বেশ, তাই হবে, বলে বসুজা।
শুনেছি তোমাদের Shastras-এ yogic rites দ্বারা অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়?
শাস্ত্রগৌরবে স্ফীতবক্ষ রাম বসু সংক্ষেপে বলল, যায়ই তো। কিন্তু সে যে ব্যয়-সাপেক্ষ।
ব্যয়ে আমি কুণ্ঠিত নই। তুমি একটু চেষ্টা করে ঐ জঙ্গী সেপাই বেটাকে কাত করে দাও। লোকটা পাওয়ারফুল, কিন্তু শুনেছি তোমাদের Coligot-এর (কালীঘাট) Coli (কালী) একবারে অলমাইটি!
নিশ্চয়। বলে কালীর প্রাপ্য সম্মান আত্মসাৎ করে নেয় রাম বসু।
তুমি শীঘ্র ব্যবস্থা কর।
তুমি চিন্তা কর না জন, আমি কালকেই yogic rites-এর সবচেয়ে বড় এক্সপার্টের সঙ্গে দেখা করব—তার ক্রিয়ায় মানে ফাংকশনে হাতে হাতে ফল মানে হ্যান্ড টু হ্যাঙ ফুট পাওয়া যায়।
তবে তাই ক’র মুন্সী, আপাতত এই নাও, বলে মুন্সীর হাতে কিছু টাকা খুঁজে দিল জন।
দেখ না জন, তোমার রাইভ্যাল ব্রাদার-ইন-ল-কে কেমন জব্দ করি!
ও কি মুন্সী, তুমি গোড়াতেই বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করলে?
কেন? সত্যিই বিস্মিত হয় মুন্সী।
ওই মোস্ট এনডিয়ারিং টার্মটা ব্যবহার করলে ঐ গোয়ারটা সম্বন্ধে!
রাম বসু বুঝল তার ব্যাখ্যাতেই ভুলের মূল; বলল, আই অ্যাম সরি! ভুল হয়ে গিয়েছে।
নেভার মাইণ্ড ম্যান! এখন মিস এলমারের ভাই শীঘ্র যাতে আমার ব্রাদার-ইন ল হতে পারে তার ব্যবস্থা করে দাও। ওটার বাংলা কি যেন বললে?
শালা।
Sa-la! Fine! Il tastes as sweets as Miss Aylmer! Sa–la! আস্নন জয়ের সুনিশ্চিত সম্ভাবনায় সে এমনি উল্লসিত হয়েছিল, স-সোড়া ব্র্যান্ডিতে দুটি গেলাস পূর্ণ করে একটি বসুজার হাতে তুলে দিয়ে বলল, মুন্সী, বিদায় নেবার আগে—let us drink to the honour of Eternal, Universal, Ever-present, All-powerful–
রাম বসু বলল, ব্রাদার-ইন-ল!
জন বলল, নো, নো, বাংলা শব্দটা অনেক বেশি মিষ্টি, সা–লা!
তখন দুজনে সমকাণ্ঠে উচ্চারণ করল, শা–লা।
অগ্নিময় পানীয় যথাস্থানে পৌঁছল।
বিদায় নেবার মুখে রাম বসু বলল, উদ্বিগ্ন হয়ে না জন, আমি কালই এক্সপার্ট ওপিনিয়ন নেব-হ্যাঙ টু হ্যাণ্ড ফ্রুট।
জন বলল, নাঃ, এই খ্রীষ্টধর্মে কিছু নেই। কাল থেকেই আমি যাতায়াত শুরু করব “হিন্দু স্টুয়ার্ট”-এর কাছে।
৩.০৬-১০ রূপচাঁদ পক্ষী
পরদিন সকালে পটলডাঙায় রূপচাঁদ পক্ষীর আজ্ঞায় গিয়ে উপস্থিত হল রাম বসু।
রূপচাঁদ পক্ষীর পিতৃদত্ত নাম সনাতন চক্রবর্তী বা ঐরকম একটা কিছু। মহাপুরুষগণের জীবনে প্রায়ই দেখা যায় যে, স্বোপার্জিত পরিচয়ের তলে কৌলিক পরিচয় চাপা পড়ে যায়—এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটে নি। স্বোপার্জিত রূপচাঁদ পক্ষী পৈতৃক সনাতন চক্রবতীকে চাপা দিয়ে লুপ্ত করে দিয়েছে।
সেকালে যে-সব মহাপুরুষ একাসনে বসে একশ আট ছিলিম গাঁজা খেতে পারত তারা একখানা করে হঁট পেত। এইভাবে উপার্জিত হঁটে বাসভবন নির্মাণ করতে পারলে পক্ষী পদবী পাওয়া যেত। তখনকার কলকাতায় দেড়জন পক্ষী ছিল। পটলডাঙায় রূপচাঁদ পক্ষী আর বাগবাজারে নিতাই হাফ পক্ষী। হাফ পক্ষীর অর্থ এই যে, বাড়ীর চার দেয়াল গড়বার পরে হঠাৎ সাধনোচিত ধামে প্রয়াণ করে নিতাই, তাই লোকে তাকে হাফ পক্ষী বলত। বস্তুত রূপচাঁদই একমাত্র পক্ষী। নিতাই-এর কথা উঠলে রূপচাঁদ দুঃখ করে বলত, ছোকরার এলেম ছিল, অকালে না মরলে একটা আস্ত পক্ষী হতে পারত। তার পরে ভবিষ্যতের জন্য খেদ করে বলত, এসব প্রাচীন প্রথা তো একরকম উঠেই গেল, আমার কত-দু-চারজন মরলেই সব ফরসা। এখনকার ছেলেরা সব গোঁফ না উঠতেই ‘এলে’ ‘বেলে’ পড়ে, ফিরিঙ্গির বেনিয়ান মুচ্ছুদি হতে যায়—কৌলিকপ্রথা রক্ষায় আর কারও আগ্রহ নেই। দিনে দিনে কি হতে চলল, অ্যাঁ! বলে সে ছিলিমের সন্ধান করে।
যাই হক, রূপচাঁদের ভরসা ছিল যে, তার জীবনকালে এ প্রথা লুপ্ত হতে সে দেবে না–বলা বাহুল্য, প্রতিজ্ঞা সে রক্ষা করেছিল।
শহরের বহু সন্ত্রান্ত ঘরের উঠতি বয়সের ছোকরা রূপচাঁদ পক্ষীর আজ্ঞায় নিয়মিত যাতায়াত করত—আর সেখানে যে শাস্ত্রচর্চা করত না তা বলা নিষ্প্রয়োজন। পাদ্রীদের সঙ্গে জোটবার আগে এক সময়ে রাম বসুও যাতায়াত করত তার আড্ডায়, সেই সূত্রে পরিচয়। রাম বসু জানত যে, মুখ্য গুণের আনুষঙ্গিক আরও অনেক গুণের অধিকারী রূপচাঁদ পক্ষী। তুকতাক মন্ত্রতন্ত্র তাবিজ-কবচ, ঝাড়ফুক এবং তান্ত্রিক ক্রিয়াকর্মে তার বিপুল অভিজ্ঞতা। বস্তুত তার ভরসাতেই রাম বসু জনের অনুরোধ স্বীকার করেছিল।
রাম বসু রূপচাঁদ পক্ষীর দরজায় ধাক্কা দিতে ভিতর থেকে ভাঙা গলায় কর্কশস্বরে ধ্বনি হল—ক্যা,–ক্যা, বলি এত সকালে ক্যা হে!
দরজা খুলুন পক্ষীমশাই, চেনা লোক।
দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল একটি মূর্তি। দীর্ঘ কঙ্কাল, হাঁটু পর্যন্ত মলিন ধুতি, পায়ে খড়ম, খালি গা, জীর্ণ উপবীত, অত্যুজ্জ্বল কোটরগত চক্ষু, মুখমণ্ডলের বাকি অংশ গাল, কপাল, চিবুক প্রভৃতি—অজস্র বলিচিহ্নিত, চুল সাদা, খোঁচা খোঁচা দাড়িগোঁফও সাদা; বয়স পঁয়ত্রিশও হতে পারে আবার পঁচাত্তর হতেও বাধা নেই।
প্রণাম পক্ষীমশায়।
ঠাহর করে দেখে নিয়ে গলায় ভাঙা কাঁসর বাজিয়ে বলল পক্ষী, ক্যা, বসুজা যে! অনেক দিন পর, হঠাৎ চিনতে পারি নি। তার পর, ভাল তো? বস বস।
জীর্ণ তক্তপোশের উপরে দুজনে পাশাপাশি বসল।
