বিশুদ্ধ জ্ঞান ও বিশুদ্ধ দস্তার মধ্যে এক রকম করে সমন্বয় করেছিল অষ্টাদশ শতক (ভলতেয়ারের প্রভূত বিত্তের অধিকাংশই উপার্জিত হয়েছিল চোরাবাজারে, ঘুষের কডিতে এবং অনুরুপ পন্থায়), তেমনি বিশুদ্ধ কাম ও বিশুদ্ধ প্রেমের মধ্যেও অপূর্ব সেতুবন্ধ হয়ে গিয়েছিল সে যুগে। হেস্টিংসের দ্বিতীয় পক্ষের পত্নী ভূতপূর্ব ব্যারনেস ইমহফ। প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ এবং হেস্টিংসের সঙ্গে তার বিবাহ যে সম্পূর্ণ আইনানুগ হয় নি এমন কানাকানি তখনকার কালেও (কি কাল!) শোনা গিয়েছিল। হেস্টিংস তবু পটে ছিল, আইনের সূক্ষ্ম পর্দায় অতীতের সর্বকীর্তি প্রচ্ছন্ন না হলেও অতীতের উপরে যবনিকাপাত বলেই তোক ধরে নিয়েছিল। অন্য অনেকে সে পরিশ্রমটুকুও স্বীকার করে নি।
ফিলিপ ফ্রান্সিস, গভর্নরের কাউন্সিলের অন্যতম প্রধান সদস্য, হেস্টিংসের প্রবলতম প্রতিপক্ষ, কলকাতার শ্বেতাঙ্গ-সমাজের ভূষণস্বরূপ, এ হেন ফিলিপ ফ্রান্সিস রাতের অন্ধকারে নিজেকে মিশিয়ে দেবার উদ্দেশ্যে কালো পোশাক পরে একখানা আস্ত মই বগলে নিয়ে রাজপথ দিয়ে চলেছে–পাঁচিল ডিঙিয়ে গ্রাঙের মাদাম গ্রাঙের সঙ্গে নৈশ সম্ভাষণের আশায়। তার পর হঠাৎ সে নৈশ আলাপে ব্যাঘাত ঘট, ম গ্রাঙের দারোয়ান চাপরাসী ফ্রান্সিসকে আটক করল, ফ্রান্সিস দেয়াল টপকে পালাল, ম গ্রাঙ মামলায় খেসারত পেল-এ সব তথ্য তখনকার কালেও (কি কাল!) শহরে চাঞ্চল্য এনেছিল। এতে আর যারই ক্ষতি হক-মাদাম গ্রাম্পের কোন ক্ষতি হয় নি। বিবাহ-বিচ্ছেদের পরে কিছুকাল ফ্রান্সিসের রক্ষিতা রূপে থাকবার পর অদৃষ্টের দাবা-খেলোয়াড়ের হাত তাকে নিয়ে চলে গেল ফরাসী দেশে। নেপোলিয়নের সর্বশক্তিমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম ত্যালেরা র চোখে পড়ল ভুতপূর্ব মাদাম গ্রাঙ-আর মে মাদাম ত্যালেরা ও প্রিন্সেস ত্যালের রূপে জীবনাবসান ঘটল এই স্বৈরিণী মনস্বিনী নারীর।
উপরতলায় যেখানে এই অবস্থা, নীচের তলার অবস্থা সেখানে সহজেই অনুমেয়। সেকালের প্রায় প্রত্যেক সিভিলিয়ানের দেশী রক্ষিতা থাকত। ফোর্ট উইলিয়মের এক মেজরের একটি ছোটখাটো হারেম ছিল, বিবির সংখ্যা যোল জন। কৌতূহলী বন্ধুর ‘এতগুলোকে কি করে সামলাও’ প্রশ্নের উত্তরে সৌভাগ্যবান মেজর বলেছিল-খুব সহজ। ওদের পেট ভরে খেতে দিই, আর একটু ঘুরে ফিরে বেড়াতে সুযোগ দিই, তবে লক্ষ্য রাখি যাতে বেশি দূরে গিয়ে না পড়ে।
মেজরের উত্তরটা সেকালের অধিকাংশ সিভিলিয়ানের উত্তর। একদিকে অমিতব্যয়ের দেনা, অন্যদিকে অমিত-বিহারের সন্তান-সন্ততির ভার—দুয়ে মিলে সিভিলিয়ানদের নীচের দিকে টানত, অন্যদিকের পথ বন্ধ।
তবে তাদের একবারে অকৃতজ্ঞ বলা যায় না। কিছুকাল পরে যখন সিভিলিয়ানদের পরিবারের জন্য ভাতার প্রশ্ন উঠল, পুরনো আমলের সিভিলিয়ানগণ জারজ সন্তানদের জন্য ভাতা দাবি করল। নৃতন আমলের ছোকরার দল করল ঘোর আপত্তি। পুরনো দল ঠাট্টা করে লিখল—জিতেন্দ্রিয় সাধুপুরুষের দল!
আর ছোকরার দল বুড়োদের ঠাট্টা করে ব্যঙ্গচিত্র আঁকল-বুড়ো সিভিলিয়ানের পিছনে চলেছে এক দেশী রমণী, তার পিছে এক দেশী বালক।
বুড়োর দল হয়তো মনে মনে ভাবল–হায়, যদি একটিমাত্র হত!
আর যে-সব উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবক রীতিমত বিয়ের আশা পোষণ করত, টাকা-কড়ির পেখম মেলে দেওয়া ছাড়া তাদের গত্যন্তর ছিল না। প্রজাপতির প্রধান দৌত্য করত জুড়িগাড়ি।
একবার এক যুবক দামী জুড়িগাড়ি কিনে ঈপ্সিতা তরুণীর মনোহরণ করতে পেরেছে কি না জানবার আশায় জিজ্ঞাসা করেছিল-বলি জটা কেমন দেখছ?
তরুণী নিরীহের মত শুধিয়েছিল, কোন্টা, যেটা টানছে না যেটা হাঁকাচ্ছে?
খিদিরপুরে অনাথ শ্বেতাঙ্গিনী বালিকাদের একটি সংরক্ষণাবাস ছিল। বিবাহেচ্ছু যুবকগণ সেখানে গিয়ে অনেক সময় ভাগ্য-পরীক্ষা করত। আর ভাগ্য-পরীক্ষার ক্ষেত্র ছিল জাহাজঘাটায়, নূতন জাহাজ পৌঁছবার শুভক্ষণে। বেওয়ারিশ তরুণী দেখলে যুবকের দল ঘেঁকে ধরত।
সেকালে চাল ডাল ঘি আটা মাছ মাংস প্রভৃতি খাদ্যদ্রব্য শ্বেতাঙ্গ সমাজের আর্থিক সামর্থ্যের অনুপাতে খুব সুলভ ছিল, কিন্তু অধিকাংশ গৃহেই এ সব বস্তু দুমূল্য হয়ে পৌঁছত। মিসেস ফে ১৭৮৯ সাল নাগাদ লিখছে যে তার খানসামা বলছে পাঁচ সের দুধ আর তেরোটা ডিম লেগেছে দু ডিশ পুডিং তৈরি করতে; আর জনপিছু দৈনিক বারো আউন্স মাখনের খরচা দেখায় লোকটা!
এখন একটিমাত্র খানসামার হাতটান যদি এমন হয়, তবে যে বাড়িতে ছোটয় বড়য় হরেক নামে তেষট্টিজন চাকরবাকর, সে বাড়িতে চিরদুর্ভিক্ষ তো বিরাজ করবেই; তবু তো মিসেস কে মধ্যবিত্ত গৃহিণী মাত্র, ধনী পরিবারে চাকরবাকরের সংখ্যা একশো-র অনেক উপরে।
টাকার অভাব? দোকানদাররা পরস্পরের মধ্যে পাল্লা দিয়ে জানিয়ে যেত, হজুর, আমি তিন হাজার টাকার মাল ধার দেব; মেমসাহেব, আমি দেব পাঁচ হাজার টাকার মাল।
তার পরে যখন টাকা শোধবার অপ্রীতিকর সময় আসত তখন বিপদে মধুসূদন বেশে আসরে অবতীর্ণ হত বাড়ির সরকার।
হুজুর, দত্তরাম চক্রবর্তী আমার দোস্ত, আত্মীয় বললেই হয়, অমন সাধুলোক আর হয় না। হুজুর ইশারা করলেই এখনই টাকার থলি নিয়ে হাজির হয়।
যুগপৎ আশায় ও উদ্বেগে হুজুর শুধায়–সুদ কত নেবে?
