অবাক হয়ে নীরবে তাকিয়ে থাকা অভদ্রতা, কিছু বলতে হয়—জন বলল, রেশমী বিবি, তুমি খুব সুন্দরী।
কথাটা শুনে আমি অবশ্যই খুব খুশি হলাম কিন্তু মিসি বাবার কানে গেলে কি সে সে-রকম খুশি হবে?
কেন, ক্ষতি কি?
লাভ ক্ষতি সে বুঝবে।
যাই হক, তার কান তো এখানে নেই।
আমিই না হয় কানে কথাটা তুলব।
খানিকটা আন্তরিকভাবে, খানিকটা খুশি করবার অভিপ্রায়ে জন বলল-তুমি খুব বুদ্ধিমতি।
এসব গুণ আজ হঠাৎ আবিষ্কার হল নাকি?
সে কথার উত্তর না দিয়ে জন বলল, এ রকম ইংরেজী উচ্চারণ দেশী মেয়েদের মুখে শুনি নি।
দেশী মেয়েদের সঙ্গে খুব মেলামেশা আছে বুঝি?
রেশমী বিবি, তোমার বাকপটুতা অসাধারণ।
এমন সময়ে মিস এলমার ঘরে প্রবেশ করল।
জনের ভয় হল পাছে মেয়েটা সব প্রকাশ করে দেয়।
মিস এলমার শুধাল, কখন এলে?
জন উত্তর দেবার আগেই রেশমী বলল, এইমাত্র।
সে বুঝল রেশমী কিছু প্রকাশ করবে না। তার প্রশংসার মনোভাবের সঙ্গে কৃতজ্ঞতা যুক্ত হল।
এইসব স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে ঘুমিয়ে পড়ল রেশমী। স্বপ্ন দেখল আকাশে তিনটি তারা জ্বলজ্বল করছে, ভাল করে তাকিয়ে দেখলে তিনটি তারায় তিনটি মুখ, মিস এলমার কর্নেল রিকেট আর জন স্মিথ—তিনজনের। এমন সময়ে দেখল জন স্মিথের তারাটি খসে পড়ল। ও কি, তারাটা জানলার দিকেই ছুটে আসছে যে! জানলার বাইরে এসে জন থামল।
ওখানে থেমে রইলে কেন? ভিতরে এস।
না না, মিস এলমার আছে!
তবে এসেছিলে কেন?
তুমি খুব সুন্দরী এই কথাটি বলতে।
রেশমীর ঘুম ভেঙে যায়। তার কানে সঙ্গীতের মত বাজতে থাকে-রেশমী, তুমি খুব সুন্দরী রেশমী, তুমি খুব সুন্দরী।
যে মেয়ে ঐ কথাটি কখনও কোন পুরুষের মুখে শোনন নি, তার নারীদেহ-ধারণ বৃথা। কিন্তু তেমন মেয়ে কি সত্যই আছে?
রেশমী শয্যা ত্যাগ করে উঠে আয়নার সম্মুখে দাঁড়াল—স্বপ্নের শিশির পড়ে মুখখানি অলৌকিক হয়ে উঠেছে। সে একবার চুলটা আঁচড়ে নিয়ে, বালিসে দীর্ঘশ্বাস চেপে শুয়ে পড়ল।
তখনও ভোর হতে অনেক বিলম্ব।
.
৩.০৫ সুরা-সাম্য
রাম বসু বাড়ি ফিরে চলেছে, এমন সময় শুনতে পেল কে যেন পিছন থেকে ডাকছে, মিঃ মুন্সী, মিঃ মুন্সী!
কে ডাকে? পিছন ফিরে দেখে যে মিঃ স্মিথ দ্রুতপায়ে তার দিকে আসছে।
মিঃ স্মিথ যে, গুড ইভনিং! তার পর-খবর কি?
গুড ইভনিং। এদিকে কোথায় এসেছিলে?
অনেকদিন রেশমীকে দেখি নি তাই একবার দেখে এলাম। তোমার সঙ্গেও অনেকদিন পরে দেখা, আশা করি সব কুশল।
এক রকম কুশল বই কি। মিঃ মুন্সী, তোমার কি খুব তাড়া আছে?
আমার কখনও তাড়া থাকে না। যে-কাজটা সম্মুখে এসে পড়ে তখনকার মত সেটাই আমার একমাত্র কাজ।
এখন কি কাজ তোমার সম্মুখে?
বাড়ি ফিরে যাওয়াটাই কাজ।
আর ধর আমি যদি একটু গল্পগুজব করতে অনুরোধ করি?
তখন সেটাই হবে একমাত্র কাজ।
তুমি incomparable, মিঃ মুন্সী।
আমারও তাই বিশ্বাস।
দুইজনে একসঙ্গে হেসে উঠল।
জন বলল, চল না, কাছেই আমাদের বাড়ি, একটু গল্পগাছা করা যাক, রাত তো এমন হয় নি।
রাম বসু বুঝল গরজ কিছু বেশি, নইলে কোন শ্বেতাঙ্গ এমন করে কৃষ্ণাঙ্গকে বাড়িতে আহ্বান করে না।
চল, ক্ষতি কি!
বাড়ি পৌঁছে লিজাকে বলল, মিঃ মুন্সীকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে আমি একটু স্কলারলি ডিসকাশন করছি, এখন যেন কেউ না আসে, দেখো।
লিজা হেসে বলল, কেউ যাবে না। তবে ব্রাঙি সোড়া পাঠিয়ে দেব কি? শুনেছি স্কলারলি ডিসকাশনে ও দুটো বস্তু অপরিহার্য।
জন হেসে বলল, মিথ্যা শোন নি, দাও পাঠিয়ে।
সোডার সঙ্গে উপযুক্ত মাত্রায় মিশ্রিত ব্র্যান্ডির মহৎ গুণ এই যে ওতে বয়স বিদ্যা লিঙ্গ জাতি বর্ণ ভাষা প্রভৃতি লৌকিক গুণ অতি সত্বর লোপ পায়। এখানেও তার অন্যথা ঘটল না। অল্পক্ষণের মধ্যেই জনের সাদা চামড়া কটা ও মুন্সীর কালো চামড়া ফিকে হতে মৈত্রী সীমান্তে এসে ঠেকল—তখন মুখোমুখি হল দুটিমাত্র মানুষ; বয়স, বর্ণ বিদ্যা ইত্যাদির তুচ্ছ পার্থক্য বেঙাচির লেজের মত গেল খসে।
মুন্সী, ইউ আর এ জলি গুড ফেলো।
সো আর ইউ, জন।
দেখ মুন্সী, তোমাদের হিঙু রিলিজ্যান অতি আশ্চর্য বস্তু।
সেই রকম ধারণাই ছিল, কিন্তু পাদ্রী ব্রাদাব-ইন-ল’দের সঙ্গে পরিচয় হয়ে অবধি হতমান হয়ে আছি।
আচ্ছা মুন্সী, তুমি পাদ্রীদের ব্রাদান-ইন-ল বললে কেন?
বাংলা ভাষার ওটা সবচেয়ে আদরের শব্দ।
ইনডীড! কি ওটার বাংলা?
শালা।
জন উচ্চারণ করে, সালা। চমৎকার, fine-sounding word! Sala, Sa la, তার পর নিজ মনেই বলে উঠল, How I wish Miss Ayimer’s brothers were my S-ala!
হবে জন, হবে। দুঃখ করো না।
আবেগ-কম্পিত কণ্ঠে জন জিজ্ঞাসা করে—কেমন করে জানলে মুন্সী?
ঐ যে হিন্দু রিলিজ্যানের কথা বললে না—তারই কৃপায়। আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে নেই এমন জিনিস নেই।
ইনডীড!
এখন তোমার একজন রাইভ্যাল জুটেছে।
কি করে জানলে মুন্সী?
প্রসঙ্গের উত্তর না দিয়ে মুন্সী বলে, লোকটা খুব মোটা।
আশ্চর্য!
লোকটা জঙ্গী সেপাই।
ঠিক কথা।
আপাতত মিস এলমার তার প্রতি অনুরক্ত।
জিজ্ঞাসা ও কান্নার মাঝামাঝি সুরে জন ফুকরে ওঠে, আমার কি হবে মুন্সী?
ঋষিবাক্যের গাম্ভীর্যে রাম বসু বলে, মিস এলমার তোমারই হবে।
ঋষিবাক্যের আশ্বাসে কতকটা নিশ্চিন্ত হয়ে জন বলে, তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকব মুন্সী, সেই ব্যবস্থাই করে দাও।
