টুশকির চোখ ছলছল করে উঠিল। টুশকির চোখে জল দেখে এতক্ষণে এই প্রথম জল এল রাম বসুর চোখে।
রাম বসুর কথাই যথার্থ, বড় বিচিত্র স্বভাব চোখের জলের।
সন্ধ্যা হয়ে এসেছিল, বাতি জ্বলল ঘরে, শাঁখ বাজল, কাঁসর-ঘণ্টা বাজল মদনমোহনতলায়। হঠাৎ রাম বসু বলে উঠল, টুশকি, আজ এখানে থাকব।
বিস্ময় চেপে রেখে টুশকি কুণ্ঠিত ভাবে বলল—আজ না থাকলে হয় না?
না না, আজই বিশেষ দরকার। হাঁরে, বোতলটায় কিছু আছে নাকি?
থাকবে কি করে? কতদিন আস নি!
আচ্ছা সে-ব্যবস্থা হবে এখন।
রাম বসুর মন ঘোরাবার আশায় আবার সে বলল, তুমি না গেলে নরুর খুব ফাঁকা লাগবে।
তার পিসি আছে, নেড়দা আছে, আমার অভাব সে অনুভব করবে না।
তারপর একটু থেমে বলল, আমার ফাঁক পূরণ করবার কে আছে বল!
এই বলে সবলে সে বুকের মধ্যে টেনে নিল টুশকিকে।
মৃত্যুর পরে মানুষের চৈতন্য যদি নির্মল ও সর্বব্যাপী হয় তবে অবশ্যই অন্নদা খুশি হত, এই মুহূর্তে তার স্বামীর আলিঙ্গনাবদ্ধ নারী টুশকি নয়, দেহান্তরে সে নিজেই, তার পরজন্মের আশা ফেলে-আসা জন্মে সার্থক হয়ে উঠল, পৃথুলারূপে সন্নিবিষ্ট হল সে স্বামীর বক্ষে।
রাত্রে আহারের পর টুশকি বলল, এবারে তোমার খুব অসুবিধা হবে কায়েৎ দা, তাই না?
রাম বসু বলল, এক কথায় এর কি উত্তর দেব বল!
এক কথায় না হয় নাই দিলে, বুঝিয়ে বল না।
তবে তাই বলি শোন্। অসুবিধা হবে এবং না।
টুশকি বলল, কথা একটার বেশি হল বটে, কিন্তু বুঝতে পারলাম না কিছু।
পারবি নে জানি, বুঝিয়ে দিচ্ছি। স্ত্রী স্বামীকে টেনে রাখে কিসের জোরে ব তো?
ভালবাসার জোরে।
ওটা বোকা মেয়ের মত কথা হল। হ্যাঁ, ভালবাসা দিয়ে পুরুষের মনের দরজাটা খোলে বটে, কিন্তু ঐ পর্যন্ত।
টুশকি শুধায়, তার পরে?
তারপরে অশিক্ষিত-পটুতায় ধীরে ধীরে তিলে তিলে দিনে দিনে স্বামীর ছোটখাটো দৈনন্দিন অভ্যাসগুলো জেনে নিয়ে, তার অজ্ঞাতসারে সেগুলো পূরণ করে তাকে অসহায় করে তোলে। সময়মত গাড়-গামছা এগিয়ে দেওয়া, সময়মত দাঁতনটি ভেঙে দেওয়া, স্নানের তেল, স্নানের পরে ধুতি, আহারের সময়ে বিশেষ পছন্দের ব্যঞ্জন হাতে তুলে দিয়ে দিয়ে নিজের উপর নির্ভরশীল করে তোলে স্বামীকে। সহস্র অভ্যাসের সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বিনা সূতায় বাঁধা পড়ে বনের বিহঙ্গ, তখন খাঁচার দরজা খোলা পেলেও আর বাইরে যেতে মন সরে না তার। যে স্ত্রী স্বামীর অজ্ঞাতসারে এই কাজটি করতে পারে সে সাধী, যে স্বামী অনায়াসে এই অবস্থায় আত্মসমর্পণ করে সে সুখী।
আর ভালবাসা? শুধায় টুশকি।
ওরে হাবা মেয়ে, ভালবাসার প্রাণ বড় দুর্বল, তার পাখা আছে পা নেই, সংসারে তার মত অসহায় আছে অল্পই।
তবে যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালবাসার কথা শুনি!
অশ্বত্থামার দুধ বলে পিটুলি খাওয়ার কথা কি শুনিস নি?
চুপ করে থাকে টুশকি।
চুপ করে রইলি যে বড়?
সবই তবে ভুল?
কিছুই ভুল নয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অভ্যাসের বশ্যতার ঐ সম্বন্ধটাই বা তুচ্ছ কি!
কিন্তু আসল প্রশ্নের তো উত্তর পেলাম না, তোমার সুবিধা-অসুবিধার কথা বল।
আমি চিরকাল দূরে দূরে থেকেছি, অভ্যাসের দাস হয়ে পড়ি নি, সেই জন্যই তার রাগের অন্ত ছিল না আমার উপরে, কাজেই সেদিক থেকে আমার অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
তবে?
তবে আর কি! এতদিন দেখছিস আমাকে, বুঝতে পারিস নি? আমি নিজের দুঃখ এক রকম করে সইতে পারি কিন্তু সেই দুঃখটা অপরের ঘাড়ে পড়তে দেখলে অসহ্য বোধ হয়। ছেলেটার কান্নাকাটি, ঘরদোরের খাঁ খাঁ ভাব-অসুবিধা ঐখানে।
কায়েৎ দা, তুমি বড় পাষাণহৃদয়।
সেকথা একেবারে মিথ্যা নয়। সংসারে আমার মন থাকলে এতদিনে দুঃখ-দুর্দৈবের ভারে ভেঙে পড়তাম।
তবে তোমার মন কোথায়?
খানকতক বই পেলে সব ভুলে যাই। বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে শোভাবাজারের রাজবাড়ির গ্রন্থাগারে গিয়ে টুকি-এক মুহূর্তে সব ভুলে যাই।
প্রসঙ্গ বন্ধ করবার আশায় টুশকি বলল, বেশ কর ভুলে যাও, এখন দয়া করে ঘুমোও দেখি।
রাত অনেক হল, না?
হল বই কি।
শোন, এখন দিনকতক তোর বাড়িতেই থাকব। পাড়াপড়শীদের ঘ্যান ঘ্যান বড় অপছন্দ করি।
ভালই তো, থেকো।
.
পরদিন বিকালে ঘুরে এসে রাম বসু বলল, তোর এখানে থাকা হল না টুশকি।
হঠাৎ আবার মত বদলাল কেন?
কেরী সাহেবের চিঠি পেয়েছি, অবিলম্বে দেখা করতে লিখেছে।
আবার মালদ যাবে?
মালদ কোথায়, সাহেবরা চলে এসেছে শ্রীরামপুরে।
কিন্তু এমন জোর তাগিদ কেন?
সেটা গিয়ে শুনব।
আসবে কবে?
গিয়ে পৌঁছবার আগে তা বলি কেমন করে?
কবে রওনা হচ্ছ?
আগামীকাল, আর দেরি নয়।
টুশকি দুঃখ করে বলল, নরু তাহলে একেবারে একলা পড়ল!
একলা কেন, ন্যাড়া রইল, দুটিতে বেশ মিলেছে।
তোমার সংবাদ পাব কি করে?
পাবি নে বলে ধরে রাখ, পাস্ তো ভাল। ন্যাড়াকে বলে দিয়েছি মাঝে মাঝে এখানে এসে দেখা করে যেতে।
আজকের রাতটা তো এখানে থাকছ?
আর কোথায় থাকব বল!
কেরীর আকস্মিক আমন্ত্রণে সত্যই খুব আনন্দিত হয়েছিল রাম বসু, স্ত্রী-বিয়োগের দুঃখদায়ক পরিস্থিতি থেকে দূরে যাওয়া সম্ভব এটা প্রধান কারণ হলেও আরও কারণ আছে। কেরীর জ্ঞানচর্চার আবহাওয়া তার জীবন-ধারণের পক্ষে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল। কলকাতায় সেই অভাবটাই তাকে পীড়িত করছিল প্রতি মুহূর্তে। অবশ্য কেরীর চিঠিতে যতই আনন্দিত হক, সে বিস্মিত হয় নি একটুও; সে জানত অচিরে কেরীর আহ্বান এসে পৌঁছবেই, সে বুঝে নিয়েছিল কেরীর পক্ষেও সে সমান অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
