এইভাবে বেশ চলছিল, এমন সময়ে কেমন করে রটে গেল রেশমীর জীবনের প্রকৃত বৃত্তান্ত, সে বিধবা এবং চিতাপলায়িতা। অমনি এই অলক্ষুণে মেয়েটার প্রতি মাসি পিসি দিদিমা মামীমার দল সর্বৈব বিমুখ হল। ফুলকির চরিত্র জানা সত্ত্বেও ফুলকিকে তারা ক্ষমা করেছে, কিন্তু এ যে আর এক কথা! হয়তো তাদের দৃষ্টিই যথার্থ, প্রবৃত্তির নিয়ম যে ভঙ্গ করেছে অদৃষ্ট তাকে শাসন করবে, কিন্তু সমাজবিধি-ভঙ্গের শাসক সমাজ।
গাঁয়ের লোকের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত রেশমীর আরও কাছে এসে দাঁড়াল ফুলকি, বলল, বেশ করেছ ভাই, খামকা মরতে যাবে কেন? বেঁচে থাকবার কত সুখ!
পদ্মদিঘির উঁচ পাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে দুজনে কথা বলছিল, দিঘির কালো জলরাশি দেখিয়ে ফুলকি বলল, চল নেমে খানিকটা সাঁতার কাটি, দেখবে কত আরাম!
তার পরে একটু থেমে বলল, চিতায় পুড়ে মরতে যাব-মরণ আর কি!
রেশমীকে দ্বিধাগ্রস্ত দেখে শাডিখানা খুলে রেখে উঁচু পাড় থেকে সবেগে দিঘির বুকে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল ফুলকি, মুহূর্ত-মধ্যে জল উথাল-পাথাল হয়ে উঠল। রেশমী দেখল, মন্থিত কালো জলের মধ্যে কালোদেহ স্নানরসরসিকা কালীয় নাগিনী।
২.১১-১৫ ছায়াসঙ্গিনী
একা একা, নিঃসঙ্গ, সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ। ভবিষ্যতের দিকে যত দূর চায় কোথাও এতটুকু সঙ্গ নেই, আশ্রয় নেই, ছায়াতরুর স্নেহ নেই, গ্রামের আভাস মাত্র নেই। নিঃসঙ্গতা এমন সম্পূর্ণ যে, মন ভীত হয়ে ওঠে, অবশেষে ভীতির চরমে এসে ভয়টাও মিলিয়ে যায়–ঐ ক্ষীণ বনান্তের পাড়খানি যেন কখন অজ্ঞাতসারে দিগন্তে মিলিয়ে গিয়েছে।
রেশমী একাকী বসে বসে ভাবে আর দেখে। কখন যে তার ভাবনা দেখায় পরিণত হয়, আর দেখা যে কখন ভাবনায় রপান্তরিত হয় টের পায় না।
টাঙন নদীর পশ্চিমে রাঙা মাটির রিক্ত ডাঙা জমির নিস্তব্ধ ওঠা-পড়া একখানি নীরব বেহাগ রাগিণীর মত দিগন্তে গিয়ে সমে মিশেছে। ঐ জনপ্রাণী-তরুগুল্মহীন নিঃশব্দে ওঠা-পড়ার মধ্যে রেশমী নিজ জীবনের ছবি যেন দেখতে পায়—তার নির্জন ভবিষ্যৎ যেন রূপ ধরে সম্মুখে উপস্থিত।
বিকালের দিকে সময় পেলে—সময়ের তার অভাব কি-একাকী চলে আসে এখানে। স্বচ্ছ জলে ভরা ছোট একটা বাঁধ সে আবিষ্কার করেছে, তার একদিকে সেই নিঃসঙ্গ কুসুমতরুটি। এখানে এসে বসে রেশমী; ঠিক জলের ধারে একখানি পাথর, বসে সেই পাথরে, পা দুখানি ঈষৎ জলে ডুবিয়ে। কাকচক্ষু জলে ছায়া পড়ে, হোট ঘোট পাথরের টুকরো জলে ফেলে ফেলে ছায়াকে চঞ্চল করে তুলে সে আপনার সঙ্গে আপনি খেলা করে। মানুষ যখন আপনার ছায়ার সঙ্গ কামনা করে, বুঝতে হবে তখন তার অবস্থা কৃপার যোগ্য। আগে অনেকটা সময় তার কাটত গাঁয়ের মধ্যে। কিন্তু তার জীবনবৃত্তান্ত জানায় গ্রাম দ্বার বন্ধ করেছে। এক সঙ্গী ছিল ঐ রহস্যময়ী ফুলকি বলে মেয়েটা। আজ কদিন থেকে সে-ও নিরুদ্দেশ। ভোলা বাগদির বাড়িতে তার রাত্রিযাপন নিয়ে ভোলাদের দুই ভাই-এ মাথা-ফাটাফাটি হয়ে যায়। ভোলা দিয়েছিল তাকে শাড়ি, ভেবেছিল তার ঘরে রাত কাটাবে ফুলকি, কিন্তু ইতিমধ্যে তার কনিষ্ঠ হার তাকে নাকছবি কবুল করে ঘরে নিয়ে যায়। ভোরে হারুর ঘর থেকে ফুলকিকে বেরুতে দেখে দুই ভাই-এ লাঠালাঠি শুরু হয়ে যায়—ফলে দুজনেরই মাথা ফাটে। ফুলকি গিয়েছিল থামাতে, রক্তে তার কাপড় গেল রাঙা হয়ে। এসব কথা ফুলকির মুখেই শোনা। দিব্য অনায়াসে সব বৃত্তান্ত সে বলে গেল-বেহায়া মেয়েটার এতটুকু লজ্জা, এতটুকু আৰু নেই। রেশমী জিজ্ঞাসা করেছিল, এমন করলে কেন ভাই?
ফুলকি বলে, আমার কাছে যে ভোলা সে হারু, তফাত কি বল!
কিন্তু ওরা যে মাথা-ফাটাফাটি করল?
ও ওদের অভ্যাস। মাসের মধ্যে একবার করে ওদের মাথা ফাটে, এবারে না হয় আমাকে নিয়েই ফাটল!
তোমার লজ্জা করে না?
লজ্জারও তো একটা সীমা আছে। যে কথা সবাই জানে, তাকে আর লজ্জার বলি কেন?
না ভাই, এ ভাল নয়।
প্রসঙ্গান্তর করে ফুলকি বলল, তুমি ভাই একটু সাবধানে থেকো।
ভীত রেশমী শুধাল, কেন?
গায়ের দু-চারজন রসিকের চোখ পড়েছে তোমার উপরে।
সে কি ভাই, আমি তো ও-রকম মেয়ে নই।
আরে সেইজন্যই তো পড়েছে চোখ।
কিছু বুঝতে পারে না রেশমী, শুধায়, সে আবার কেমন?
ফুলকি বলে-যতদিন ওরা জানত যে তুমি কুমারী, তোমার দিকে চোখ দেয় নি। কিন্তু পরে যখন জানতে পারল যে, তোমার এ-কুলও গেছে, ও-কুলও নেই, তোমার দিকে ঝুঁকল। পুরুষগুলোর ভাই ওই স্বভাব, বেওয়ারিশ মেয়ে পেলে লোভের অন্ত থাকে না। একটু সাবধানে থেকে তোমার আমার মত মেয়েদের দিকেই ওদের দৃষ্টি।
তোমার আমার কথাটা রেশমীর ভাল লাগল না; যতই কেন না বন্ধুত্ব থাক ফুলকির সঙ্গে, তবু তার সঙ্গে একত্র উল্লেখে তার আপত্তি ছিল।
এই ঘটনার পরে ফুলকির সঙ্গে আর তার দেখা হয় নি; গাঁয়ের মধ্যে গিয়ে সন্ধান করতে সাহস হয় না, ফুলকিও আসে না।
রেশমী ভাবে, ফুলকি তবে কি অন্যত্র চলে গেল? তার কথাগুলো মনে পড়ে। মেঘের মত হাওয়ার টানে এসেছে, আবার একদিন হাওয়ার টানে ভেসে যাবে। তবে কি হাওয়ার টানেই ভেসে গেল! রেশমী বুঝতে পারে না হাওয়ার টানটা কি? ফুলকির প্রতি তার মনোভাব বড় বিচিত্র—একই সঙ্গে ঘৃণা আর ভালবাসা। দুরন্ত কৌতূহল ঘৃণা আর ভালবাসাকে যুক্ত করে রেখেছে তার মনে।
