, বলে, কথাটা মিথ্যা নয় ফেলিক্স, শেষ পর্যন্ত হটবার ইচ্ছা না থাকলে কেউ প্রথম ধাপ পিছোয় না।
এমন সময়ে মিঃ ফাউন্টেন এল, তার সহায়তায় বাবা কলকাতা থেকে কিনে আনল চল্লিশ পাউণ্ড দিয়ে একটা মুদ্রাযন্ত্র। ঠিক সেই সময়ে গেল কুঠি উঠে, সবাই মিলে চলে এলাম খিদিরপুর নামে নিকটবর্তী এক গ্রামে। সেই ছাপাখানায় যেদিন প্রথম শীট ছাপা হল, পাঁচ গাঁয়ের লোক পড়ল ভেঙে, কলে বই ছাপা হয়। ওদের বিস্ময়ের অন্ত থাকে না। উপলক্ষটা নিয়ে গায়ের লোক একটা গান বেঁধে ছিল, এখনও দু-একটা কলি মনে আছে।
