রাম বসু অতিশয় ধূর্ত, অতিশয় ঘোড়েল, অতিশয় প্রাজ্ঞ বাস্তববাদী; ক্ষিপ্র নিপুণ ছিপ নৌকার মত ডাইনে বাঁয়ে সাহেব-সমাজ ও বাঙালী-সমাজের ঢেউ কাটিয়ে ছুটতে সে অভ্যস্ত; পিছে পড়ে থাকে পাণ্ডিত্যের বজরা, ঐশ্বর্যের পালী, বানচাল হয়ে যায় নির্বুদ্ধিতার পালোয়ারী সব নৌকা, সংসার-তরঙ্গতলে নৃত্য করে ছুটে চলে যায় রাম বসুর লঘুভার ছিপ। সারাজীবন ধূর্তপনা করে তার ধারণা হয়েছিল সে নীতির উর্দ্ধে; হিন্দুধর্ম খ্রীষ্টধর্ম দুয়েরই মাথায় নিরপেক্ষভাবে সে কাঁঠাল ভেঙে এসেছে; টাকার দুর্নিবার আকর্ষণেও তাকে অর্থগৃধ করতে পারে নি; জ্ঞানের ক্ষেত্রকে পরিণত করেছে সে সরাইখানায়, আকণ্ঠ পান করেছে সরাব, তার পরে রাত্রিশেষে চলে গিয়েছে নূতন সরাবখানার উদ্দেশে; আর নারীদেহ, তাতে পেয়েছে সে জড়, পায় নি কখনও জাদু, কেবল ঐ টুশকি ছাড়া।
সে কেবল অনুভব করে না, অনুভূতিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করে, নিজের অনুভূতিকে বাইরে স্থাপিত করে নিরীক্ষণ করে; একসঙ্গে সে তন্ময় ও মন্ময়; ‘প্রাচীন মানুষ’ হয় শুধু তন্ময়, নয় শুধু মন্ময়; ‘প্রাচীন মানুষ’ হরগৌরী, ‘নব্যমানুষ’ অর্ধনারীশ্বর। রাম বসু প্রাচ্য ভূখণ্ডের প্রথম ‘মর্ডান ম্যান’ বা ‘নব্যমানুষ’। এ বিষয়ে সে রামমোহনের অগ্রজ।
টুশকির প্রসঙ্গে বসুজার মনে নিজের যৌন-জীবনের ইতিহাস জেগে ওঠে। যৌবনের সূচনা থেকে যত নারী তার জীবনে এসেছে-কেউ এক রাত্রির দীপ জ্বালিয়ে, কেউ বা বৎসরকাল মশাল জ্বালিয়ে তাদের সংখ্যা গণনা করতে গেলে স্বয়ং শুভঙ্করকে বা আর্যভট্টকে ডাক দিতে হয়। তার পরে হঠাৎ একদিন এল টুশকি, তখন সে বুঝল জড়ে জীবে প্রভেদ। জীব সত্য, তবু জাদু নয়। টুশকির দেহটার সঙ্গে পেয়েছিল সে স্নেহ, ঐ দাক্ষিণ্যটুকুর জন্যে টুশকি আর সকলের সঙ্গে একাসনে বসে একাকার হয়ে গেল না, স্থান পেল হৃদয়ের কাছে। গৃহের স্বাদ ও স্বস্তি পাওয়ায় যে চিরন্তন আকাক্ষা পুরুষের মনে তারই আভাস পেল টুশকির গৃহে, তখন থেকে সে হল গৃহহীন গৃহী।
কিন্তু আজ, ঐ যে রহস্যময়ী মূর্তি, গোধূলির পড়ন্ত আলোয় আরও অস্পষ্ট হয়ে উঠে অধিকতর মনোজ্ঞ হয়ে উঠেছে, ওতে আর টুশকিতে অনেক প্রভেদ। টুশকি জীব, রেশমী জাদু; জীবে আছে পৃথিবীর প্রাণ, জাদুতে স্বর্গের আভাস; জীবে রুপ, জাদুতে সৌন্দর্য; রূপ রক্তমাংসের সৃষ্টি, সৌন্দর্য সৃষ্টি কল্পনার।
হয়তো বা গাছের পাতার শব্দ হয়ে থাকবে, হয়তো এগোতে গিযে পায়ের শব্দ করে থাকবে রাম বসু, চকিতে মুখ ফিরিয়ে সভয়ে জিজ্ঞাসা করে রেশমী, কে? কে
আমি কায়েৎ দাদা রে!
তাই বল! আশ্বস্ত হয় রেশমী।
এত রাতে এখানে একা বসে থাকা ভাল নয়, বাড়ি চল।
উঠে পড়ে রেশমী, দুজনে অগ্রসর হয় কুঠির দিকে।
স্বভাবতই রাম বসু একটু বেশি কথা, কিন্তু আজ যোগাতে চায় না তার কথা। বসন্তের খেয়ালে-ভরা আকাশ গান-থেমে-যাওয়া বীণার তন্ত্রের মত রী রী করতে থাকে অনুরণনে, আকাশ তারায় তারায় ওঠে মুখর হয়ে। পশ্চিম দিগন্তের মাথা-বরাবর ঝামা আলোটুকু কমে আসে আরও ঝিমিয়ে; আরও ক্ষীণ, আরও ম্লান; এবারে দৃষ্টির সঙ্গে অনুমানকে দোসর না করে নিলে আর দেখবার উপায় নেই।
.
রাত্রে ঘুম এল না রাম বসুর। আহারটাতেও পড়েছে ফাঁক। অনেক রাত পর্যন্ত বিছানায় পড়ে এপাশ ওপাশ করে সে, নূতন অভিজ্ঞতার ধাক্কা তার মনকে করে রাখে চঞ্চল। হঠাৎ কানে গেল বাইরে কে গান করে চলেছে-”রজকিনী-প্রেম নিকষিত হেম, কাম গন্ধ নাহি তায়।” কতবার শুনেছে সে এই পদটি। আজ মনে হল এত বড় মিথ্যা কোন মহাকবির কলমে আর বের হয় নি। তার মনে হল কামের মধ্যে প্রেম না থাকতে পারে কিন্তু প্রেমে কাম থাকবেই; হয়তো অগোচরে থাকে, কি না থেকে যায় না। তার মনে হল কাম ফুল, প্রেম ফল; ফুল ছাড়া ফল সম্ভব নয়। বিষয়টা নিয়ে মনের সঙ্গে সে বিচারে বসল। সে বলল, আজ বিষয়টা নূতন করে বুঝলাম। মন বলল, হঠাৎ আজকে বোঝবার কি কারণ ঘটল? রেশমীর প্রতি তোমার নজরের বদল হয়েছে কি? সে বলল, আরে ছি ছি, সে রকম কিছু নয়, তবু ভুল হলে স্বীকার করব না কেন? মন বলে, বেশ, তাই না হয় হল, কাম ফুল, প্রেম ফল; তবে সৌন্দর্যটা কি?
কেন, সৌন্দর্য তরু!
আর যৌবনটা?
ভূমি।
মন বলে, বাহবা, এখনও তোমার অবস্থা চিকিৎসার অতীত নয়।
রোগটা কি যে চিকিৎসার প্রয়োজন হবে! তবু শুনি আমার অবস্থা বুঝলে কি করে?
এখনও বেশ গুছিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারছ।
না পারবার হেতু কি?
ব্যাধি।
কি ব্যাধি?
মন বলে, যে ব্যাধিতে শীঘ্রই আক্রান্ত হবে।
নাম?
প্রেম।
তার মানে, মূলে কাম আছে?
মন বলে, নিজেই ভেবে দেখ। বলে, রেশমীর সৌন্দর্যে তুমি অভিভূত হয়েছ, ঐ অনুভূতিটুকু কাটলে বুঝতে পারবে প্রকৃত অবস্থা।
বিরক্ত হয়ে রাম বসু বলে, আচ্ছা তখন দেখা যাবে, এখন ঘুমোতে দাও দেখি।
কদিন ধরে চলে রাম বসুর উন্মনা উদভ্রান্ত অবস্থা।
কেরী বলে, মুন্সী, অতিরিক্ত পরিশ্রমে তুমি কাতর হয়ে পড়েছ, বিশ্রাম নাও।
ন্যাড়া বলে, চল কায়েৎ দাদা, কদিন ঘুরে আসি, কাছেই প্রেমতলীর মেলা, খুব জবর মেলা।
রেশমী বলে, কায়েৎ দাদা, ভেবে ভেবে তোমার শরীর যে গেল। শুধায়, কার জন্যে এত ভাব, কায়েৎ বৌদিদির জন্যে নাকি?
