রেশমী বুঝল, ঘটনাচক্র আজ তার প্রতিকূল, ফুলকির মনগড়া ধারণাটাই ক্রমে স্পষ্টতর হয়ে উঠছে, ভয় ছিল ন্যাড়ার সম্মুখে ফুলকি না-জানি কি বলে বসে!
ফুলকি এমন কিছু বলল না যাতে ন্যাড়ার সন্দেহ উদ্রেক করে—অথচ অতি-সাধারণ কথায় এমন একটি সুর মিশিয়ে দিল যাতে রেশমীর বুঝতে ভুল না হয়।
যাও ভাই শীগগির যাও, কায়েৎ দাদার কথা অমান্য করলে তিনি আবার রাগ করবেন!
রেশমীর উত্তর দেওয়ার সাহস ছিল না, পাছে ন্যাড়া সন্দেহ করে, আর উত্তর দেওয়ার ইচ্ছাও ছিল না। সে ন্যাড়াকে অনুসরণ করে হন হন করে প্রস্থান করল। ফুলকির সন্দেহে তার সর্বাঙ্গ জ্বলছিল। মক্ষীয়মাণ গানের সুরে বোঝা যাচ্ছিল যে, ফুলকি ক্রমেই দূর থেকে দূরান্তরে চলে যাচ্ছে–
‘ভরা নদী ভয় করি নে
ভয় করি সই বানের জল।‘
.
২.১৩ রাম বসুর আবিষ্কার
রাম বসু হঠাৎ আবিষ্কার করে ফেলেছে যে, রেশমী অপূর্বসুন্দরী। মহৎ আবিষ্কার মাত্রেই আকস্মিক। দুরন্ত সমুদ্রের বঙ্কিম দিগন্তের ভূতেরণশায়ী নবজগতের সঙ্গে কলম্বাসের যেদিন প্রথম চোখাচোখি হয়েছিল সে কি নিতান্ত আকস্মিক ছিল না? পরিচিত সমুদ্র তাকে বহন করে নিয়ে পৌঁছে দিল একটি মহৎ অপরিচয়ের সম্মুখে। রাম বসুরও ঘটল ঠিক সেইরকম অবস্থা।
রেশমীকে সে দেখছে আজ দু বছরের উপর, তাকে চপল চঞ্চল বালিকা ছাড়া কিছু মনে হয় নি। যখন সে প্রথম ইংরেজি লিখতে পড়তে বলতে শিখল কৌতূহল অনুভব করেছে মুন্সী। ন্যাড়ার সঙ্গে যখন সে ইংরেজিতে কথা বলতে চেষ্টা করেছে আর ন্যাড়া তার উত্তর দিয়েছে ইংরেজি বাংলা হিন্দীর মিশলে, কিছু না বুঝতে পেরে রেশমী জরুরী কাজের অছিলায় পভ দিয়েছে, বিজয়ী ন্যাড়ার হাসিতে সে কৌতুক অনুভব করেছে। ন্যাড়া বলেছে, দেখলে তো কায়েৎ দাদা, কাজের ছুতো করে পালাল রেশমী দিদি! ও পারবে কেন আমার সঙ্গে ইংরেজী বিদ্যায়?
আরও বলেছে, ও শিখেছে ইংরেজী, আমি শিখেছি ইংরজকে। ওদের ভাষার মধ্যে বারো আনা গায়ের জোর, বুঝলে কায়েৎ দাদা, হিন্দী বাংলা মিশিয়ে জোরে গর্জন করে
উঠলেই ইংরেজি হয়।
দূর বোকা, বলে বসুজা।
এতদিন তুমি ইংরেজের সঙ্গে কাটালে, তুমিও কিছু বোঝ না দেখি।
বেশ তো, বুঝিয়ে দে না।
অদম্য ন্যাড়া বলে, তবে শোন। শুয়োর বলে বোঝায় শুয়োর নামে জীবটা। কিন্তু যখন সাহেব গর্জন করে ওঠে—‘ইউ শুয়ার, ইধার আও’ তখন শুয়োরের মানে বদলে যায়।
তখন আবার কি মানে হয়?
তখন মানে হল, খানসামা, বাবুর্চি যেটি ঠিক সেই সময়ে সাহেবের দরকার।
রাম বস হাসে।
ন্যাড়া বলে, তোমার হাসি পেল, কিন্তু ঐ গর্জন শুনে খানসামা বাবুর্চিদের প্রাণ উড়ে যায়, তারা সম্মুখে এসে কাঁপতে থাকে।
তার পরে একটু থেমে বলে, মানি সাহেবের আবার ভাষারও দরকার হত না, হাতের কাছে যা পেত ছুঁড়ে মারত। একদিন পর পর তিনখানা প্লেট আমাকে ছুঁড়ে মারল, আমি পর পর তিনখানা লুফে ফেললাম। তাই না দেখে সাহেব খুশি হয়ে আমার পিঠ চাপড়ে বলে উঠল, ‘ওয়েল ডান, হ্যাটট্রিক! আবার প্লেট ভাঙে নি দেখে মেমসাহেবও আমার উপরে খুব খুশি।
আবার রেশমী যেদিন সায়া-শেমিজ ধরল সেদিন ন্যাড়া বলে উঠল, কে বলবে রেশমী দিদি বাঙালী! খাস মেমসাহেব বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।
রেশমী ঠাট্টা করে বলল, তা হলে এবারে একটা সাহেব বর খুঁজে বার কর।
খুঁজতে হবে কেন, তাদের কাছেই হাজির।
কে রে?
কেন, ঐ আমাদের টমাস্ সাহেব, না হয় নাই থাকল গোটা-পাঁচেক দাঁত।
টমাসের নাম শুনে রেশমী একখানা ঠ্যাঙা নিয়ে তাড়া করে।
দূরে বসে রাম বসু দেখত এসব দৃশ্য, মনটা খুশি হত, ভাবত, আহা যেমন করে হক মেয়েটা দুঃখের কথা ভুলে থাকুক।
রেশমী সহজে সায়া-শেমিজ ধরতে চায় নি। কেরী-দম্পতির বিশেষ পীড়াপীড়িতেই ধরেছিল। তবু একবার জিজ্ঞাসা করেছিল রাম বসুকে।
তুমি কি বল কায়েৎ দাদা?
ক্ষতি কি!
ক্ষতি কি?
সায়া-শেমিজ ধরলে খিরিস্তান হতে আর বাকি থাকল কি?
দূর বোকা! ঐ যে ছিরুর মা সায়া-সেমিজ পরে, ও কি খিরিস্তান? কোন সাহেব যদি ধুতি চাদর ধরে তবেই কি হিন্দু হয়ে গেল?
হিঁদু তো হওয়া যায় না, খিরিস্তান যে হওয়া যায়।
হওয়া যায় বলেই তো হচ্ছিস না।
ওসব পরলে আমাকে যে চেনাই যাবে না।
সে তো ভালই হবে, চণ্ডী বক্সীর লোকে তোকে চিনতে পারবে না, কাছে এসে পড়লেও মেমসাহেব ভেবে পালাবার পথ খুঁজবে।
যুক্তিটা তার মনে ধরল, আর সে ধরল সায়া-শেমিজ। চণ্ডী বক্সীর চোখে ধুলো দেবার উপায় এত সহজ জানত না রেশমী।
এ হেন রেশমীকে হাটে ঘাটে মাঠে ঘরে বাইরে দিনে রাতে সদাসর্বদা রাম বসু দেখেছে কিন্তু সে যে বিশেষ করে সুন্দরী একথা কখনও তার মনে হয় নি।
সেদিন হঠাৎ আবিষ্কার করে বসল তার সৌন্দর্য। সেই গোধূলির আলো-আঁধারি রঙীন প্রচ্ছায়ে, মাঝ-বসন্তের খেয়ালে ভরা এলোমেলো বাতাসের অদৃশ্য চামরব্যজনের ছন্দে, স্বচ্ছ বারিখণ্ডের পটে সন্নিবিষ্ট নিঃসঙ্গ নারীমূর্তি হঠাৎ রহস্যের চমকে উদঘাটিত হল তার চোখে। প্রথম দৃষ্টিতে বুঝতে পারে নি কে এল এখানে! পরমুহূর্তে মন বলল রেশমী। কিন্তু বোঝবার ফলে রহস্য ফিকে না হয়ে গাঢ়তর হল। রেশমী! যাকে আগে সহস্রবার দেখা গিয়েছে, সহস্রাতীত একবারের জন্য এমন বিস্ময় সঞ্চিত ছিল তার মধ্যে? বিস্ময়ের অন্ত পায় না রাম বসু। নিস্তব্ধ নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। পা দুখানি জলের দিকে নামিয়ে দিয়ে ঈষৎ ঝুঁকে বাম করতলে চিবুক ন্যস্ত করে তন্ময় হয়ে বসে রয়েছে। নিঃসঙ্গ তরুণী—নির্জনতার প্রশ্রয়ে আঁচল পডেছে খসে, লুটিয়ে আছে ঘাসের উপরে, শুভ্র গ্রীবার উপরে বাতাসে কাঁপছে আলগা চুলের গুচ্ছ, অর্ধাবগুণ্ঠিত পূর্ণিমা চাঁদের আভাস দিচ্ছে অপ্রচ্ছন্ন বাম পরোধর, সুঠাম নিটোল তনুষ্টি, রেখায় রঙে ছায়াতপে তাল মিলিয়ে সৃষ্টি করেছে নেত্রপেয় একখানি রাগিণীর। রাম বসুর চোখের পলক পড়ে না। সে ভাবল, সৌভাগ্য এই যে ওকে মুখোমুখি দেখি নি, তা হলে কি এমন খুঁটিয়ে দেখবার পূর্ণ অবকাশ পেতাম; ভাবে, মুখ দেখলে প্রত্যহের পরিচিত সেই মেয়েটিকে দেখতাম, সংসার যেখানে অঙ্কিত করে দিয়েছে ছোটখাটো সুখদুঃখের চক্রচিহ্ন; ভাবে, কখনও মনে হয় নি প্রত্যহের অতীত কিছু আছে ওর মধ্যে; এখন বুঝল সমগ্রভাবে দেখলেই তবে পাওয়া যায় সৌন্দর্যকে, সত্যকেও সেই সঙ্গে। সে নির্বাক দাঁড়িয়েই থাকে যেমন নির্বাক বসে আছে রেশমী, সৌন্দর্য-সোনার মিনে-করা লোহার হাতুড়ি, অকস্মাৎ বুকের উপরে নিক্ষিপ্ত হয়ে অতর্কিতে হতচৈতন্য করে দেয় দ্রষ্টাকে।
