এবারে থেমে কেরী শুধায়, কেমন, বিস্ময়কর নয়?
বিস্ময়কর, কিন্তু এমন অভিনব কিছু নয়, এমন আকছার ঘটছে! দুঃখের কথা বলব কি ডাঃ কেরী, চুরি-করা ছেলেয় কলকাতার সাহেব-সুবোদের চাকর-বাকরের মহল আর চুরি-করা মেয়ের কলকাতার গণিকাপাড়া ভর্তি হয়ে গেল!
রাম বসু চুপ করে থাকে, হয়তো সাধারণভাবে কলকাতার বেশ্যাপল্লীর কথা মনে পড়ে, হয়তো বা বিশেষভাবে টুশকির কথা মনে পড়ে।
তার পরে আবার বলে—এই যে মেয়েটা এসে পড়ল, শেষ পর্যন্ত তারই বা গতি কোন্ মহলে হবে কে বলতে পারে!
কে, রেশমী? কেরী বলে, ওকে এদিক-ওদিক যেতে দেব না। ওর সঙ্গে কাল আমার কথা হয়ে গিয়েছে। ও বলে কিছুতেই ওর সমাজে ফিরবে না।
তা আমি জানি, ফিরে গেলে ওর মৃত্যু অবধারিত।
কেরী বলে, ওর নিজ নামে কিছু বিষয় আছে, ওর মৃত্যু না হওয়া অবধি উত্তরাধিকারিগণ নিশ্চিত হতে পারছে না।
কেরী বলে চলে রেশমী বলছিল যে, আমার কাছে থাকলে ওকে জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে যেতে কেউ সাহস করবে না। মুন্সী, আমি স্থির করেছি, ওকে ইংরেজী শেখাব, আর কখনও স্বেচ্ছায় যদি সত্যধর্ম গ্রহণ করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে তবে ওকে খ্রীষ্টীয়মণ্ডলী ভুক্ত করে নেব।
প্রস্তাবটা বসুর ভাল লাগে না। মুখে বলে-মন্দ কি!
মিসেস কেরী মেয়েটিকে খুব পছন্দ করেছেন—ওর সঙ্গে গল্পগাছা করেন আর তাতে অনেকটা প্রকৃতিস্থ থাকেন। কিন্তু সবচেয়ে জমেছে ন্যাড়ার সঙ্গে ভাব, দুজন দুজনকে পেলে আর ছাড়তে চায় না, সমবয়স্ক কিনা।
রাম বসু বলে, তা আমি লক্ষ্য করেছি। দুটিতে বজরার ছাদে বসে সারাদিন গল্প করছে। বেশ দেখায়, যেন দুই ভাইবোন।
এমন সময়ে হঠাৎ মাঝিদের কোলাহল শুনে রাম বসু জিজ্ঞাসা করল—কি মাঝি, ব্যাপার কি?
মাঝিদের একজন বলল, ঐ ছিপ নৌকাখানার গতিক ভাল নয়।
রাম বসু তাকিয়ে দেখল, দূরে একখানা ছিপ।
কি মনে হয়?
বোম্বেটেদের নৌকা বলে মনে লাগে।
বোম্বেটেদের নৌকা!
সকলে একসঙ্গে চকিত হয়ে ওঠে।
কি সর্বনাশ!
পাল তুলে দাও, পাল তুলে দাও!
ওরে ওঠ ওঠ, সকলে মিলে হাত লাগা।
রাম বসু বলে উঠল, সমুখে রাত্রি, পিছনে বোম্বেটে, আজ বড় বিপদ।
২.০৬-১০ তিনু চক্রবর্তীর দৌত্য
অনেকগুলো পালে বাতাসের ঠেলায় দুখানা বজরা জল কেটে ছুটছে। কিন্তু বজরা গুরুভার, ছিপ হালকা, দুয়ের ব্যবধান ক্রমেই কমে আসছে।
বজরার ছাদে বন্দুক হস্তে কেরী, পাশে ন্যাড়া ও রাম বসু।
ন্যাড়া বলল, জ্ঞান হওয়ার আগে একবার বোম্বটে দেখেছিলাম, এবারে সজ্ঞানে দেখব। তার অনন্ত কৌতূহল ও জিজ্ঞাসা।
রাম বসু শুধাল, তোর ভয় করছে না?
ভয় করবে কেন? তা ছাড়া আমিও তো বোম্বেটে!
সে আবার কেমন?
মাতুনি সাহেব আমার স্বভাব দেখে আমার নাম দিয়েছিল বোম্বেটে।
সে বোম্বেটে নয় রে, এরা আসল বোম্বেটে।
এবারে ছিপ ও বজরার ব্যবধান খুব কমে এসেছে, কথা বললে শোনা যায়। ছিপের আরোহীদের ভয় দেখাবার উদ্দেশ্যে কেরী বন্দুকের আওয়াজ করল।
ছিপ থেকে একজন হেঁকে বলল, সাহেব, মেলা গুলি-টুলি ক’র না, আমরা তোমাদের বন্ধু।
কেরী হেঁকে বলল, আমরা বোম্বেটিয়াদের বন্ধু হতে চাই না।
তবে না হয় আমরাই চাইলাম। কিন্তু আমরা বোম্বেটে-ফোম্বেটে নই।
এমন সময়ে রেশমী মুখ বার করে শুধাল, কে, তিনু দাদা নাকি?
হ্যাঁ রে ছুঁড়ি, হ্যাঁ।
তার পরে বলল, তোর ঐ সাহেব বাবাকে বন্দুক হুঁড়তে নিষেধ কর। ছেলেবেলায় একবার বাজের আওয়াজে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। সেই থেকে বন্দুকের আওয়াজে বড় ভয়। তা ছাড়া বন্দুকের গুলি এমনি বদখেয়ালী যে শরীরটা এ-ফোঁড় ওফোঁড় করে ছাড়ে।
রাম বসু হেসে উঠল, যা বলেছ দাদা, বন্দুকের গুলি আর গিন্নির বচন দুইই মর্মভেদী।
কেরী বুঝল, লোকটা আর যে-ই হক শত্রু নয়, এবং খুব সম্ভব বোম্বেটেও নয়।
ওরে রেশমী, আমার পরিচয়টা এদের দে!
রেশমী রাম বসুকে তিনু চক্রবর্তীর পরিচয় দিল—আর রাম বসু কেরীকে সব বুঝিয়ে দিল।
পরিচয় ও শিষ্ট সম্ভাষণের পালা সাঙ্গ হলে তিনু চক্রবর্তী অতর্কিত আগমনের উদ্দেশ্য বর্ণনা করল।
তিনু বলল, বসুজা, মেয়েটা আগুনের মুখ থেকে বেঁচে গেল বটে কিন্তু পড়েছে এখন বাঘের মুখে। আগুন এক জায়গায় বসে পোড়ায়, বাঘ তাড়া করে শিকার ধরে।
পরে সূত্রটার ভাষ্য করে বলে–ঐ যে চণ্ডী বক্সী-যার একটুখানি পরিচয় পেয়েছ সেদিন, বিস্তারিত পরিচয় দিতে গেলে রাত ভোর হয়ে যাবে, এখন থাক, বরঞ্চ এক সময়ে রয়ে বসে রেশমীর কাছে শুনে নিও।
তার পরে নিজ মনে বলে, ঐটুকু মেয়ে, ও আর কি জানে!
পুনরায় শ্রোতাদের উদ্দেশে বলে চলে, সেই চণ্ডী বক্সী পণ করেছে, যেমন করেই হক ওকে খুঁজে বার করবে।
বসুজা শুধায, বেশ, খুঁজে বের না হয় করল, তার পরে?
তারপরে সমাজরক্ষার নামে মেয়েটাকে পুড়িয়ে মারবে।
ভয়ে রেশমীর গায়ে কাঁটা দেয়।
কিন্তু সমাজরক্ষার নামে ওর এত মাথাব্যথা কেন?
তা জান না বুঝি? রেশমীর নিজের নামে কিছু বিষয় আছে, সেটা ওর স্ত্রীধন। কাজেই রেশমী জীবিত থাকা অবধি নিশ্চিন্তে কেমন করে ভোগ করবে চণ্ডী?
বসুজা বলে ওঠে, তাই বল।
তবু শুধায়–কিন্তু চণ্ডী কি ওর উত্তরাধিকারী?
তিনু চক্রবর্তী বলে, এ অঞ্চলে যাবতীয় বেওয়ারিশ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী চণ্ডী।
সকলে হেসে ওঠে।
রাম বসু বলে, এমন দু-একটি লোক বাংলা দেশের প্রায় সমস্ত গ্রামেই আছে।
