তা ঐখানে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নাম কর, আমরা ভিতর থেকে বেশ শুনতে পাব।
না, দাঁডিয়ে নয়, নতজানু হয়ে। মুন্সী, আমি এখানে নাম করি আর তুমি ওখানে ক্রমে গভীরতর অন্তরে প্রবিষ্ট হয়ে নিগৃঢ়তম তত্ত্বটি বুঝিয়ে দাও।
মুন্সী বলে, সাহেব, এখন ঘরে যাও দেখি।
নিশ্চয়ই যাব, আনন্দের সংবাদ বহন করে যাব, কিন্তু তার আগে একবার বল দেখি, ও বুঝেছে কি না?
বিরক্ত হয়ে মুন্সী বলে, বুঝেছে বুঝেছে, তুমি গেলে আরও ভাল করে বুঝবে।
‘জয় হক’ বলে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে ওঠে টমাস, তার পরে পেয়েছি, পেয়েছি, স্বর্গের চাবি পেয়েছি বলে চীৎকার করতে করতে ছুটে চলে যায় কেরীর ঘরের উদ্দেশে।
২.১৫ স্বর্গের চাবি
টমাসের ফিরতে বিলম্ব দেখে কেরী মনে মনে বিরক্ত হয়ে উঠছি। বেরিয়ে সন্ধান করবে কিনা ভাবছে, এমন সময়ে সশব্দে দরজা খুলে দমকা হাওয়ার মত প্রবেশ করল টমাস।
পেয়েছি পেয়েছি, সোল্লাসে চীৎকার করে উঠল।
টমাসের ভাবালুতার সঙ্গে কেরী পরিচিত কিন্তু আজ কিছু বাড়াবাড়ি মনে হল, তাই কিঞ্চিৎ বিরক্ত ভাবেই বলল, পেয়েছ তো দাও, খামকা অমন চীৎকার করছ কেন?
টমাস বলল, এ দেওয়া যায় না, অনুভব করা যায় মাত্র।
কি সব বাজে কথা বলছ তুমি! সিন্দুক-ঘরের চাবি কই?
সিন্দুক-ঘর! বিস্মিত হয় টমাস।
তুমি কি সিন্দুক-ঘরের চাবি আনতে যাও নি?
এতক্ষণে সব কথা মনে পড়ে টমাসের, বলে ওঠে, তাই গিয়েছিলাম বটে, কিন্তু পেয়েছি তার অনেক বেশি।
কি আর এমন পাবে?
কি আর এমন পাব! বলে বিস্ময়ের সঙ্গে টমাস। তার পরে শুধায়, অনুমান কর তো ব্রাদার কেরী, কি পেতে পারি?
স্পষ্ট বিরক্তির সঙ্গে কেরী বলে ওঠে, দেখ টমাস, এত রাতে তোমার সঙ্গে ছেলেমানুষি করবার সময় আমার নেই। সিন্দুক-ঘরের চাবি পেয়ে থাক তো দাও।
ব্রাদার কেরী, সিন্দুক-ঘরের চাবি খুঁজতে গিয়ে স্বর্গের চাবির সন্ধান পেয়েছি।
কেরী দাঁড়িয়ে উঠে বলল, তবে তুমি স্বর্গে প্রবেশের চেষ্টা কর, আমি শুতে চললাম, বড় ক্লান্তি অনুভব করছি।
ব্রাদার কেরী, স্বর্গে প্রবেশের সুযোগ পেলে কি আর বাইরে থাকি। কিন্তু মুন্সী কিছুতেই রাজী হল না, রেশমীর তাতে নাকি খুব সঙ্কোচ। তার পরে স্বাগত ভাবেই যেন বলে উঠল, মুন্সী এতক্ষণ একাকীই বোধ হয় স্বর্গে প্রবেশ করল। স্বার্থপর!
রাম বসু ও রেশমীর নাম একত্রে শুনে কান খাড়া করল কেরী, গভীরভাবে শুধাল, কি ব্যাপার বল তো?
যথোচিত ভাবানুষঙ্গে আদ্যোপান্ত বর্ণনা করে টমাস বলল, ব্রাদার কেরী, এমন ব্যাপার যে দেখতে হবে, আগে ভাবি নি।
কেরী বলল, আমিও আগে ভাবি নি যে, এমন ব্যাপারে দেখতে হবে।
কিন্তু আমি বাইরে থেকেও যেটুকু আভাস পেয়েছি, তুমি তো সেটুকুও পেলে না। তার পরে বলল—চল না কেন, দেখে আসি। এতক্ষণে নিশ্চয় মিষ্ট্রি অব রিলিজ্যন রেশমীকে বুঝিয়ে সেরেছে—মুন্সী সত্যই একজন জ্ঞানী পুরুষ।
মুন্সী যেমন জ্ঞানী, তুমিও তেমনি ভক্ত! ধিক্কার দিয়ে ওঠে কেরী, তুমি একটি আস্ত গর্দভ!
কেন, এতে নির্বুদ্ধিতার কি দেখলে?
দেখেও যদি না বুঝতে পার তবে আর কেমন করে বোঝাব!
খুলেই না হয় বল না।
গভীর রাত্রে একজন পুরুষ একটি যুবতীর নিভৃত কক্ষে প্রবেশ করেছে, কি উদ্দেশ্যে হতে পারে?
আমিও তো প্রথমে সেই প্রশ্ন করেছিলাম। মুন্সী বলল, মিষ্ট্রি অব রিলিজ্যন বোঝাবার উদ্দেশ্যে।
ও বলল আর তুমি বিশ্বাস করলে?
ক্ষতি কি? তুমি অন্য কিছু সন্দেহ করছ নাকি?
অন্য কিছু তো সন্দেহ করবার নেই—এ রকম ক্ষেত্রে একটিমাত্র ঘটনাই সম্ভব।
কি সেটা?
নাঃ, তোমাকে নিয়ে পারলাম না। বলে ওঠে কেরী।
তার পরে বলে, ঐ মেয়েটাকে নষ্ট করবার উদ্দেশ্যে ঢুকেছে লোকটা। এমন কতদিন ধরে চলছে কে জানে!
ও যে বলল, এই প্রথম।
ও যা বলল তাই বিশ্বাস করলে? ও বলল এই প্রথম, তুমি বিশ্বাস করলে? ও বলল, মিষ্ট্রি অব রিলিজ্যন বোঝাতে এসেছে, তুমি বিশ্বাস করলে?
টমাসের ভক্তির নেশা কাটতে চায় না। বলে, যদি অসদুদ্দেশ্যেই ঢুকে থাকবে, তবে ধর্মতত্ত্বের কথা তুলল কেন?
জানে যে, ভক্তি তোমার ক্রনিক ব্যাধি, তাই সেখানে একটু মোচড় দিয়ে তোমার মনটাকে সন্দেহের পথ থেকে ভক্তির পথে চালিয়ে দিল।
তা দেয় দিক, কিন্তু ধর্ম-প্রসঙ্গ নিয়ে এমন পরিহাস অমার্জনীয়।
ব্যভিচারী ব্যক্তির কাছ থেকে আর কি তুমি আশা করতে পার?
আমি তো মুন্সীকে সৎ ব্যক্তি বলে জানতাম।
আমারও সেইরকম ধারণা ছিল। তা ছাড়া লোকটার অন্য অনেক গুণ; ওর সঙ্গে সমানে সমানে কথা বলা যায়।
এবারে কিছুক্ষণ নীরবে পায়চারি করে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে কেরী-মুন্সী মাস্ট গোর অব কোর্স হি মাস্ট গোয়
গর্জে ওঠে টমাস। কাঁচা ভক্ত ভক্তির উপরে ব্যঙ্গ ছাড়া আর সব সহ্য করতে পারে আর একবার ভক্তিতে উপহসিত হলে মরীয়া হয়ে ওঠে। মরীয়া হয়েই উঠল টমাস। আমার সঙ্গে পরিহাস, দেখে নেব সেই শয়তানটাকে!
সবেগে সে ছুটল রেশমীর ঘরের দিকে।
টমাস, টমাস, হঠাৎ নাটকীয় কিছু করে বোসো না, ফের ফের, ফিরে এস।
কে কার কথা শোনে! ততক্ষণে অন্ধকারের মধ্যে উধাও হয়ে গিয়েছে উন্মত্ত টমাস।
ধর্মশাস্ত্রের অপমানেই টমাসের এই উম্মা মনে করলে ভুল হবে। আরও কিছু গৃঢ় কারণ ছিল। রেশমীর প্রতি লালসার ভাব দেখা দিয়েছিল টমাসের মনে, সেখানে রাম বসুকে সফল প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে দেখে তার মন গিয়েছিল বিষিয়ে। সেই উত্তেজনা তাকে ভিতরে ভিতরে মারছিল ঠেলা। টমাসকে বললে নিশ্চয় সে স্বীকার করত।
২.১৬-১৮ আবার ভাসমান
নৌকা চলেছে টাঙন হযে, মহানন্দা হয়ে ভাগীরথীর দিকে।
