সাড়া দেওয়া মাত্র রাম বসু বুঝল মস্ত ভুল হয়ে গিয়েছে, হয়তো তার জীবনের প্রকাঙতম ভুল। কিন্তু সেই সঙ্গে এই অপ্রত্যাশিত সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, টমাসের কণ্ঠস্বরে বাস্তবের কেন্দ্রে পুনঃসংস্থাপিত হয়ে—এই কদিনের উদ্ভ্রান্তি গেল তার দূর হয়ে, যেমন হঠাৎ উদভ্রান্তি কুয়াশায় ঢুকে পড়েছিল, আবার তেমনি হঠাৎ প্রখর প্রোজ্জ্বল কাণ্ডজ্ঞানের সূর্যালোকে এল ফিরে; লুপ্ত হয়ে গেল ক্ষণিকের প্রেমিক ভাবুক রোমান্টিক সত্তা, উঠল জেগে স্বভাবসিদ্ধ প্রত্যুৎপন্নমতি, শ্লেষরসিক, বাস্তববাদী রামরাম বসু।
মুন্সী, তুমি এত রাত্রে একাকী রেশমী বিবির ঘরে! এ যে দুর্বোধ্য!
ভিতর থেকে অবিচলিত কণ্ঠে রামরাম বসু উত্তর দিল, তার চেয়ে অনেক বেশি দুর্বোধ্য তত্ত্ব নিয়ে পড়েছি।
বুঝতে পারে না টমাস, বিস্মিত হয়ে শুধায়, কি সেই তত্ত্ব?
ভিতর থেকে রাম বসু বলে, ধর্মস্য তত্ত্বম্।
পুনরায় মূঢ়ের মত টমাস শুধায়, তা ওখানে কেন?
ভিতর থেকে উত্তর আসে, সে বস্তু যে নিহিতং গুহায়াম।
ওটা বোধ করি সংস্কৃত ভাষা, বুঝতে পারছি না, বুঝিয়ে বল।
সেটা মন্দ নয়, তবে শোন-The mystery of religion is hidden in the cave.
টমাস শুধায়, রিলিজ্যন তো বুঝলাম, কিন্তু মিষ্ট্রিই বা কি আর কেই বা কি?
আরে সেই তো অনুসন্ধান করছি। আমাদের শাস্ত্রে বলেছে গুহা অর্থাৎ কেভে সশরীরে না ঢুকলে সেই মিষ্ট্রির সাক্ষাৎ পাওয়া সম্ভব নয়।
বাস্তবিক আশ্চর্য তোমাদের শাস্ত্র! কিন্তু এত রাত্রে কেন?
রাত্রি কোথায়? বলে রাম বসু, আর তাছাড়া রাত্রিই তো গুহাবতরণের প্রশস্ত সময়।
শাস্ত্রের অনুশাসন হচ্ছে—”যা নিশা সর্বভূতানাং তস্যাং জাগতি সংযমী।”
অনুবাদ করে বোঝাও।
তবে শোন—When it is night to ghosts, সংযমী–কি না people like myself kecp up late.
বিস্ময়-উদ্বেল হয়ে ওঠে টমাসের মন। বলে, আশ্চর্য তোমাদের শাস্ত্র, সব কাজেই সমর্থন আছে!
তার পর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলে টমাস—কিন্তু একাকী রমণীর ঘরে পুরুষের প্রবেশ কি ঠিক?
তোমার এ প্রশ্নের উত্তরটাও শাস্ত্রের বচনে দিই–
এর সমর্থনও শাস্ত্রে আছে নাকি, বাপ রে বাপ—
কথার মাত্রা হিসাবে ‘বাপ রে বাপ’ বলা টমাসের অভ্যাস।
আছে বই কি। শাস্ত্রে বলেছে, “না স রমণ, ন হাম রমণী।” ডাঃ টমাস, পুরুষ রমণী ওসব দৃষ্টির ভ্রম।
তবে আসলে তোমরা কি?
জীবাত্মা আর পরমাত্মা। জীবাত্মা ভোগ করতে উদ্যত—
আর পরমাত্মা কি করছে?
আপাতত নারাজ।
এবারে গম্ভীর ভাবে টমাস বলে, মুন্সী, তোমার উদ্দেশ্য মহৎ আর পথটা না হয় শাস্ত্র-সম্মত কিন্তু যুবতী রমণীর সঙ্গে গভীর রাত্রে নিভৃত কক্ষে অবস্থান, এর মর্ম লোকে ভুল বুঝতেও পারে।
রাম বসু বলে, ডাঃ টমাস, শাস্ত্র মানলে শাস্ত্রের সকল বাক্যই মানতে হয়-যুবতী নারীই এই শ্রেণীর ধর্মসাধনার শ্রেষ্ট সহায়।
কিন্তু রেশমী কি সম্মত আছে?
আরে সেইখানেই তো গোল!
কেন?
কেন আর কি, ছেলেমানুষ! মিষ্ট্রি অব রিলিজ্যন যে হিডন ইন দি কেভ—তা স্বীকার করতেই চায় না।
কেন, ও কি শাস্ত্র জানে না?
জানে কিন্তু না-জানার ভান করছে।
তবে না হয় দরজাটা খুলে দাও, দুজনে মিলে চেষ্টা করি।
কি সর্বনাশ! এসব ক্ষেত্রে দুই গুরু অচল।
তবে তুমি একাই চেষ্টা কর।
তার পরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলে, সত্যি মুন্সী, তুমি খুব সৌভাগ্যবান, নতুবা মিস্ত্রি অব রিলিজ্যন বোঝাবার এমন মনোরম সুযোগ পেতে না। আমি কতবার চেষ্টা করেছি, সুযোগ পাই নি।
উপযুক্ত সাধনা চাই, সাহেব, উপযুক্ত সাধনা চাই।
টমাস বলে, মুন্সী, তত্ত্বটা বুঝলে রেশমী বিবি কি খ্রীষ্টান হতে রাজী হবে?
মুন্সী বলে, তখন খ্রীষ্টান হওয়া ছাড়া আর কোন গতি থাকবে ওর!
তবে বোঝাও মুন্সী, ভাল করে বোঝাও, তোমার সমস্ত শক্তি দিয়ে বোঝাও, প্রয়োজন হলে সারারাত ধরে বোঝাও।
তাই তো বোঝাচ্ছিলাম, হঠাৎ তুমি এসে পড়ে রসভঙ্গ করলে।
কিন্তু আমার কত সৌভাগ্য দেখ—এমন যে পবিত্র কর্ম চলছে, হঠাৎ এসে পড়ায় তা জানতে পেলাম।
বেশ তো, এখন সরে পড় না!
সে কথায় কর্ণপাত না করে টমাস শুধায়, আচ্ছা মুন্সী, তুমি কি আগেও ওকে মিস্ট্রি অব রিলিজ্যন বোঝাতে চেষ্টা করেছ?
না সাহেব, এই প্রথম।
আশা করি, এই শেষ নয়!
নিশ্চয়ই নয়, এখন কিছুদিন চলবে।
চলবেই তো, চলবেই তো—উৎসাহে বলে ওঠে টমাস সাহেব, এ সুযোগ পেলে কেউ সহজে ছাড়তে চায় না।
তার পরে শুধায়, কিছু সুবিধা করতে পারলে মুন্সী?
কিছু সুবিধা হবে মনে হচ্ছে।
টমাস ভক্তির আবেগে বলে ওঠে, নিশ্চয় হবে, নিশ্চয় হবে।
তার পরে আবার থেমে বলে, উপর-উপর না বুঝিয়ে একবারে গভীরে প্রবেশ করতে চেষ্টা কর।
তা নইলে আর বুঝিয়ে আনন্দ কি?
মুন্সী, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি ও-বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।
না হয়ে উপায় কি, অনেককাল তোমাদের সঙ্গ করছি।
এবারে টমাস ব্যাকুলভাবে বলে, মুন্সী, দয়া করে একবার দরজাটা খুলে দাও, আমি একবার পরমরমণীয় দৃশ্য দেখে প্রভুর নামকীর্তন কবি!
না না, এখন দরজা খোলা চলবে না, রেশমীর এমনিতেই খুব সঙ্কোচ। স্বীকার করে টমাস। বলে, তা আমি দেখেছি কিনা। বাইবেলের একটা সাধারণ গল্পেই ওর গাল লাল হয়ে ওঠে, আর এ তো গৃঢ়তম রহস্য। সঙ্কোচ হবে বই কি।
একটু থেমে বলে, মুন্সী, আমার যে ভগবানের নাম করতে ইচ্ছা করছে।
