রাম বসু কি উত্তর দেবে! সব এড়িয়ে যায়।
.
সেদিন রাতে ন্যাড়া, পার্বতীচরণ, গোলোক শর্মা সবাই গিয়েছে গাঁয়ের মধ্যে যাত্রাগান শুনতে। ডাকাডাকি সত্ত্বেও যায় নি সে, বিছানায় শুয়ে নিজের মনটাকে চিরে চিরে বিশ্লেষণ করে দেখছে ব্যাপারখানা কি ঘটল। তখন বাইরে খেয়ালী বসন্তের মাঝ রাতের এলোমেলো হাওয়া বাগানের আম কাঁঠাল গাছগুলোর মধ্যে যথেচ্ছাচার করছে, বোলের সঙ্গে শূন্যতা উঠেছে ব্যথিয়ে আর ঝাউ গাছ কটা বহুযুগের পুঞ্জিত দীর্ঘনিঃশ্বাসে সমস্ত আকাশটাকে করেছে উন্মনা। এতদিনের বিচার-বিশ্লেষণে যা স্থির করতে পারে নি হঠাৎ এক মুহূর্তে তা স্থির হয়ে গেল। রেশমীকে তার চাই। রাত্রির অন্ধকারে ভাস্বরতর হীরককঠিন রেশমীর যৌবনতি লুব্ধ নাগরাজের মত সবলে করল তাকে আকর্ষণ। ত্বরিতে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে সোজা গিয়ে রেশমীর দরজায় ঘা দিল সে।
.
২.১৪ ধর্মস্য তত্ব
রাত অনেক হয়েছে দেখে কেরী বই খাতাপত্র গুছিয়ে রেখে শুতে যাওয়ার ব্যবস্থা করছে, এতক্ষণ সে পড়বার ঘরে ছিল। এমন সময়ে দরজা খুলে দমকা হাওয়ার মত ঢুকে পড়ে টমাস।
বিস্মিত কেরী বলে ওঠে, এ কি, টমাস যে! হঠাৎ এত রাত্রে?
টমাস হাঁপাচ্ছিল, লক্ষ্য করে কেরী বলল, বস, বস, একেবারে হাঁপিয়ে পড়েই যে!
দম নিয়ে টমাস বলল, হাঁপাব না! ঘোড়া ছুটিয়ে হঠাৎ আসতে হলে না হাঁপিয়ে উপায় কি?
হঠাৎ এমন কি ঘটল যে এত রাত্রে ঘোড়া ছুটিয়ে আসতে হবে?
টমাস আসন গ্রহণ করে বলে, একটা লোকের ওলাউঠো হয়েছে খবর পেয়ে গিয়েছিলাম পঁচিশ মাইল দূরের রামকানাই বলে একটা গ্রামে। সন্ধ্যাবেলায় মহীপালদিঘিতে ফিরে এসে দেখলাম মিঃ উডনীর লোক অপেক্ষা করছে।
কেরী বলে, তাতে ব্যস্ত হয়ে পড়বার কি আছে?
আগে সবটা শোন। সেই লোকটি মিঃ উডনীর এজেন্ট রীডারের অগ্রদূত। মিঃ রীডার কাল সকালে এসে পৌঁছবে।
ভাল কথা, অনেক দিন পবে একজন দেশের লোক দেখতে পাওয়া যাবে।
কি মুশকিল! আগে সবটা শুনেই নাও।
দুঃখিত, বল।
মিঃ রীডার বেরিয়েছে উডনীর বিভিন্ন কুঠির তদারকে। কালকে প্রথমে এসেই সে ক্যাশ মিলিয়ে দেখবে।
বেশ তো, ক্যাশ মিলিয়ে দিও।
ক্যাশ যে শর্ট।
বলে টমাস নীরব হল। কেরীও নীরব। দেয়ালের ঘড়িটার টিক টিক ধ্বনি ফুটতর হয়ে উঠল।
নীরবতা ভঙ্গ করে কেরী প্রথমে কথা বলল, আবার তুমি ক্যাশের টাকা ভেঙেছ!
কি করব বল, দুঃস্থ লোক দেখলে আমি স্থির থাকতে পারি না।
দুঃস্থ লোকের সাহায্যের জন্যেও পরের টাকা দান করবার অধিকার তোমার নেই।
তার পরে কিছুক্ষণ নীরব থেকে কেরী বলল, কিন্তু ক্যাশ শর্ট পড়বার আসল কারণ জুয়ো খেলে তুমি টাকা নষ্ট করেছ।
নীরবতার দ্বারা টমাস দোষ স্বীকার করে নিল। অপরাধ করবার চেয়ে অপরাধ স্বীকার করা কঠিন, সেই কঠিন কাজটা করতে হল না, কেরীর মুখে প্রকাশ হয়ে পড়ল, তাতে টমাসের উদ্বেগের প্রধান অংশ দূরীভূত হয়ে গেল। দ্বিতীয় অংশ, আজই টাকা সংগ্রহ। কেরীকে সে বেশ জানত যে, কেঁদে গিয়ে পড়লে টাকা পাওয়া যাবেই। অনেকবার অনেক বিপদ থেকে সে রক্ষা করে দিয়েছে।
টমাস বলে উঠল, এবারের মত আমাকে বাঁচিয়ে দাও ব্রাদার কেরী, ভবিষ্যতে সাবধান হয়ে চলব। আর আমার প্রতিশ্রতিতে যদি বিশ্বাস না কর তবে ভগবানের নাম করে–
কেরী বাধা দিয়ে বলল, থাম থাম, বৃথা ভগবানের নাম উচ্চারণ কর না।
টমাস মাথা হেঁট করে বসে রইল। মনে তার অনুশোচনা হচ্ছিল সত্যি, কিন্তু সেই সঙ্গে উদ্বেগ লাঘব হওয়ায় বেশ একটু স্বস্তিও অনুভব করছিল সে।
কিন্তু বিপদে ফেললে যে! অফিস-ঘরে আছে সিন্দুক, অফিস-ঘরের চাবি থাকে মুন্সীর কাছে। সে হয়তো আর-সকলের সঙ্গে গাঁয়ের মধ্যে গিয়েছে যাত্রাগান শুনতে।
আমি খুঁজে আনছি, বলে টমাস ছুটে বেরিয়ে গেল। টমাসের প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আবার বই খুলে বসল কেরী।
টমাস সোজা গিয়ে উঠল রাম বসুর ঘরের বারান্দায়, দেখল মুন্সীর ঘর বন্ধ। সে জানত পাশের ঘরটায় থাকে পার্বতী ব্রাহ্মণ, দেখল সে ঘরটাও বন্ধ। বুঝল কেরীর অনুমান মিথ্যা নয়—সকলে যাত্রা শুনতে গিয়েছে গাঁয়ের মধ্যে। সে জানত না গাঁয়ের ঠিক কোন্খানে গ্লান হচ্ছে, ভাবল, ন্যাড়াকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যাক। ন্যাড়ার ঘরটা অন্য দিকে, রেশমীর ঘরের কাছে। সেখানে গিয়ে টমাস দেখল ন্যাড়ার ঘরটাও বন্ধ, বুঝল সবাই একসঙ্গে গিয়েছে। তখন সে নিরুপায় হয়ে স্থির করল রেশমীকে ডেকেই জেনে নেবে যাত্রার আসরের সন্ধান—তাই সে রেশমীর ঘরের কাছে গিয়ে পৌঁছল। রাত্রিবেলা একাকী কোন মহিলার ঘরের দরজায় গিয়ে ডাকাডাকি করা সামাজিক নীতি নয় সত্য, কিন্তু ভোর হওয়া মাত্র যেখানে তহবিল ঘাটতি মিটিয়ে দেওয়া অপরিহার্য, সেখানে ওসব সূক্ষ্ম শিষ্টাচারের বাধা যে কত তুচ্ছ, বিপন্ন ব্যক্তি ছাড়া অপরের পক্ষে সহজবোধ্য নয়।
টমাস দরজায় ঘা দিল।
কেউ সাড়া দিল না বা দরজা খুলল না। কিন্তু দরজা ভিতর থেকে বন্ধ, লোক নিশ্চয় আছে, হয়তো ঘুম ভাঙে নি মনে করে আবার প্রবলতর আঘাত দিল টমাস।
আবার। আবার।
কে এত রাত্রে?
চমকে উঠল টমাস। এ যে মুন্সীর কণ্ঠ।
মুন্সী, তুমি এত রাত্রে এখানে?
রাম বসুর সাড়া দেওয়া উচিত হয় নি, আর কোন উপায়ে দরজায় ঘা পড়ার প্রতিবিধান করা উচিত ছিল তার। কিন্তু সংসারে উচিতমত কাজ কয়টা হয়? সঙ্কটকালে অতিশয় ধৃত ব্যক্তিও অতিশয় ভুল ভুল করে বসে বলেই তো জীবনের রস আজও শুকিয়ে যায় নি। সংসারের জমাখরচের পাকা খাতায় কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম হিসাবের গরমিল থেকে গিয়েছে।
