বাঁধের ওপারে নজর পড়তেই চোখে পড়ল কুসুমতরুটা—সরল উন্নত গাছটি আগাগোড়া রক্তিম হয়ে উঠেছে। তা মনে পড়ল কদিন এদিকে আসে নি। এর আগে যেদিন এসেছিল, দেখেছিল উপরের পাতাগুলোয় লালের আভাস-আজ আর কোথাও এতটুকু সবুজের ছোঁয়া নেই। সমস্ত মাঠের মধ্যে ঐ একটিমাত্র গাছ-ঘন রক্তিম। তার মনে হল ঐ একটি রন্ধ্রপথে মাঠের সমস্ত লাল রঙ ঊর্ধ্বে উৎসারিত। ঐ নিঃসঙ্গ দলছাড়া খাপছাড়া তরুটির সঙ্গে কেমন এক আত্মীয়তা অনুভব করে রেশমী; মনে মনে ভাবে, আমাদের দুজনের এক দশা, আমরা না-বাগানের না-বনের।
টুপ, টুপ, টুপ। পাথরের টুকরোয় জলে তার ছায়া চঞ্চল হয়ে ওঠে।
রেশমী মাথা দুলিয়ে শুধায়, কিগো, অমন ছটফট করছ কেন?
ছায়া মাথা দোলায়, উত্তর দেয় না।
রেশমী মুগ্ধ দৃষ্টিতে ছায়াটিকে দেখে মনে মনে ভাবে—আহা, কি সুন্দর! তার মনে হয় বিশ্বের যাবতীয় রূপ যেন শরতের শিশিরকণার মত অশথপাতার শিষটির শেষ প্রান্তে এসে দোদুল্যমান।
ইস্, খুব যে রূপ!
ছায়া হাসে-স্পষ্ট দেখা যায় তার গালের টোল দুটি।
এত রূপ কার জন্যে গো?
এবারে ছায়া নিস্তব্ধ, বোধ করি তার চোখের কোণ জলে ভরে ওঠে, জলে জল এক হয়ে যায়, কিছু বোঝা যায় না।
এবারে রেশমী মাথা নাড়িয়ে বলে, এত রূপ ভাল নয় রে, ভাল নয়!
ছায়া মাথা নাড়িয়ে তাকে সমর্থন করে।
শুনেছিস তো, দু-চারজনের চোখ পড়েছে তোর উপরে?
ছায়া ভয়ে নিস্তব্ধ হয়ে থাকে।
কিছুদিন হল রেশমী বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত উতলা ভাব বোধ করছিল—মনটা কেমন যেন যখন-তখন অকারণে উন্মনা হয়ে যায় তার। খাঁচার পাখী ক্ষণে ক্ষণে উধাও হয়ে যায় আকাশে, দরজা বন্ধ করতে ভুলে যায় মালিক। কেন এই উভ্রান্তি বুঝতে পারে না, বুঝতে না পারলেও উভ্রান্তিটা তো মিথ্যা নয়। তার মনে হয়, মনের মধ্যে কোথাও যেন ফুল ফুটেছে-স্বগীয় তার গন্ধ, দিব্য তার উন্মাদনা। কি ফুল ফুটল, কোথায় ফুটল, ব্যাকুল হয়ে ওঠে সে, খুঁজতে বের হয়। কিন্তু হায়, মনের ফুলের সন্ধান বাইরে পাবে কেমন করে? মনের গহনে কি প্রবেশ করতে পারে সবাই? তাই শুধু সে এখানে ওখানে হাতড়ে বেড়ায়। কমে গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে, রেশমীর জীবন দুর্বহ মনে। হয়। কত বাতে ঘুম ভেঙে গিয়ে দুই হাতে বুক চেপে ধরে কেঁদেছে—চোখের জলে অন্ধকার ধুয়ে ভোর হয়ে গিয়েছে। এই অকারণ আবেগ, অমূলক বেদনা কেন, সে বুঝতে পারে না। যে দুঃখের কারণ স্পষ্ট তার সীমা আহে, অকারণ দুঃখ অনন্ত। সে যখন ধীরভাবে চিন্তা করে, দেখতে পায় যে, দুঃখটাও নিচ্ছিদ্র নীরঞ্জ নয়, তার মধ্যেও আলোকরশ্মি আছে, একরকম আনন্দ আছে, বেশ একটু মজা আছে। তখন সে দুঃখের সঙ্গে খেলা করে, যেমন করে ঐ ছায়াটির সঙ্গে। দুঃখ তার বুকের রক্ত শোষণ করে রস সংগ্রহ করে, সেই রস তার খাদ্য, তার প্রাণ—এটুকু পীড়াদায়ক। কিন্তু মরি মরি, সেই দুঃখের লতায় ফুলের কি অপূর্ব শোভা! মানুষ গাছ, দুঃখ পরগাছা, গাছের ফুলের চেয়ে পরগাছার ফুলের সৌন্দর্য বেশি।
কিন্তু একদিন সে বুঝতে পারল দুঃখের কারণ, বুঝিয়ে ছিল ঐ ছায়সঙ্গিনী। নিজের ছায়া দেখে সে চমকে উঠল—সম্মুখে ও কে? পুরাণে শোনা অঙ্গরীদের কেউ নাকি? এত রূপ তার? রূপ নাকি গৌরব! তার খুশি হওয়া উচিত ছিল, তার বদলে জলের ধারে লুটিয়ে পড়ে সে কাঁদল—সাথে সাথী হায়াও কাঁদল নীরবে। সে ভেবে পায় না, কেন এমন হল? রূপ রমণীর গৌরব, গৌরবে আছে গুরুত্ব, সেই গুরুভারে সে পীড়িত–এ কান্না সেই পীড়নের। ফুলের ভারে গাছ পীড়িত, ফলের ভারে শাখা পীড়িত, তারার ভারে পীড়িত শরতের আকাশ, নীরবতার ভার চরাচরের পীড়া, আর আজ রেশমী পীড়িত রূপের দুর্বহ ভারে।
যে-বন্যা এক রাতের মধ্যে এসে চরাচর ডুবিয়ে দেয় তার সন্ধান আগে পাওয়া যাবে কেমন করে? রেশমীর রূপের আবির্ভাবও যে বন্যার অতর্কিত অভিযান। কাল ছিল সে কিশোরী, এখানে-ওখানে রূপের কুঁড়ি উকি মারছিল, আজ সে পরিপূর্ণ যুবতী। দেহের কানায় কানায় রূপের বান, আর এক অঞ্জলি বেশি হলে পাড় যাবে ছাপিয়ে।
টুপ, টুপ, টুপ।
শোন লো শোন, গায়ে সামলে কাপড় দিস। দেখেছিস তো ফুলকির হেনস্তা।
ছায়া হাসে।
এত হাসির কপাল! তিন কুলে নেই কেউ!
ছায়ার উত্তর কেড়ে নিয়ে নিজেই বলে, ফুলকিরও তো নেই কেউ, তাতে কি তার হাসির অভাব হয়েছে?
তবে কি ফুলকির মত হতে চাস নাকি?
আবার ছায়ার উত্তর নিজে দেয়, ছি ছি, গলায় দড়ি!
এমন সময়ে হাওয়ায় বুকের আঁচল পড়ে খসে। খলিত-অঞ্চল বুকের দিকে তাকিয়ে পলক পড়ে না রেশমীর চোখে।
কায়া আর ছায়া দুজনে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে সৌন্দর্যমেরুর শিখরে।
পুরাণের মতে সৃষ্টির যাবতীয় সুবর্ণ পুঞ্জীভূত হয়েছে মেরুচুড়ায়, এখানেও বুঝি তাই। রেশমী ভাবে, আহা, এক মুহূর্তের জন্য যদি সে পুরুষের চোখ পেত, দেখে নিত ঐ দৃশ্যটি।
হঠাৎ তন্দ্রা ভেঙে সে চমকে ওঠে, জলে আর একটি ছায়া পড়েছে। তাড়াতাড়ি বুকে আঁচল তুলে দেয়।
কে, কায়েৎ দাদা নাকি? কখন এলে?
রাম বসু বলে, এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখতে পেলাম তোমাকে। তা এখানে একা বসে কি করছ? সন্ধ্যাবেলা মাঠের মধ্যে একা একা থাকা কিছু নয়।
রেশমীর মনে পড়ল ফুলকির সতর্কবাণী, ঘুরিয়ে জিজ্ঞাসা করল, চোর-ডাকাতের ভয় নাকি?
