তার পরে দাঁড়িয়ে উঠে বলল, নাঃ, আমার সহ্য হচ্ছে না, তোমরা জাহামে যাও, আমি চললাম–
এই বলে সে হন হন করে প্রস্থান করল।
তিনু চক্রবর্তী গাঁয়ের একটি সমস্যা। তার বিষয়সম্পত্তি, শ্রীপুত্র, বাড়িঘর, স্বাস্থ্য, বিদ্যা কিছু নেই, কিন্তু বোধ করি সেই কারণেই সবচেয়ে বেশি করে আছে অদম্য সাহস ও অপ্রিয় সত্যভাষণের তেজ। বিষয়-সম্পত্তি প্রভৃতি যার আছে তাকে আয়ত্তে রাখা সহজ, কিন্তু অকিঞ্চনের শক্তিরোধের কি উপায়? সেইজন্য ঐ নিঃস্ব লোকটা সমস্ত গ্রামের চিরস্থায়ী শিরঃপীড়ারূপে বিদ্যমান। কিন্তু এক্ষেত্রে চক্রবর্তী ভ্রান্ত। যে সমাজে বিচারের চেয়ে আচারের, ধর্মের চেয়ে অনুষ্ঠানের, ইহকালের চেয়ে পরকালের গুরুত্ব বেশি, সেখানে একঘরে হওয়ার ভয় দুর্বিষহ, আর মৃত্যুর পরে মৃতদেহটার অগতি-আশঙ্কা একেবারেই অসহ্য। যে সমাজে যাবতীয় দুস্কৃতি কপালের উপরে চাপিয়ে নিজেকে দায়মুক অনুভব করবার পথ প্রশস্ত, সেখানে রেশমীর বাস্তব সর্বনাশের তুলনায় তার দিদিমার কাল্পনিক সামাজিক বাধা যে গুরুতর হবে এ তো নিতান্ত সহজবোধ্য ব্যাপার। কাজেই মোক্ষদা বুড়ির দৃষ্টিতে তিন চক্রবর্তী নাস্তিক ও অধার্মিক। চণ্ডী বজীর কাছে নতিস্বীকার করে সে বলল-তোরা যা বলবে বাবা, তাই করব।
চণ্ডী সগর্বে সকলের দিকে তাকিয়ে বলল, দেখলে তো, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে কি না।
যে দেশ ধর্মের কল নাড়াবার ভার বাতাসের উপর অর্পণ করে নিশ্চিত থাকে, সে দেশের দুঃখের অন্ত থাকে না।
অবশেষে অনেক বিতর্ক ও বিতভার পরে মোদার কাছ থেকে বারোয়ারী কালীমাতার ভোগের জন্য একুশটি সিক্কা টাকা ও সওয়া মণ চাল নিয়ে তার উপর থেকে সামাজিক দণ্ড প্রত্যাহার করা স্থির হল এবং আরও অনেক সলা-পরামর্শের পর সিদ্ধান্ত হল যে কলকাতায় গিয়ে জাত-কাছারির কর্তা মহারাজা নবকৃষ্ণ বাহাদুরকে ধরাও করা আবশ্যক। কোম্পানির উপরে তাঁর প্রভূত প্রভাব। তিনি ইচ্ছা করলে অবশ্যই সাহেবের কবল থেকে রেশমীকে উদ্ধার করার উপায় করে দিতে পারেন।
চণ্ডী বক্সী অবিলম্বে কলকাতা যাত্রার উদ্যোগ শুরু করে দিল।
.
২.০৪ রেশমী সুত্র
রেশমীর সম্বিৎ ফিরে পেতে পুরো তিনটি দিন লেগে গেল। চতুর্থ দিনে খানিকটা গরম দুধ পান করে সে আবার শুয়ে পড়ল। ছিরুর মা বলল-ও-রকমভাবে না খেয়ে থাকলে যে মরে যাবে, নাও এই সন্দেশ দুটো ধাও। কিন্তু কোন সাড়া দিল না রেশমী। ছিরুর মা জ্যাভেজের আয়া।
তন্দ্রায় ঘুমে স্বপ্নে কেটেছে এই কয়দিন রেশমীর। যতক্ষণ পর্যন্ত চণ্ডী বক্সী দলবল নিয়ে শাসাচ্ছিল-সে প্রাণপণ-বলে কেরীর হাটু আঁকড়ে পড়েছিল, নিজের শেষবিন্দু শক্তিকে চাবকে জাগিয়ে রেখেছিল। চণ্ডীর দল অপসারিত হতেই তারও শক্তি নিঃশেষিত হয়ে গেল, ছিন্নমূল লতার মত নিঃশব্দে নেতিয়ে পড়ে গেল কেরীর দুই পায়ের মাঝখানে নৌকার পাটাতনের উপর। রাম বসু ডেকে আনল হিরুর মাকে। তখন দুজনে ধরাধরি করে নিয়ে চলল তাকে হিরুর মার কামরায়। সেই যে শুল, ঘুমে তন্ত্রায় স্বপ্নে কেটে গেল তিন দিন তিন রাত, না গেল মুখে এক বিন্দু জল, না গেল পেটে এক দানা অন্ন।
মেয়েটিকে যখন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে হিরুর মার ঘরে, মিসেস কেরী একবার উঁকি মেরে শুধাল, ওর কি হয়েছে? বাঘে ধরেছে নাকি?
ফেলিক্স বলল, না, অজ্ঞান হয়ে গিয়েছে। মিসেস কেরী তাঁর বাক্য সমাপ্ত করে দিয়ে বলল, বাঘের আক্রমণেই। দেখছ না ওর গা লাল হয়ে গিয়েছে।
ভেজা চেলি লেপটে রয়েছে ওর গায়ে।
দুধটুকু পান করে শুয়ে পড়ল, কিন্তু আর ঘুম এল না। ঘুমেরও একটা সীমা আছে। দেহে নূতন করে বলের সঞ্চার অনুভব করল সে। বল কমতে কমতে শেষ সীমায় পৌঁছে আবার বোধ করি আপনিই বাড়তি মুখে রওনা হয়, অমাবস্যার চন্দ্রের শুক্লা তিথিতে সঞ্চারের মত। নতুবা রেশমীর নতুন করে বল অনুভব করবার কি কারণ থাকতে পারে। বলের সঙ্গে এল আশা, আশার সঙ্গে আবার বাঁচবার ইচ্ছা। সে ভেবেছিল, এখন মরলেই বাঁচি। এবার ভাবতে শুরু করল, আবার বাঁচি না কেন! ভাবল, মরবই যদি তবে চিতা থেকে পালাতে গেলাম কেন? চিতার স্মরণে সর্বাঙ্গে শিউরে উঠল। চেষ্টা করল মনটাকে সেদিক থেকে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু তা আর সম্ভব হল না। একে একে মর্মান্তিক দৃশ্যগুলো ভেসে উঠতে লাগল তার মনশ্চক্ষে। একে একে কিন্তু ঠিক পরম্পরা রক্ষা করে নয়। গত অষ্টপ্রহরের অগুনতি দৃশ্য হরিলুটের বাতাসার মত ছিটকে পড়ছে, পূর্বাপর ঠিক থাকছে না।
কয়েকদিন থেকে কানাঘুষায় সে শুনছিল যে, তার বিয়ে আসন্ন। কিন্তু তা যে এত আসন্ন তা কি জানত! সেদিন সন্ধ্যাবেলায় বুঝল আজ রাতেই বিয়ে! ঢোল-সানাইয়ের বাজনা মাঝে মাঝে এখনও যেন কানে এসে বাজছে। চেলি-চন্দনে সেজে হাতে দুগাছা বুলি পরে রওনা হল সে বিবাহমণ্ডপের দিকে। ঐ চণ্ডী-খুড়োরই যেন আগ্রহ বেশি। ঐ কি বর! শরীর যেন বৃকাঠ। মাথাভরা টাক, চোখ ঢুকে গিয়েছে গর্তের মধ্যে, মুখে একটাও দাঁত নেই! কে যেন চাপা গলায় বলল, অমন সুন্দর মেয়েটাকে দিল ভাসিয়ে। চণ্ডীখুড়ো ভারী গলায় হাঁকল, ওরে, বাজা বাজা, লগ্ন হয়েছে।…বন্দুকের শব্দ কেন? তবে কি বিয়েতে বোম ফাটাবার ব্যবস্থাও ছিল? বাসরঘরেই উঠল বরের শ্বাস। কবরেজ ডাক, ওরে কবরেজ নিয়ে আয়! কে একজন বলে ওঠে—এ বর আমদানি তো কবরেজের কৃপাতেই হয়েছে, আবার তাকে কেন? চণ্ডীখুড়ো তাড়া দেয়, তোমরা এখন যাও দেখি, গোল ক’র না।…নাঃ, শেষ হয়ে গেল! সর্বনাশ হল হুঁডিটার। কেষ্ট কবরেজ ধন্বন্তরি বটে, বিয়ে শেষ হবার আগেই বরের শেষ হল। তার পর কি হল ওর ভাল মনে পড়ে না। সব কেমন জট পাকিয়ে যায়। ঢাক-ঢোলের আওয়াজের মধ্যে সবাই ওকে কোথায় নিয়ে চলে। ক্ষুধা-তৃষ্ণা, বিচিত্র অভিজ্ঞতা তাকে এমনি অসাড় করে রেখেছিল যে, এতটুকু ঔৎসুক্য ছিল না তার মনে। সবাই বলল, চল; সে চলল। যখন সংজ্ঞা হল দেখল সম্মুখে চিতা সাজানো, উপরে শায়িত একটা মৃতদেহ। লোকটা কে? ওর সঙ্গে কি তার সম্বন্ধ? ঠিক বটে–এতক্ষণে মনে পড়ে—ঐ লোকটার সঙ্গেই তো তার বিয়ে হয়েছিল। কবে? কাল রাত্রে না পূর্বজন্মে–কিছু মনে পড়ে না। সবাই ওকে স্নান করতে নিয়ে যাচ্ছে কেন? তবে কি? বোধ করি তবে তাই। পাড়ার বিন্দু বামনীকে চিতায় উঠতে স্বচক্ষে ও দেখেছে। ওঃ, সে কি কষ্ট মেয়েটার! যতবার লাফিয়ে পড়তে যায়, সবাই মিলে হরিধ্বনির মধ্যে বাঁশ দিয়ে চেপে ধরে।…না না, ও মরতে পারবে না। আর এমন নির্মম মৃত্যুই যদি তার কপালে শেষ পর্যন্ত অবধারিত ছিল, তবে কেন ও বেঁচে রইল? ওর বাপ, মা, অন্য দুই ভাইবোনের মত নৌকাডুবি হয়ে কেন মরল না? না, কিছুতেই না কিছুতেই না। মরতে ওর বড় ভয়। সে দেখল অবাধ সুযোগরূপে সম্মুখে নদী প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে। পূর্বাপর চিন্তামাত্র না করে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রথমটা কেউ নজর দেয় নি, শেষে রব উঠল—গেল গেল, ডুবল ডুবল! না না, ডোবা নয়—পালাল রে পালাল। আন নৌকা আন ডিঙি! পিছনে দাঁড়ের ছপ ছপ শব্দ। সম্মুখে কার ঐ বজরা? বাঁচাও বাঁচাও, পুড়িয়ে মারল আমাকে, শীগগির বাঁচাও!
