মাঠের মধ্যে চোর-ডাকাত কি লুট করবে? নেকড়ে বেরুতে পারে।
চল তবে কায়েৎ দাদা কুঠিতে ফিরে যাই, সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছে খেয়াল ছিল না।
দুজনে কুঠি বলে রওনা হল।
রাম বসুর ‘হঠাৎ দেখতে পেলাম তোমাকে’ কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। হঠাৎ দেখতে পেয়েছিল সত্য-কিন্তু কিছুক্ষণ রেশমীর অগোচরে দাঁড়িয়ে যে তাকে দেখছিল সে কথাটা বলে নি, এমন ক্ষেত্রে বলা চলে না।
রাম বসু আজ যেন হঠাৎ নূতন করে রেশমীকে আবিষ্কার করল, দেখল সে অপূর্ব সুন্দরী। বাঁধের ওদিকের রক্তিম কুসুমরুটির সঙ্গে রেশমীকে মিলিয়ে দেখছিল। তার মনে হচ্ছিল, বা বা, এরা দুজনে যেন জুড়ি, যেমন একক তেমনি দলছাড়া, তেমনি রহস্যময় সৌন্দর্যময়! রাম বসুর কেমন তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব।
রেশমী শুধাল, কেরী সাহেব কি মহীপাল দিঘিতে রওনা হয়েছেন?
কেমন করে হবেন, মিসেস কেরী যে আরও বেশি উন্মাদ হয়ে উঠেছেন।
হবেন না! কোলের ছেলেটা হঠাৎ মারা গেল। মিসেস কেরী যে কদিন বাঁচবেন তাই ভাবছি।
সে ভাবনা কর না, সাহেবী প্রাণ খুব শক্ত। বোটা শক্ত হওয়ার আগে জ্যাভেজের মত ঝরে পড়লে এক কথা। কিন্তু একবার বোঁটা শক্ত হয়ে গেলে যমরাজের পাইক-বরকন্দাজের সাধ্যও নেই লাঠির ঘায়ে পাডে। ওদের নিতে হলে স্বয়ং যমরাজকে আসতে হবে।
এইরকম কথাবার্তা বলতে বলতে দুজনে কুঠির কাছে এসে পড়ল, এমন সময়ে নৈশ অন্ধকার বিদীর্ণ করে সঙ্গীত ধ্বনিত হল—‘ভরা নদী ভয় করি নে, ভয় করি সই বানের জল।‘
কে গান করে রে?
ফুলকি। চেন না ওকে কায়েৎ দাদা?
দেখেছি বটে মেয়েটাকে।
তুমি যাও কায়েৎ দাদা, আমি ওর সঙ্গে দুটো কথা বলে আসি, দেখি নি অনেক দিন ওকে। ফুলকি, এদিকে আয় ভাই।
.
২.১২ অন্ধকারের ভুল
ফুলকি শুধাল, এত রাতে কোথায় গিয়েছিলে?
রেশমী বলল, এত রাতে কোথায়? কেবল তো সন্ধ্যা!
তা বটে, কলির সন্ধ্যা আর কি! তা সঙ্গে উটি কে ছিল?
চেন না? কায়েৎ দাদা।
তা কায়েৎ দাদার সঙ্গে এত রাতে মাঠের দিকে গিয়েছিলে কেন? বলে ফুলকি মুচকে হাসল।
তার হাসি দেখে রেশমীর গা উঠল জ্বলে, সে বেশ একটু তেতে উঠে বলল, যেখানেই যাই, যার সঙ্গেই যাই, তোমার তাতে কি?
ভাল রে ভাল! আমি তোমার হয়ে লড়াই করে মরছি—আর তুমি করছ রাগ!
রেশমীর রাগ কমে নি, গা তখনও জ্বলছিল, তবু রাগ দমন করে শান্তভাবে শুধাল, আমার হয়ে কার সঙ্গে লড়াই করছিলে?
গোপাল নায়েবের সঙ্গে।
আর লড়াই-এর বিষয়টা কি, শুনি?
তবে শোন, শুনে রাখাই ভাল—এই বলে সে আরম্ভ করল, আজ অনেকদিন থেকে নায়েব বলছে, ওরে ফুলকি, তোর সঙ্গে তো ঐ কুঠির মেয়েটার খুব ভাব-সাব, ওকে যোগাড় করে দে না। আমি বলি, নায়েব মশাই, ও সে-রকম মেয়ে নয়, ওর দিকে নজর দিও না। নায়েব বলে, রাখ রাখ—তিন কলে কেউ নেই, ভরা যৌবন, আবাব সে-রকম মেয়ে নয়। তা ছাড়া, কতদিন ওকে রাতের বেলায় মাঠের দিক থেকে ফিরতে দেখেছি-অত রাতে মাঠের মধ্যে যায় পূজো করতে, না?
ফুলকির কথা শুনে রেশমী স্তম্ভিত হয়ে যায়, সে স্বপ্নেও ভাবে নি তার যাতায়াত কেউ লক্ষ্য করছে–আর তার এমন কদৰ্থ সম্ভব।
রেশমীকে নীরব দেখে ফুলকি বলে চলল, আজ আবার নায়েব ধরেছিল, যা ফুলকি, মেয়েটাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রাজী করে ফেল, তাকে বালস, গয়নাগাটি দেব—আর তুইও বাদ যাবি নে।
তার পরে একটু থেমে পুনরায় আরম্ভ করল, আসছিলাম তোমাকে সাবধান করে দিতে। কিন্তু এখন দেখছি নায়েবের কথা মিথ্যে নয়—ধরা পড়লে তো একেবারে বামাল ধরা পড়লে, তাও আবার আমার চোখে!
রেশমীর ঝগড়াঝাঁটি করা স্বভাব নয়, জীবনে কখনও ঝগড়া করেছে বলে কেউ জানে না কিন্তু ফুলকির কথায় তার গা এমন জ্বলে উঠল যে ভুলে গেল নিজ স্বভাব।
সে ঝঙ্কার দিয়ে উঠে বলল, আমি যখন যত রাতে খুশি যেদিকে ইচ্ছা যাব, কারও তোয়াক্কা আমি রাখি নে।
ফুলকিও কখনও রাগে না, তবে খোঁচা দিতে পারে বিলক্ষণ, বলল, আর যার সঙ্গে খুশি যাবে, কি বল?
নিশ্চয়।
এবারে ব্যঙ্গ মিশিয়ে বলল, তবে ভাই একবারটি নায়েব মশাই-এর সঙ্গে যাও না। আহা, বুড়ো মানুষ, বেচারার অনেকদিনের শখ! তাছাড়া, দুটো একটা গয়নাগাটি যদি পাই, তোমার ভাগ্যে তো বাজুবন্দ নাচছে!
তবে তাই গড়াতে বলে দাও গে তোমার নায়েব মশাইকে-অসহ্য ক্রোধে কাঁপছিল রেশমী।
রেশমীকে ভাল মেয়ে বলে ধারণা হয়েছিল ফুলকির, তাই সে গায়ে পড়ে এসে মিশত তার সঙ্গে। এখন সেই ধারণা ভেঙে যাওয়ায় ফুলকির মনের মধ্যে চলছিল আলোড়ন। ফুলকির ধারণা ছিল যে, মানুষের ভাল মন্দ সে চেনে, এখন সে ধারণা ভঙ্গ হওয়ায় বোকা বনে গিয়েছে সে। দেখা গেল যে, রেশমী তার চেয়েও চতুর। তাই সে নিজের প্রতি ধিক্কার অনুভব করছিল। চতুর মানুষের বিপদ এই যে, একবার বোকা প্রতিপন্ন হয়ে গেলে নিজেকে কিছুতেই ক্ষমা করতে পারে না। নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য দায়ী করল রেশমীর সূক্ষ্মতর বুদ্ধিকে—তাই গঞ্জনার সুরে বলল, আর কি কি গয়না পছন্দ বলে দাও, একসঙ্গে গড়ালে নায়েব মশাই-এর দু পয়সা সস্তা পড়বে।
খুব যে দরদ নায়েব মশাই-এর জন্য!
হবে বই কি ভাই, আমিও তো কিছু কিছু পেয়েছি কিনা।
তবে তুমিই যাও না, আবার কুটনীগিরি করতে এসেছ কেন?
এসব জাগ্রত দেবতা, নিত্য নূতন ভোগ চাই, নইলে আমার কি অসাধ!
রেশমীর গালাগালির অভিধান খুব বৃহৎ নয়, কোন শব্দ ব্যবহার করবে ভাবছে এমন সময়ে ন্যাড়া এসে উপস্থিতঃ রেশমীদিদি, তুমি এতক্ষণেও ফেরনি দেখে কায়েৎ দাদা চিন্তিত হয়ে উঠেছেন, আমাকে পাঠালেন, শীগগির চল।
