কে একজন হাত বাড়িয়ে টেনে তোলে। রেশমী জড়িয়ে ধরে কার একজনের হাঁটু। এতক্ষণ এমন বিচিত্র কাজ করবার শক্তি কে যোগাল ওকে। যতক্ষণ বিপদের আশঙ্কা ছিল-শক্ত ছিল ও। আশঙ্কা দূর হতেই মুর্ভূিত হয়ে পড়ল।
রেশমী, রেশমী, ওঠ, কিছু খাও।
এই তো দুধ খেলাম।
ওমা, সে তো কালকে খেয়েছ!
তবে কি এর মধ্যে একটা দিন চলে গেল?
বে না! দিন কি কখনও মুখ চেয়ে বসে থাকে?
কি খাব?
ভাত।
সাহেবের বজরায় খাব না।
ওমা, সাহেবের বজরায় কে খেতে বলছে, সঙ্গে যে হিন্দুর বজরা আছে।
তুমি সেখানে খাও?
তবে কি খিরিস্তানের বজরায় খেয়ে খিরিস্তান হব।
তবে আমাকে সেখানে নিয়ে চল। কিন্তু তোমাকে কি বলে ডাকব?
সবাই যা বলে ডাকে—ছিরুর মা।
রাম বসুদের বজরায় এসে চার দিন পরে রেশমী অন্ন গ্রহণ করল।
.
২.০৫ ন্যাড়া দি গ্রেট
প্রতিদিন বিকালে ন্যাড়ার কাছে কেরী লোকমুখের ভাষায় পাঠ গ্রহণ করে, সকালবেলা যেমন শেখে ফারসী ও সংস্কৃত রাম বসুর কাছে।
রাম বসুকে কেরী বলে, মুন্সী, বাংলা গদ্য গড়ে তুলতে হবে লোকে যেসব শব্দ সদাসর্বদা ব্যবহার করে তার উপরে।
রাম বসু বলে—তাই করুন না কেন? আমি তো সাহিত্যের ভাষায় কথা বলি নে।
তোমার ভাষায় ফারসী শব্দের আধিক্য, সংস্কৃত শব্দও কম নয়। লোকমুখের ভাষা অবিকৃত ন্যাড়ার মুখে। ও আমাকে খুব সাহায্য করছে। ওর নাম দিয়েছি ন্যাড়া দি গ্রেট।
কিন্তু ও যে একেবারে অশিক্ষিত।
আমার বাইবেলের তর্জমাও যে হবে অশিক্ষিত লোকের জন্য। দেখ, সেদিন ন্যাড়া দি গ্রেট আমাকে শিখিয়েছে ‘মিন্সে’ শব্দটা। শব্দটার খুব তাকত।
ওটা নিতান্ত গ্রাম্য শব্দ।
অধিকাংশ লোকই যে গ্রাম্য। দেখ মুন্সী, মনুষ্য বল, পুরুষ বল, লোকজন বল মিন্সের মত কোনটাই এক্সপ্রেসিভ নয়। মিন্সে শব্দটা উচ্চারণ করবামাত্র আস্ত একটা মানুষ সম্মুখে এসে দাঁড়ায়।
রাম বসু বোঝে যে, যে-কারণেই হক, সাহেবের কাঁধে এখন গ্রাম্য ভাষার পেত্নী ভর করেছে, প্রতিবাদ করা বৃথা, প্রতিবাদ করলেও পেত্নী সহসা নামবে না, কাজেই এখন পেত্নীর সমর্থন করাই বুদ্ধির কাজ। সে বলে—আপনি যা বলেছেন। গ্রাম্য শব্দের তাকতই আলাদা।
তবে! বলে একখানি কাগজ টেনে বের করে কেরী।
দেখ, ন্যাড়া দি গ্রেট আরও কতকগুলো চমৎকার শব্দ আমাকে যুগিয়ে গিয়েছে।
এই বলে সে পাঠ করে-কাহিল, ঠাকুরঝি, খানকী, মাগী, বেটা, ফলানা!
তার পরে বলে ওঠে—‘ফলানা’—এমন চমৎকার শব্দ না আছে ইংরেজী ভাষায়, আছে তোমার সংস্কৃত ভাষায়। ‘অমুক ব্যক্তি’ বা ‘দ্যাট ম্যান’ ‘ফলানা’র কাছে—মদের কাছে জলের মত স্বাদুতাহীন।
তার পরে উৎসাহিত হয়ে উঠে বলে, এর পরে যখন আমি প্রভুর নাম প্রচার করব, সমবেত জনতাকে সম্বোধন করব, হে মাগী, মিন্সে ও অন্যান্য ফলানাগণ! কেমন হবে?
চমৎকার হবে।
রাম বসু মুখে বলে বটে—চমৎকার হবে, কিন্তু মনে মনে ভাবে, আমার কুড়ি টাকা মাইনের চাকরি খতম হবে। সমবেত জনতা তোমাকে দশা পাইয়ে ছাড়বে, দ্বিতীয়বার আর নামপ্রচার করবার সুযোগ দেবে না।
দেখ মুন্সী, আমি স্থির করেছি ন্যাড়ার কাছে গ্রাম্য শব্দ সংগ্রহ করব, আর তোমার কাছে শিখব বাংলা গদ্য রচনার কৌশল। আর কিয়দ্র অগ্রসর হলে লোকমুখের ভাষায় গ্রন্থ রচনা করব। আর এক-আধখানা গ্রন্থ রচনা করে কলম দুরস্ত হলে বাইবেলের তর্জমা শুরু করব।
এ অতি উত্তম প্রস্তাব। কোন বিষয় অবলম্বন করে লিখবেন কিছু স্থির করেছেন কি?
বিষয় আপনি এসে জুটেছে।
ভাসমান নৌকার উপরে কোথা থেকে বিষয় এসে জুটল—ভেবে পায় না রাম বসু।
কিন্তু বেশিক্ষণ ভাবার আবশ্যক হয় না, কেরী আরম্ভ করলন্যাড়া মুখে মুখে ওর জীবনকাহিনী বলে যায়, আমি টুকে রাখি। বিস্ময়কর ওর জীবন! যেন একখানি রোমান্স, তুমি কিছু শুনেছ কি?
আমি এখনও শুধাবার অবকাশ পাই নি।
এক সময়ে বিস্তারিত শুনে নিও-এখন একটু আভাস দিচ্ছি। এই বলে কেরী ন্যাড়ার জীবনকাহিনীর একটা ছক বর্ণনা করে যায়।
ন্যাড়া বলে অতিশয় শৈশবে বাপ মা আর এক বোনের সঙ্গে গঙ্গাসাগরে তীর্থ করতে গিয়েছিল। ফেরবার পথে খেজরীর কাছে বোম্বেটেরা ওদের নৌকা লুট করে নেয়। ওর ধারণা ওর বাপ মা নিহত হয়েছে, বোনের খবর তার পরে পায় নি, খুব সম্ভব সেও নিহত হয়েছে। ও যে কেমন করে ব্যাঙেল গির্জার ক্যাথলিক পাদ্রীদের হাতে এসে পড়ল তা বলতে পারে না।
ক্যাথলিক পাত্রী! রাম বসু আতঙ্কে শিউরে ওঠে।
মুন্সী, আতঙ্কিত হয়ে উঠলে কেন?
আতঙ্কিত হব না? ক্যাথলিক সম্প্রদায় যে প্রভুর সত্যধর্মের দুশমন!
ঠিক কথা, ঠিক কথা। বলে আনন্দে কেরী রাম বসুর করমর্দন করে।
রাম বসু মনে মনে হাসে।
তোমার প্রভুকে তুমি যত জান আমার কুড়ি টাকার প্রভুকে তার চেয়ে বেশি জানি আমি। কোন্ কথায় তার মন ও টাকার থলি কতখানি বিস্ফারিত হবে তা আমার চেয়ে কেউ বেশি জানে না।
কেরী বলে ওঠে, তোমার মত গুণী লোকের কুড়ি টাকা বেতন অত্যন্ত লজ্জার কথা, এবারে মদনবাটিতে গিয়ে আরও পাঁচ তা বাড়িয়ে দেব।
প্রস্তাবটা কানে ঢোকে নি এমনভাবে রাম বসু বলে-ন্যাড়ার জীবনকথা বলুন।
দুশমনদের কাছে পাঁচ-সাত বছর ও থাকে। সেই সময়ে দু-চার কথা ইংরেজী শেখে। একদিন যখন নদীর ধারে ও খেলছিল, ছেলে-ধরার দল ভুলিয়ে নৌকায় তুলে নিয়ে আসে কলকাতায়। সেখানে প্রসিদ্ধ হারমনিক ট্যাভানের মালিকের কাছে ওকে দশ টাকায় বিক্রি করে। ও বাসন-কোসন পরিষ্কার করত, ফাই-ফরমাশ খাটত, আর অবসর সময়ে লালদিঘির একটা বড় তেঁতুল গাছের তলায় লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খেত। শেষে হারমনিক ট্যাভার্ন উঠে গেলে বাসন-কোসন আসবাবপত্রের সঙ্গে ও বিক্রি হয়ে যায়। মার্টিন সাহেব কিনে নেয় ওকে বিশ টাকায়।
