তবে তাই হক-বলে বক্সী পুনরায় শুরু করল-এই যে মেয়েটা শাস্ত্রের মাথায় পদাঘাত করে একটা স্নেচ্ছের সঙ্গে চলে গেল, তার কি হয়?
কোন্ শাস্ত্রে আছে যে, একটা অনাথ মেয়েকে পুড়িয়ে মারতে হবে? শুধায় তিনু চক্কোত্তি।
তোমার কোন্ শাস্ত্রটা পড়া আছে চক্কোত্তি? বলে চণ্ডী বক্সী।
আমার না থাক তোমার তো আছে, তুমিই বল না।
বক্সী জীবনে এমন পরীক্ষায় পড়ে নি, তবু সে মচকাবার পাত্র নয়, বলে, তুমি বামুনের এঁড়ে, তোমার কাছে বলে কি লাভ? বুঝতে পারবে?
আহা-হা, আমি না বুঝি এঁদের কেউ কেউ তো বুঝবেন বলে চকোত্তি সভাস্থ জনতা দেখিয়ে দেয়।
বক্সী সে দিক দিয়ে যায় না, বলে, নিশ্চয় আছে, বিধান নিয়েছি শিরোমণি মশায়ের কাছে।
যদি কোন শাস্ত্রে অনাথা বালিকাকে পুড়িয়ে মারবার বিধান থাকে, তবে সেই শান্ত ভরে আমি ইয়ে করি—বলে লাফিয়ে উঠে বিশেষ একটা ভঙ্গী করতে উদ্যত হয় তিনু চক্কোত্তি।
ঘাড়-বাঁকা পঞ্চানন চীৎকার করে ওঠে, শাস্ত্রের দোষে এখানে যেন ইয়ে করে বসবেন —এটা বারোয়ারীতলা, জাগ্রত দেবীর স্থান।
লজ্জিত চক্কোত্তি আসন গ্রহণ করে।
জগৎ দাস বলে, চক্কোত্তিমশায়, আপনি প্রাচীন ব্যক্তি তায় ব্রাহ্মণ বর্ণশ্রেষ্ঠ, আপনার বিবেচনা করে কথা বলা উচিত।
বামনামির নিকুচি করি আমি, এবারে বসে বসেই বলে চক্কোত্তি, ঐ কেষ্ট কবরেজও তো বামুন।
এর মধ্যে কেষ্ট কবরেজ আবার এল কোত্থেকে? শুধায় জগৎ দাস।
ওঃ, তোমরা কিছুই জান না দেখি। তবে শোন। চণ্ডী বক্সী, তুমিও শোন, মিথ্যা বললে ধরিয়ে দিও।
অতঃপর গলা পরিষ্কার করে নিয়ে চক্কোত্তি শুরু করে, ঐ তোমাদের চণ্ডী খুড়ো আজ ছ মাস কেষ্ট কবরেজের কাছে হাঁটাহাঁটি করছিল। কেন জান?-কবরেজ, তোমার হাতে তো অনেক রুগী, এমন একটার সন্ধান দাও যেটা দু-এক মাসের মধ্যেই টাসবে।
কবরেজ শুধায়, হঠাৎ তেমন রুগীতে কি প্রয়োজন পড়ল?
শেষে অনেক দরাদরি অনেক কচলাকচলির পরে আসল কথা প্রকাশ করে চণ্ডী বক্সী। রেশমীর সঙ্গে বিয়ে দিতে হবে।
তা রুগী কেন? শুধায় কবরেজ।
যাতে বিয়ের পরে বেশি দিন না টেঁকে।
সে কি কথা!
দরদ দেখিয়ে চণ্ডী বলে, আহা মেয়েটার যে বিয়ে হয় না।
তা ভাল বর খোঁজ না কেন?
ভাল বর জুটবে কেন? আর তা ছাড়া খোঁজেই বা কে?
শেষে কবরেজ মশায় কিছু আদায় করে সন্ধান দিলেন ঐ অম্বিকা রায়ের, তিনকাল গত বুড়ো, দেড় বছর ভুগছিল ক্ষয়কাশে।
কখ্খনও ক্ষয়কাশ নয়, হাঁপানি, চীৎকার করে বলে চণ্ডী বক্সী। এতক্ষণ সে হতভম্ব হয়ে ভাবছিল, এত কথা চক্কোত্তি জানল কেমন করে?
ঐ রকম হাঁপানি তোর হক, উত্তর দেয় তিনু।
কিন্তু এতে বীমশায়ের লাভ কি? শুধায় জগৎ দাস।
ওহো, তুমি কিছুই জান না দেখছি, আর জানবেই বা কেমন করে-থাক সের বাটখারা-দাঁড়িপাল্লা নিয়ে! যদি না জান তো শুনে নাও। মেয়েটা বিধবা হলে তাকে তোমাদের হিন্দুশাস্ত্রের দোহাই দিয়ে পুড়িয়ে মারতে পারলেই তার সম্পত্তি উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে। কি, ঠিক বলছি কিনা চণ্ডী বক্সী?
তুমি খিরিস্তানের মত কথা বলছ।
আরে বাবা, খিরিস্তান কাকে বলে এবারে দেখলে তো! গিয়েছিলে তো একবার, পালিয়ে এলে কেন লেজ গুটিয়ে? যাও না আবার।
যাবই তো, আমি কি সহজে ছাড়ব? আর, এক বারে না হয় এক শ বার যাব।
নিরানব্বই বার হাতে থেকে যাবে, এক বারেই কাজ ফরসা হবে।
কৌতূহলী হয়ে কেউ কেউ শুধায়, সেটা আবার কেমন?
গুলি মেরে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেবে। নিজের রসিকতায় নিজে হো হো করে হেসে ওঠে চক্কোত্তি। বলে, বাবাঃ, একেই বলে বাঘের উপর টাঘ। রাজকন্যা আর রাজত্ব দুই-ই একসঙ্গে পড়ল গিয়ে সাহেবের হাতে। দেখি এবারে বক্সীর কতদূর কি সাধ্য।
বক্সী মনে মনে বড়ই অস্বস্তি অনুভব করছিল, কারণ কথাগুলোর কোনটাই মিথ্যা নয়। তবু এমন নীরব থাকলে অপকর্মের দায়িত্ব দ্বিগুণ ভারী হবে ভেবে বক্সী বলল, তোমার মত গজিলের কথার প্রতিবাদ করে আমি সময় নষ্ট করতে চাই নে।
ও, তাই বুঝি এখন সময়ের সদ্ব্যবহার করছ পাড়ায় পাড়ায় জোট পাকিয়ে ওর দিদিমাকে একঘরে করবার চেষ্টায়!
কে বলল?
যে বলল সে ঐ আসছে।
সকলে তাকিয়ে দেখল, মোক্ষদা বুড়ি ধীরে ধীরে আসছে। মোক্ষদা বৃদ্ধা বিধবা, রেশমীর মাতামহী।
বারোয়ারীতলায় প্রবেশ করে মোক্ষদা ডুকরে কেঁদে উঠল, বাপ সকল, আমাকে একঘরে করে সমাজে ঠেলো না।
তিনু চক্কোত্তি এতক্ষণ তার হয়েই মামলা লড়ছিল, কিন্তু এখন তার বড় রাগ হল। ভাবল, বুডি তো বড় স্বার্থপর, রেশমীর সর্বনাশের চেয়ে একঘরে হওয়ার ভয়টা হল তার বেশি!
|||||||||| সে বলল, বুড়ি, একঘরে হলে তোমার দুঃখটা কি? তোমার ঘরে কেউ খাবে, এই তো? ভালই তো, তোমার ভাত বেঁচে যাবে।
বুড়ি দ্বিগুণ ডুকরে উঠল, মরলে কেউ কাঁধ দেবে না।
নাও, সব গেল, এখন মরার পরে কি হবে সেই দুশ্চিন্তায় বুড়ির ঘুম নেই!
তুমি তো বাবা নাস্তিক, তোমার ধর্মও নেই পরকালও নেই, কিন্তু বাবা আমরা। যে ভগবান মানি।
তবে এখানে কেন? ভগবানের কাছে গিয়ে কাঁদ।
তাই তো কাঁদছিলাম বাবা। বলছিলাম, ঠাকুর, পোড়ারমুখীর কপালে যা ছিল তা হল, এখন আমার যেন অগতি না হয়।
বেশ তো কাঁদছিলে, তবে আবার এদিকে গতি হল কেন?
বাবা, একঘরে তো ভগবানে করে না, মানুষে করে—
বাধা দিয়ে চক্কোত্তি বলল—মানুষে করে না, অমানুষে করে।
